নিউজ ডেস্ক

যেসব কারনে তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি

এম এ জুহাইর (চট্টগ্রাম)

বিএনপি মিডিয়া সেল থেকে নেওয়া
প্রফেসর ড. মোর্শেদ হাসান খান
“বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তফসিল ঘোষণার পর ইসির নিবন্ধিত ৪৪ রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপিসহ ১৭টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে আওয়ামীলীগসহ ১৫টি দল স্বাগত জানিয়েছে তফসিল ঘোষণাকে। বাকি ১২টি দল তফসিলের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান এখনো স্পষ্ট করেনি। বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটও আন্দোলন করছে। এ জোটের শরিক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে। বাম জোটের সঙ্গে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলও (বাংলাদেশ জাসদ) প্রত্যাখ্যান করেছে। তফসিল ঘোষণার
বিরুদ্ধে দুই দিন ধরে ঢাকায় বিক্ষোভ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বিগত দুটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় সরকার এবারও একটি এক তরফা নির্বাচন আয়োজনে সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এটি দিবালোকের মতোই স্পস্ট। যদিও সরকারের এই সিদ্ধান্তে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছে। ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন আয়োজনের এই বিরল দৃষ্টান্ত বাস্তবায়ন করতে এখন তার প্রশাসনকে কাজে লাগাচ্ছে।
বিশেষ করে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খখলায় নিয়োজিত বাহিনী সরকারের এই খায়েশ পূরণে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করছে। তারা বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপরও ব্যাপক অত্যাচার-নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশের এই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা বন্ধের আহবান জানিয়েছে।
গত দুটি নির্বাচন এমন একতরফা ভাবে করার পর দেশে একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার সবগুলো স্থানে সরকার এমনভাবে দলীয়করণ করেছে যে এই অবস্থায় কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাইতো রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই রাজপথে আন্দোলন করছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই বিএনপির আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগি দেশগুলোর প্রত্যাশাও ঠিক সেটি। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ জানে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে কারনে একটি চক্রান্তের নির্বাচন করতে তড়িঘড়ি করে তারা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে। বিএনপিসহ বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো ঘৃণাভরে সেই তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের বেশকিছু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; যেমন-আইসিসিপিআর (১৯৬৬), আইসিইআরডি (১৯৬৬), সিডো (১৯৭৯), সবপিআরডাব্লিউ (১৯৫২), এমডব্লিউসি (১৯৯০), সিআরপিডি (২০০৬), জেনারেল কমেন্ট ২৫ (১৯৯৬), জেনারেল রেকমেন্ডেশন ২৩ (১৯৯৭) ইত্যাদি।

২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের ভূমিকা জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে একটি রেজ্যুলুশন পাশ হয়। তাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য উপরোক্ত চুক্তিগুলো যে বৈশিষ্টগুলো নির্ধারণ করেছে তা হল:

এক. মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান: ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে বিএনপির মহাসমাবেশকে ঘিরে পুলিশ ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ওই পরিস্থিতিকে পূঁজি করে বিএনপির ১২ হাজারের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অনেকক্ষেত্রে বিএনপি নেতাকর্মীদের পরিবারের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এমন সদস্যদেরেকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সরকারের বিন্দুমাত্র সম্মান নাই। এখানে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে জাতিসংঘের যে শর্ত সেটি সরাসরি লঙ্ঘিত হচ্ছে।

দুই. সংগঠনের স্বাধীনতা: বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। মৃত এবং প্রবাসী নেতাকর্মীদেরকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। দলের প্রধান কার্যালয়কে পুলিশ ক্রাইম সিন ঘোষণা করে বিপুল সংখ্যক পুলিশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। বিএনপি অফিসের আশেপাশে কাউকে দেখামাত্র তাকে গায়েবি মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে।

তিন. বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার: সরকারের সমালোচক, বুদ্ধিজীবী এবংভিন্নমত পোষণকারীদেরকে ডিবি পুলিশ ক্রমাগত নির্যাতন করছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কারণে অনলাইনেও কোনো মতামত প্রকাশ করা যায় না। যে কেউ সরকারের সমালোচনা করলে সরকারি দলের ক্যাডাররা তার উপরে আক্রমণ করে।

