আজ কিছু স্মৃতিময় ও সত্য ঘটনা লিখতে বসলাম। এখন সর্বত্র আলোচনার বিষয় একটাই—শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের বিষয়টি বেশ জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে, কিন্তু কতটুকু সফল হবে, তা জানা নেই। এতগুলো আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনার মাঝে চট্টগ্রামে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে শিবির নাছিরের নাম। নাছির,১৯৯৮ সালের ৯ ই এপ্রিল গ্রেফতারের পর হতে যিনি দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর গত ১১ আগস্ট মুক্তি পায়, নাছির দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সোনালি জীবন ও যৌবন নষ্ট করে অবশেষে শেখ হাসিনার পতনের পর মুক্তি পেলেন। সেই আলোচিত ও সমালোচিত শিবির নাছিরের সঙ্গে আমার কিছু না বলা কথা আজ বলতে কলম ধরেছি।
আফ্রিকার বর্ণবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা যেমন একটানা দীর্ঘ ২৭ বছর জেল কেটেছেন, তেমনই একইভাবে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাগারে আটক ছিলেন নাছির। আমি সেই নাছিরকে চিনতাম নব্বই সাল থেকে। তিনি ছিলেন শান্ত, সৃষ্ট, ভদ্র, আত্মপ্রতিবাদী এক টগবগে যুবক। নাছির কখনোই জন্মগতভাবে সন্ত্রাসী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দুবাই প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তারও স্বপ্ন ছিল এই দেশের মানুষের জন্য কিছু করার। দেশের মাটির প্রতি তার ছিল অগাধ টান। সেই মাটির টানে ফিরে এসে তিনি সমাজের চোখে একজন বড় মাপের সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। কেন নাছির সন্ত্রাসী হলেন, কাদের কারণে হলেন—তার বিস্তারিত বিবরণ অন্য এক লেখায় দেব। তবুও একটু বলতেই হবে—নাছির তার নিরীহ চাচাত ভাই আফাজের হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়েই সন্ত্রাসী হয়ে ওঠেন। নাছির ছিলেন অত্যন্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী, খুবই সাহসী। তিনি তখনকার সময়ে ফটিকছড়ির ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করে রেমিট্যান্স যোদ্ধা থেকে প্রতিবাদী যোদ্ধায় পরিণত হন। তাকে এঁকে এঁকে সকল অন্যায়, অত্যাচার, হত্যা, রাহাজানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে সমাজের চোখে একজন বড় মাপের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আসলে নাছির কোনো সন্ত্রাসী ছিলেন না; তিনি ছিলেন আত্মপ্রতিবাদী। তবে তার প্রতিবাদ ছিল অস্ত্রের বিপরীতে অস্ত্র ব্যবহার, হত্যার বিপরীতে হত্যা।
নাছিরের নাম শুনলে মানুষ আতঙ্কিত হতো। চকবাজার এলাকায় নাছির যখন ঘাঁটি গেড়েছিলেন, তখন তার সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। আমি নাছিরকে খুব কাছ থেকে দেখেছি—তিনি অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তিনি ন্যায়বিচারের ভূমিকায় ছিলেন এবং কখনোই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। তার বড় সম্পদ ছিল চরিত্র; তিনি কখনো নারীবাজি বা মদের আসক্ত ছিলেন না, এবং এসব বিষয় তিনি মেনে নিতেন না।আমি লেখা শুরু করেছিলাম ১৯৮৮ সালে, তবে নিয়মিত লেখালেখি করছি ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর থেকে। আমরা এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের রাজপথে ছিলাম। নাছিরের সঙ্গে যখন আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, তখন আমি অনুসন্ধানী ক্রাইম নিউজ করতাম, বিশেষ করে তখনকার একমাত্র ক্রাইম ম্যাগাজিন "অপরাধ জগতে"। আমার সোর্স ছিল ভালো, আমি যা নিউজ করতাম, তা প্রশাসন অনুসরণ করতো। চট্টগ্রামে যত ধরনের ক্রাইম ঘটত, সবগুলোর তথ্য আমার কাছে চলে আসত, আমি হত্যাকাণ্ডসহ বড় বড় অপরাধের রহস্য উদঘাটন করতাম, যা প্রশাসন করতে পারত না। প্রায় সময় পুলিশ আমার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতো, সেই সুবাদে পুলিশের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যা এখনো চলমান রয়েছে।এখন মূল কথায় আসি—নাছিরের সঙ্গে আমি কিভাবে মামলার পার্টনার হলাম! ঘটনাটি ১৯৯৭ সালের। নাছির গ্রেফতার হওয়ার আগে তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, এবি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র, এম এ মান্নান মন্ত্রী, শ্রমিক লীগ নেতা লিয়াকত আলী খান কমিশনার। সেই লিয়াকত আলী খানের এলাকার দুবাইওয়ালা সালামকে অস্ত্র কেনার টাকার জন্য অপহরণ করেছিল শিবিরের খুকুমণি। এখন মনিও নেই, লিয়াকত আলী খানও নেই; তারা দুজনই নিহত হয়েছেন। তা নিয়ে আমি বিস্তারিত পরে লিখবো। খুকুমণির সঙ্গে ছিল বোয়ালখালীর জমির, হাবিব, খান, সফিসহ একদল সন্ত্রাসী। তখন সালামের অপহরণ খুবই আলোচিত ঘটনা ছিল। সেই সালামকে উদ্ধারের জন্য আমি পুলিশের পক্ষে ভূমিকা রাখতে গিয়ে নাছিরের গ্রুপের হুমায়ুনদের কুনজরে পড়লাম। তারা মনে করেছিল, আমি তাদেরকে পুলিশ দিয়ে ডিস্টার্ব দিচ্ছি, কারণ তারা জানত, পুলিশ আমার কথায় সালামকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। আমি নিজেও অপহরণ কারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম সালামকে উদ্ধারের জন্য। তখন অপহরণকারীরা সালামকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া শাহা বিল এলাকায় নিয়ে পানির বোর্ডের মধ্যে জিম্মি করে রেখেছিল অন্যদিকে, আমাকে ভুল বুঝে হুমায়ুনসহ কয়েকজন আমাকে গুলি করে হত্যা করার জন্য চকবাজার ফোর স্টার হোটেলের আমার রুমে আক্রমণ করে। আমি তখন ফোর স্টার হোটেলের নিয়মিত ২০৪ নম্বর কক্ষে থাকতাম। আমার বন্ধু খোকনের কারণে সেদিন তাদের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাই। বন্ধু খোকন এখন নেই। আমাকে হত্যার বিষয়টি নাছিরের নজরে এলে তিনি তা কঠোরভাবে দমন করেন। নাছিরের হস্তক্ষেপ না হলে আমি নিশ্চিত তাদের হাতে মারা যেতাম। পরে আমি এবং নাছিরের জোর তৎপরতায় সালাম উদ্ধার হয়। আমি দেখেছি, নাছির সালামকে উদ্ধারের জন্য পাগল হয়ে গিয়ে ছিলেন। তার ন্যায় আচরণের ভূমিকার আমি সাক্ষী।অথচ সালামকে আমরা উদ্ধার করলাম, কিন্তু পরে মামলায় আমাদেরকে আসামি করলেন কমিশনার লিয়াকতের কথায় এসআই আবুল হাসেম। আমি বিচারক রোহী দাশের সঙ্গে দেখা করে মামলার জামিন নিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন মামলার লড়াই করে আমি এবং নাছির বেকসুর খালাস পেয়েছি। নাছির একদিন কোর্টে হাজিরা দেওয়ার সময় বলেছিলেন, "কামাল ভাই, কমিশনার লিয়াকত ও মন্ত্রী মান্নানের কথা শুনে পুলিশ আমাদেরকে কেন মিথ্যা আসামি করলো? আপনি তার বিরুদ্ধে লিখুন।" আমি সেই পুলিশের বিরুদ্ধে লিখেছিলাম। তখন এস আই আবুল হাসেম স্বীকার করেছিলেন, মন্ত্রী মান্নান ও কমিশনার লিয়াকতের চাপের কারণে আমাদেরকে আসামি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে আমার সাথে কমিশনার লিয়াকতের সাথে সম্পর্ক ভালো ছিলোনা, কমিশনার লিয়াকতের বিরুদ্ধে আমি একটা নিউজ করেছিলাম, লিয়াকত তখন সিডি এ-র সদস্য থাকাকালীন দৈনিক পূর্বকোনের পাশের একটি সিডি এ-র জায়গায় নিয়ে তিনি এক নিরীহ পরিবারকে হয়রানি করেছিল আমি তা নিয়ে লিয়াকতের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ভাবে লিখার কারণে লিয়াকত আমার উপর ক্ষিপ্ত ছিলো"
অথচ অপহৃত সালাম ও তার পরিবার আমাদের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞ ছিলেন। নাছিরের সঙ্গে মহিম কারাগারে আটক থাকার সময় আমি অফিস কল দিয়ে ছাত্রলীগের মহিমকে মিলিয়ে দিয়ে ছিলাম। তখন জেলার ছিলেন আমার বন্ধু আক্কাস আলী আখন্দ। তবে সেই সময় যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন প্রয়াত আমাদের বন্ধু বাকলিয়া কমিশনার মাহমুদ। মহিমের ব্যবসায়ী পার্টনার ছিলেন নাছিরের কাছের মানুষ। আমি তখন দেখেছি, নাছির কত বড় মনের মানুষ। যে মহিমকে নাছির পেলে হত্যা করতেন আর মহিম নাছিরকে পেলে ছাড়তেন না, সেই খানে নাছির মহিমকে খুবই আপন করে নিয়েছিলেন। পরে মহিম কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে RAB বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন, কিন্তু মহিম নিয়মিত নাছিরকে স্মরণ করতেন কারাগারে মহিমের প্রতি নাছিরের মানবতা ও আন্তরিকতা মনের জন্য।আসলে একসময় নাছিরের পক্ষে সত্যি কথা লেখার মানুষ ছিল না, শুধু নাছিরের বিরুদ্ধে লেখাই ছিল আমাদের সাংবাদিকদের কাজ। নাছির আটক হওয়ার পর তার নিরপরাধ আপন ভাই নাদিমকে ফটিকছড়িতে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছিল। এরপর নাছিরের বোন লিলির বাসায়ও অনেক ঝামেলা হয়েছিল। তখন আমি তাদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলাম। লিলির বাসা ছিল প্যারেড কর্নারে, আমি বহুবার সেখানে গিয়েছি। তখন অনেকে লিলিকে নিয়ে নাছিরের সঙ্গে জড়িয়ে চাঁদাবাজির নিউজ করেছিলেন। আজ নাছির যখন দীর্ঘ ২৭ বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন, দেখা যাচ্ছে অনেকেই নাছিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে -নাছির- একজন সাহসী আত্ম প্রতিবাদি-নাছিরের
জীবনকে কোনো সাধারণ জীবনের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ২৭ বছরের একটি দীর্ঘ সময় তিনি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। এই সময়টা শুধু তার জীবন থেকেই নয়, আমাদের সমাজ থেকেও চিরতরে হারিয়ে গেছে। সমাজ তাকে 'সন্ত্রাসী' হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কিন্তু তার জীবনের গভীরে এক ভিন্ন গল্প লুকিয়ে রয়েছে, যা আমাদের জানা উচিত।নাছির তার জীবনের প্রথম দিকে ছিলেন এক সৎ ও প্রতিবাদী যুবক। তিনি সমাজের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সব সময় সরব ছিলেন। তার ভেতরে ছিল অগাধ সাহস, যা তাকে সাধারণের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। যখন সমাজের দুর্নীতি ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা আসে, নাছির কখনো পিছপা হননি। এই অসাধারণ সাহস ও আত্মপ্রতিষ্ঠানের জন্যই তিনি আজও অনেকের মনে বেঁচে আছেন। আমরা যদি
নাছিরের জীবনের দিকে গভীরভাবে তাকাই, তবে দেখতে পাব যে তিনি কখনোই সন্ত্রাসী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একজন আত্মপ্রতিরোধের যোদ্ধা। তার প্রতিবাদ ছিল নির্যাতিতদের পক্ষে, সেই সমস্ত মানুষদের জন্য যারা নিজেদের পক্ষে কথা বলতে পারেনি। সমাজের চোখে যদিও তিনি 'সন্ত্রাসী' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী নেতা, যিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করেছেন।নাছিরের চরিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার মানবতা। তার সাথে যারা সময় কাটিয়েছেন, তারা জানেন যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং সহানুভূতিশীল। তিনি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি এবং সব সময়ই একটি সুষ্ঠু সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি যে দায়িত্ববোধ এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, তা আমাদের সমাজে বিরল।আজ যখন আমরা তার জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমাদের উচিত তার অবদানগুলোকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা। নাছির শুধুমাত্র একজন যোদ্ধা নন, তিনি আমাদের সমাজের এক প্রামাণ্য দলিল, যা প্রমাণ করে যে একক ব্যক্তিও সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করতে পারেন। তবে সময়ের
আবর্তনে, নাছিরের জীবন এখন প্রবাহিত হয়েছে তার যৌবনের পরন্ত বিকেলের দিকে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি হয়তো তার জীবনের কঠিন সংগ্রাম গুলোর দিকে ফিরে তাকান, এবং সমাজের জন্য যা করেছেন, তাতে কিছুটা হলেও সন্তুষ্টির অনুভূতি পান। কিন্তু নাছিরের গল্প এখানেই শেষ নয়। আগামী দিনের জন্য আমাদের শুভকামনা থাকবে, যাতে তিনি তার অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নতুন একটি সফল অধ্যায় শুরু করতে পারেন। আমাদের বিশ্বাস, নাছিরের এই নতুন যাত্রায়ও তিনি আগের মতোই সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ থাকবেন, এবং তার এই জীবন আমাদের সমাজের জন্য একটি নতুন দিশা দেখাবে।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব- চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।