মো. কামাল উদ্দিনঃ
এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে অন্য কোনো স্থানে জনগণকে এমন সংঘবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আন্দোলনের রাজনীতি করেছেন ও দল গঠন করেছেন, মুক্তির কথা বলেছেন। তিনি লাখ লাখ জনতাকে সংঘবদ্ধ করতেন আন্দোলনে, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যাতে গণতান্ত্রিক পন্থার মধ্য দিয়ে জনমত সৃষ্টি করে অধিকার আদায় করা যায় এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা যায়। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বিভিন্ন জায়গায় তিনি অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কুফল সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী রাজনীতি না করতে পারলে যে দেশ সন্ত্রাসী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হতে পারে, তার আশঙ্কাও তিনি প্রকাশ করেছেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সরকার যখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের নির্বিচারে জেল–জুলুমের সম্মুখীন করে এবং গণমাধ্যমে খবর প্রচারের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনার কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখছেন:‘খবরের কাগজ এসে গেল। দেখে আমি শিহরিয়া উঠলাম, এ দেশ থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ চিরদিনের জন্য এরা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। জাতীয় পরিষদে “সরকারী গোপন তথ্য আইন সংশোধনী বিল” আনা হয়েছে। কেউ সমালোচনামূলক যে কোনো কথা বলুন না কেন মামলা দায়ের হবে। ... বক্তৃতা করার জন্য ১২৪ ধারা ৭(৩)...এবং ডিপি আর রুল দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মোটমাট পাঁচটি মামলা আর অন্যান্য আরও তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।...আমার ভয় হচ্ছে এরা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতেছে। আমরা এ পথে বিশ্বাস করি না।...আমরা যারা গণতন্ত্রের পথে দেশের মঙ্গল করতে চাই, আমাদের পথ বন্ধ হতে চলেছে।’
১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭০—এই ২৩ বছরে তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমাগত বেগবান হয়েছে, কিন্তু তিনি সব সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিলেন। যখনই পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছে, তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেছেন, যদিও বারবার শাসকশ্রেণি নির্বাচনের ফলাফলকে বানচাল করার চেষ্টা করেছে। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সুন্দরভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনকে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মুক্তির আন্দোলন হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।... নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলব, এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।...আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ জনসম্প্রীতি: জনগণের রাজনীতি
অনেক সময়ই যাঁরা বড়মাপের নেতা হন, তাঁরা জনগণের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হন না। তাঁরা জনগণকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালনার কথা বলেন। তাঁরা অনেক সময় থেকে যান জনগণের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু এর ব্যতিক্রম। তিনি সব সময় বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতেন। এবং তাই তিনি বারবার একদিকে তাঁর জনগণের জন্য ভালোবাসা এবং অন্যদিকে জনগণের তাঁর জন্য ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন নেতার ভাষণ আমি যখন পড়ি এবং তাঁদের ভাষণের সঙ্গে যখন আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তুলনা করি, তখন আমার কাছে তাঁর একটি অভিব্যক্তি, ‘জনগণের প্রতি ভালোবাসা’, তা অনন্য বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য তাঁর যে ভালোবাসা এবং প্রতিদানে জনগণের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তার কথা তিনি নানা ভাষণে বারবার ব্যক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সমাজতন্ত্র—এসব নানা রকমের আদর্শের কথা বলতেন, তবে সাধারণ মানুষের দুঃখ–কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়ানো, জনসাধারণ কোন কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে তার দিকেও তাঁর দৃষ্টি ছিল। জনসাধারণের ইস্যু নিয়েই তিনি কথা বলতেন, রাজনীতি করতেন। আমরা দেখতে পাই যখন তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তখন তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খুলে কাজ করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন দেশে খাদ্যের অভাব, তখন তিনি সুষম খাদ্যবণ্টনের আন্দোলন, ভুখা মানুষের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করেন। দাঙ্গাকবলিত মানুষকে উদ্ধারের জন্য কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছিল না, সাধারণ মানুষের সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে তুলেছিলেন।
তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই দেশে বন্যা কিংবা খাদ্যাভাব অথবা দ্রব্যমূল্য বা কর বৃদ্ধি হলে তাঁর কত দুশ্চিন্তা হতো। জনসাধারণের ওপর যেসব ইস্যু প্রভাব ফেলে, তার সবই তার রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার মধ্যে ছিল। যেমন ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখছেন:
‘খবরের কাগজ এসেছে...সিলেটের বন্যায় দেড় লক্ষ লোক গৃহহীন, ১০ জন মারা গেছে। কত যে গবাদিপশু ভাসাইয়া নিয়া গেছে তার কি কোনো সীমা আছে। কি করে এ দেশের লোক বাঁচবে তা ভাবতেও পারি না।...কত কর মানুষ দিবে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী শোয়েব সাহেব বলেছেন জনসাধারণ অধিকতর সচ্ছল হইয়াছে তাই কর ধার্য করেছেন। তিনি যাদের মুখপাত্র এবং যাদের স্বার্থে কাজ করেছেন তারা সচ্ছল হয়েছে। তাদের করের বোঝা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শিল্পপতি ও বড় ব্যবসায়ীরা আনন্দিতই শুধু হন নাই, প্রকাশ্যে মন্ত্রীকে মোবারকবাদ দিয়ে চলেছেন। আর জনগণ এই গণবিরোধী বাজেট যে গরিব মারার বাজেট বলে চিৎকার করতে শুরু করেছে।’
যারা সমাজে অনাদৃত ও বঞ্চিত, তাদের প্রতি তার বিশেষ সহমর্মিতা ছিল। ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটিতে তিনি বিভিন্ন কয়েদির জীবনবৃত্তান্ত, দুঃখ–কষ্ট বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে পাগল কয়েদিদের প্রতি তাঁর মমতাবোধ আমরা লক্ষ করি। জেলের কর্মচারীদের সঙ্গেও তাঁর সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। তিনি জেলে নিজ হাতে রান্না করেছেন, বাগান করেছেন এবং তার সঙ্গে ডায়েরিও লিখেছেন। আওয়ামী লীগের অগণিত কর্মীর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখেরও তিনি খবর রাখতেন। তাঁর দুটি বইয়েই আমরা তাঁর বহু সহকর্মীর এবং আওয়ামী লীগের নাম জানা-অজানা বহু কর্মীর ত্যাগ–তিতিক্ষার বর্ণনা পাই। বঙ্গবন্ধু একদিকে ছিলেন সাধারণ মানুষের লোক, মানুষের কাছ থেকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি জেনেছেন, শিখেছেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জনতার নেতা। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই তিনি সামনের দিকে, প্রগতির দিকে নিতে চেয়েছেন। সব বিষয়ে তিনি শেষ ভরসা করতেন মানুষের ওপরে। তাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি জনগণকে আহ্বান করেন, বলেন ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ স্বাধীনতাসংগ্রামে যুক্ত হওয়ার জন্য। জাগ্রত জনতার ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি সেদিন বলতে পেরেছিলেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবা না।...রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।’
অসাম্প্রদায়িকতা: সকল নাগরিকের সম–অধিকার যদিও বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সুসংহত করেছিলেন, কিন্তু তিনি কখনো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি ও সংঘাতের রাজনীতি করেননি। বহু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এক জাতিকে অন্য জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শোষকদের হাত থেকে বাঙালির মুক্তি কামনার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। বাঙালিকে অন্য কোনো জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণে প্ররোচনা দেননি। সম্প্রতি আমরা পশ্চিমের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান দেখছি, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তিক্ততা এবং সংখ্যাগুরুদের সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব লক্ষ করছি। বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের চিন্তা ছিল এর বিপরীত। তিনি সব গোষ্ঠীর সহাবস্থান এবং সব নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি নিজেকে একাধারে বাঙালি এবং মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কোনো