চার. ক্ষমতা গ্রহণের অধিকার এবং আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার চর্চা: সরকার পুলিশকে দিয়ে বিএনপি নেতাদেরকে দমন-পীড়ন করছে। দলের মহাসচিব এবং বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদেরকে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে ভাংচুরের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে। একজন ৮০ বছর বয়ষ্ক মানুষ কীভাবে প্রধান বিচারপতির বাড়ি ভাঙচুর করতে পারে? রিমান্ডে নেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হয় না। গ্রেফতার করে দীর্ঘ সময় গোপন স্থানে রাখা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে উপস্থাপন করা হয় না।

পাঁচ. জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন করা: ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বিরোধী দলের বয়কটের কারণে অর্ধেক আসনে (১৫৪) প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী না থাকায় ভোটগ্রহণ হয়নি। ২০১৮ সালে ভোটের দিনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা হয়েছে। পুলিশ এবং সরকারি কর্মচারীরা সরকারি দলের পক্ষ হয়ে আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে রেখেছে। ২০২৩ সালেও একই পরিস্থিতি বিরাজমান। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল মনে করে, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কোনো পরিবেশ নাই।

ছয়. রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনের মধ্যে বহুত্ববাদের চর্চা: বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলগুলোর উপর সরকার দমননীতি প্রয়োগ করছে। এছাড়াও মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর প্রধান আদিলুর রহমানকে ভিত্তিহীন অভিযোগে সাজা দিয়েছে। নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসকে ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিরোধী দলের নিবন্ধন বাতিল করা হচ্ছে যাতে একদলীয় শাসন পোক্ত হয়।

সাত. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: দেশে কোনো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নাই। দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির বিষয়ে নিরব।সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীরা সরকারি দলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। জেলা প্রশাসকদের সরকারি দলের পক্ষে প্রচারণা করতে দেখা যায়। পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যস্ত বিরোধী দল দমন করতে। সংবিধান এবং পূর্ববর্তী নজির উপেক্ষা করে আদালত রায় দিচ্ছে।

আট. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগ সরকারের ফরমায়েশ মেনে বিচার করছে। অধস্তন আদালতের কোনো স্বাধীনতা নাই। উচ্চ আদালত ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড না মেনেই বিচারকার্য পরিচালনা করছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলায় আইন অমান্য করে রাত নয়টা পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে।

নয়. জনপ্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: জনপ্রশাসন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।জনপ্রশাসনে কোনো জবাবদিহি বা স্বচ্ছতা নাই।

দশ. মুক্ত, স্বাধীন এবং বহুত্ববাদী গণমাধ্যম: সরকার গণমাধ্যমের উপর খড়গহস্ত। ২৮ অক্টোবর, ২০২৩, তারিখ থেকে শতাধিক সাংবাদিক আহত এবং নির্যাতিত হয়েছে। ২৮ অক্টোবর পুলিশের অ্যাকশনে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সাংবাদিকদের হেনস্তা করছে। প্রথম আলোর রিপোর্টার রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা করার ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। একজন কার্টুনিস্টকে গত বছর পুলিশের হেফাজতে হত্যা করা হয়েছে। সরকারের অনুগত গণমাধ্যম ক্রমাগত মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম সরকারের রোষানলে পড়ছে।

এই উদাহরণগুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে শর্তগুলো ঠিক করা হয়েছে তার একটা ক্রাইটেরিয়াও বাংলাদেশে বিদ্যমান নাই। সুতরাং এই অবস্থায় নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার অর্থ হলো এক দলীয় স্বৈরশাসনকে আবারো রাষ্ট্রক্ষমতার সুযোগ করে দেওয়া। নির্বাচন কমিশনের এই চক্রান্তমূলক কর্মকান্ড কিংবা তাদের কোনো উদ্যোগেই বিএনপিসহ দেশপ্রেমিক কোনো শক্তি পা দিতে পারে না”

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন