
মো. কামাল উদ্দিন-
মা, আজ তোমার ২৩ তম মৃত্যু দিবসে আমি তোমার স্মৃতিতে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তুমি যে সুখের আকাশে আমার জীবনের সূর্য হয়ে উঠেছিলে, সেই অভ্যন্তরীণ আলো আজও আমার হৃদয়কে আলোকিত করে। তোমার ভালোবাসা ও স্নেহের প্রতিটি মুহূর্ত আমি মনে করি, যেগুলি আমার জীবনের অমূল্য ধন। তুমি ছিলে শক্তির প্রতীক, তোমার স্নেহময় হাত এবং দয়া-দাক্ষিণ্যের স্পর্শে আমি পেয়েছি জীবনের অমূল্য শিক্ষা।
আজও তোমার অভাব অনুভব করি, কিন্তু তোমার শিক্ষা ও আদর্শ আমাকে এগিয়ে চলতে সাহায্য করে। তোমার স্মৃতি আমার জীবনের পথপ্রদর্শক, এবং তোমার স্মৃতি চিরকাল আমার হৃদয়ে উজ্জ্বল থাকবে।
মা, তুমি যতদূর চলে গেছ, তোমার ভালোবাসা এবং শিক্ষার আলো আমাকে চিরকাল পথ দেখাবে। আমি প্রতিদিন তোমার জন্য প্রার্থনা করি, তোমার শান্তি কামনা করি।
সৃষ্টির সেরা উপহার তুমি ছিলে, এবং সেই উপহার আমরা চিরকাল স্মরণ করবো-মা নাই ঘরে যার, সংসারের সুখ শান্তি অমূল্য তার। মা বিষয় কেউ যদি প্রশ্ন করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা কে? তখন আমি বলব আমার জন্য আমার মা। মহান সৃষ্টি কর্তার পর কাউকে যদি সম্মান করতে হয় তাহলে একমাত্র মাকে করতে হবে। মানুষের জীবনে কোন বড় ক্ষতি হয়ে থাকলে তা হবে মায়ের বিয়োগ! মায়ের স্তরে যোগ করার কোন ধন-সম্পদ নাই। প্রখ্যাত শিল্পী ফকির আলমগীর গানের মাঝে বলেছে ‘মায়ের এক নাল দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম পাপুস বানিয়ে দিলে তবুও সুধ হবে না, এত দরদী মাগো কেউ তো হবে না, আমার মা। অতি সত্য কথা, মা এমন যে আপন যার তুলনা করা যায় না। সংসার ও পারিবারিক জীবনে কোন কেউ যদি নি:স্বার্থ বান থাকে তাহলে একমাত্র মা ব্যতীত অন্য কেউ নয়। বিগত ৯৭ সালে ১১ই আগস্ট ছোট ভাই আকতার নিখোঁজ হয় ( অধ্য বদি পাওয়া যায় নাই) তার শোকে মা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এবং ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। মায়ের প্রথম অসুখ যখন হল তখন চট্টগ্রাম মেডিকেলে ইর্ন্টাননি ডাক্তারের ধর্মঘট চলছিলো বিধায় চমেক হাসপাতালে নেওয়া হলো না। কিন্তু জরুরী চিকিৎসা দরকার। রাতে ফয়েজলেকস্থ ইউ, এস, টি, সি তে মাকে ভর্তি করে দিলাম জরুরী বিভাগ থেকে মেডিসিন বিভাগে মেডিকেলের সেবা কর্মি ব্যতীত নিজেই হুইল চেয়ারে করে চার তলায় নিয়ে গেলাম। যাক, মাকে সাথে সাথে জরুরী ভিত্তিতে অক্সিজেন, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় যা যা দরকার তা করলেন। বিশেষ করে বন্ধু ডাঃ পি. কে মজুমদার সাহেবের সহযোগীতা অবিশ্বরণীয়। তাঁর কাছে চির কৃতজ্ঞ-’২০ দিনের মতো চিকিৎসার পর কোন উন্নতি না হওয়াতে বাহিরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। অতি দুঃখের সাথে বলতে হয় শ্রদ্ধেয় ডাঃ ইসলাম সাহেব প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণ করেছে, মনে করেছিলাম চট্টগ্রাম মেডিকেলের চিকিৎসা নামীয় অভিশাপ থেকে রক্ষা পাব, কিন্তু কোথায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা? কোথায় সেবা? সকাল বেলা ডাক্তার মহোদয়গণ অর্ধশত মত ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে শিক্ষানীয় বিষয় উপদেশ দিয়ে চলে যেত। সারাদিনে একমাত্র সকাল বেলা এক টাইম ডাঃ আসতেন। কিন্তু আর সারাদিন বা সারারাত ডাঃ পাওয়া যেত না। যেমন ওয়াসার পানি সকাল ভোর বেলা এক টাইম ব্যতীত পাওয়া যায় না। তেমনি ইউ, এস, টি, সি ডাক্তারগণ। একমাত্র ঐখানে নাস, আয়া, ওয়ার্ড বয়, দারোয়ানদের উপর নির্ভর করতে হত। কে শুনে কার কথা, কে মানে কার নির্দেশ তাদের মধ্যে জরিয়ে আছে সেবার মনমানসিকতা ব্যতীত হিংসা বির্দ্বেশ। ভর্তির সময় ১০ দিনের অগ্রিম টাকা নিয়ে নেয়, বহু অনিয়ম বলতে গেলে বলে শেষ করা যাবে না। এক কথায় কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ডাক্তারী শিক্ষা দেওয়ার জন্য কিছু রোগী দরকার ব্যতীত অন্য কিছু নয়। ২০ দিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেলের ইন্টাননী ডাক্তারদের চাওয়া ও পাওয়া সরকারের সাথে দর কষা -কষির পর ধর্মঘট নামিয় অভিশাপ শেষ হল, খুলে গেল মেডিকেলের সকল দরজা জানালা। রোগীরা আশ্বস্ত হল চিকিৎসা না পেলে ও অন্তত পক্ষে আলো বাতাস পাবে। ঐ সময় সেই সুযোগে মাকে ইউ, এস, টি, সি থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে মানসিক বিভাগে শ্রদ্ধেয় মানসিক ডাক্তার হাসান সাহেবের অধিনে ভর্তি করে দিলাম। বিশেষ করে বন্ধু ওয়ার্ড মাষ্টার শাহ ইমরান সাহেবের সহযোগিতা অস্বীকার করার মত নয়। মাকে প্রায় ৬ মাস পর ( বাদুর তলা জঙ্গি শাহ লেইনস্থ) বাসায় নিয়ে আসলাম পরে বাড়িতে নিয়ে গেলাম। মা দির্ঘ্যদিন পর গ্রামের বাড়িতে যাবে রোগ মুক্ত শরীরে) কি মহাখুশী এখনও স্মৃতি হয়ে আছে। মায়ের অমৃত হাসি পূর্ণমাসি চাঁদের চেয়েও সুন্দর মনে হয়েছে। বিশেষ করে আমার মা গ্রামের বাড়ির প্রতি দুর্বল ছিল। বাড়ির প্রতিবেশীদের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ছিল প্রবল। যা মায়ের অসুস্থ ও মৃত্যুতে আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। যদিও বাড়িতে ছিল না, নিয়মিত মানসিক রোগের ঔষুধ পাঠাতে হত শহর থেকে, মা- যে অভাগীনি ছিল তার বলার অবকাশ নেই। মা- এক কথায় আমাকে নিয়ে বিভিন্ন স্বপ্ন দেখতো কারণ আমার মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান। পরে আমার আরো দুই জন ছোট ভাই জন্ম হয়েছে তার মধ্যে একেবারে ছোট ভাই আকতার নিখোঁজ রয়েছে মা ছেলে যে হবে তা কেউ বিশ্বাস করতে পারে নাই। যার ৭টা মেয়ে হয়েছে সেই কিভাবে বিশ্বাস করবে ছেলে হওয়ার কথা? মা কিন্তু একটি ছেলে সন্তানের আশায় কত ফকির মিচকিনকে ভাত খাওয়াইছেন। কত জার পোকর বৈদ্যদের বাড়িতে গিয়ে কত তাবিজ- তুবুজ নিয়েছেন যা অতি গোপণীয় বিষয়, মায়ের ভাগ্য ভালো আমি জন্ম নিলাম, কি মহা খুশী মায়ের জীবন মনে হয় আমার জন্মের পর যে আনন্দ পাইছিলো তা হয়তো আর কখনও পাই নাই। মা রক্ষা পাইছে তখনকার সমাজের নারী বিদ্বেষী লোকের কাছ থেকে। ছেলে বা মেয়ে জন্ম নেওয়ার বিষয় কোন মহিলা বা পুরুষ দায়ী নয়। তা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কাহারো হাত নেই। এখনও গ্রামে কাহারো কাহারো ৪-৫ টি কন্যা সন্তান জন্ম হচ্ছে, কিন্তু তাদেরকে অবহেলা মুলক আচারণ করতে দ্বিধাবোধ করে না। বহু ধরনের কথা বার্তা। তাহলে বুঝতে হবে আজ থেকে ৫০ বছর পূর্বে কি ধরণের কথা বলা হতো। কারো যদি ৫-৬ টি কন্যা সন্তান জন্ম হতো তাঁকে কুকুরের সাথে বেঁধে ভাত খাওয়ার কথা, ছেলেকে দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা বলতো এমন কি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিয়ে করছে শতশত প্রমাণ আছে কিন্তু ৭-৮টি ছেলে সন্তান জন্ম নিলে কোন মেয়ে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করার কথা শুনি নাই। মা কত নির্যাতিতা তা বলা যাবে না। নতুন কাহারো বউ আনলে মাকে দেখতে দিত না। কারণ মায়ের মতো ঐ নতুন বউ কন্যা সন্তান জন্ম দেবে বলে। কোন অনুষ্ঠানে গেলে পুরা কুপালী বলে আখ্যায়িত করতো। মা আসলেই দুঃখীনি। ছোট বেলা বিয়ে হয়েছে শিশু কালে বাবার মৃত্যু (আমার নানা) পরে মায়ের একমাত্র ছোট ভাইয়ের মৃত্যু, পরে স্বামীর মৃত্যু (আমার বাবা) এক বুক আশা নিয়ে জীবন যাপন করছে তখন মাকে নিষ্ঠুর নিয়তি হাঁসি বন্ধ করে দিয়েছে ছোট ভাই আকতারের নিখোঁজের মাধ্যমে। মায়ের পাশে শেষবারের মতো থাকার জন্য মাকে মেডিকেল থেকে বাসায় নিয়ে আসলাম, মা যখন শয্যাসায়ী তখন বিশ্ব যুব উৎসবে (আফ্রিকা মহাদেশে) একমাত্র আমি যুব ফোরামে থেকে ডঃ কামাল হোসেন সাহেবের মাধ্যমে আমন্ত্রীত হয়েছি আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়াসে প্রথমে দিল্লি তারপর মসকো, তিউনিসিয়া থেকে বাইরোডে আলজেরিয়া যাওয়া প্রোগ্রাম ছিল। বিগত ৫/৮/২০০১ইং তারিখে। বাংলাদেশ থেকে ঐ অনুষ্ঠানে যোগদান কারিগণ ১১টা ৪০ মিঃ ঢাকা জিয়া বিমান বন্দর থেকে চলে গেলেন। বিশেষ করে যুব ফোরামের আহ্বায়ক এডভোকেট সগির ভাই ও মোস্তাক ভাই আমাকে পাটানোর জন্য বহু চেষ্টা করেছে কিন্তু মাকে অসুস্থ রেখে কিভাবে যাব? হয়তো বহুবার বিদেশ গেয়েছি এবং আরো যাইতে পারি কিন্তু মা একবার চলে গেলে আর ফিরে পাব না। যেমন এখন পাচ্ছি না আমার মা আমার হাতের উপর গত ২-৮-২০০১ইং, বৃহস্পিতিবার দিবাগত রাত ২টা ৩০ মি: আমার গ্রামের বাড়িতে (চরণদ্বীপ) আমাদের কাছ থেকে চির দিনের জন্য চলে গেলেন। যে স্থান থেকে কখনও ফিরে আসবে না। সবাইকে ঐ স্থানে যেতে হবে।আমার মায়ের মৃত্যুর পনের দিন পর আমার মেজবোন অর্থাৎ ১৭ই আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিকেলে ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের চিকিৎসার বিষয় হাসপাতালের বিবরণ, সাধারণ রোগীদের আহাজারি, ডাক্তার ও সেবকদের অশ্লিল আচরণ ইত্যাদি কথা মনে পড়লে মাথা ঠিক থাকে না। আমার কথা হল কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়ার অপবাদ থেকে এদেশ কখন মুক্ত হবে?
আজকাল অনেকেই মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন, যেন তাঁরা সমাজের বোঝা হয়ে গেছেন। কিন্তু, যারা নিজেদের মা-বাবাকে এমনভাবে অভ্যস্ত করতে পারেন, তাদেরকে একবার ভেবে দেখা উচিত, মা-বাবা হারানোর পর আমাদের জীবন কেমন হয়। মা-বাবা জীবনভর আমাদের জন্য ত্যাগ করেছেন, তাদের আদর ও স্নেহে আমাদের বড় করেছেন। তাদের অভাব আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মা-বাবা ছাড়া আমাদের জীবন শুধুই এক প্রকার শূন্যতা ও একাকীত্বে পরিণত হয়।
যে অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে অমূল্য, তা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার অনুভূতির মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়। আমরা হয়তো একদিন বুঝতে পারব, তাদের স্মৃতি, শিক্ষা, এবং তাদের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলোই আমাদের জীবনের অমূল্য অংশ ছিল।
একটি সমাজের সঙ্গী হিসেবে আমাদের উচিত, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা। বৃদ্ধাশ্রমে মা-বাবাকে রেখে আসার পরিবর্তে, তাদের সাথে সময় কাটানো, তাদের যত্ন নেয়া, এবং তাদের মূল্য বুঝে তাদের জীবনের প্রতি সম্মান জানানো আমাদের কর্তব্য।
মা-বাবার অভাব আমরা অনুভব করি, তাঁদের পাশে থেকে তাদের সম্মান প্রদান করে আমরা নিজেদেরও পরিপূর্ণ করতে পারি। প্রতিটি বাবা ছেলে মেয়েকে সমান দৃষ্টিতে দেখে কিনা? সমান ভাবে দেখার সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে শেষ করছি। পরিশেষে আমার মায়ের জন্য দোয়া প্রার্থনা রইল।
লেখক- প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, উপস্থাপক