অমানবিক কাজের সমর্থন কখনো করেননি। তিনি সব সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই আমরা দেখি তাঁকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী তাঁদেরকে এই দিবসটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন সোহরাওয়ার্দী সরকারকে কেউই দোষারোপ করতে না পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কলকাতায় এবং পরে নোয়াখালীতে। কলকাতায় তিনি হিন্দু, মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের লোককেই দাঙ্গা দেখে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। এরপর যখন মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য সোহরাওয়ার্দী যুক্ত হয়েছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সেই প্রচেষ্টায় যুক্ত হন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বঙ্গবন্ধু যখন কলকাতা থেকে চলে আসেন, তখন সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেন তিনি যেন পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কাজ করেন, যাতে হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য না হয়। সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেছিলেন: চেষ্টা করো যাতে হিন্দুরা চলে না আসে। ওরা এদিকে এলেই গোলমাল করবে, তাতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলায় ছুটবে। যদি পশ্চিম বাংলা, বিহার ও আসামের মুসলমান একবার পূর্ব বাংলার দিকে রওনা হয়, তবে...এত লোকের জায়গাটা তোমরা কোথায় দিবা...’১৩
ঢাকায় ফিরে এসে গণতান্ত্রিক যুবলীগে যোগ দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক মিলনকে একমাত্র কর্মসূচি হিসেবে নেওয়ার ওপর জোর দেন। পূর্ব বাংলায় যাতে দাঙ্গা না হয়, তার জন্য তিনি সব সময়ই সতর্ক ছিলেন। দাঙ্গা বলতে যে শুধু হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা তাই নয়, সব রকমের দাঙ্গারই তিনি বিরোধী ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে লাহোরে ১৯৫৩ সালের কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার তিনি নিন্দা করেছেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিপক্ষে ছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা যাতে বিস্তৃতি লাভ না করে, তার জন্য তিনি কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর তিনি সারা বাংলাদেশে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণেও তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন: মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যাঁরা আছেন, তাঁরা আমাদের ভাই, তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, কোরআন শরিফ পড়তেন। তিনি সব নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে তিনি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন।
সমাজতন্ত্র: শোষণমুক্তি ও বৈষম্যহীনতা
তাঁর আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখছেন:
‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।’ ১৫
সমাজতন্ত্র বলতে তিনি প্রাধানত শোষণমুক্ত এবং বৈষম্যহীন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতেন। ১৯৫২ সালে চীন যাবার পর চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে পার্থক্য তিনি দেখেছেন, তা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছে। এই দুই দেশের পার্থক্য সম্বন্ধে তিনি লিখছেন: ‘তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হল তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ ও এ দেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন।’
শোষণমুক্তি এবং বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের যে দায়িত্ব আছে, তা তিনি বিশ্বাস করতেন। চীনে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন চীন সরকার জনসাধারণের জন্য কী কী কাজ করছে, সে দেশে প্রাধান্য পাচ্ছে শিল্পকারখানার উন্নতি, শৌখিন দ্রব্য নয়।
তিনি লিখছেন:
‘ভূমিহীন কৃষক জমির মালিক হয়েছে। আজ চীন দেশ কৃষক–মজুরের দেশ। শোষক শ্রেণি শেষ হয়ে গেছে।’ ‘নতুন নতুন স্কুল, কলেজ গড়ে উঠেছে চারিদিকে। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভার সরকার নিয়েছে।’ ‘কারাগারের রোজনামচা’য়ও তিনি লিখেছেন বৈষম্যহীনতার কথা। তিনি লিখেছেন যে কারাগারে তিনি সবার সঙ্গে একসঙ্গে খেতেন, যেমন ব্যবস্থা ছিল তাঁর নিজ বাড়িতে: ‘আমি যাহা খাই ওদের না দিয়ে খাই না। আমার বাড়িতেও একই নিয়ম।...আজ নতুন নতুন শিল্পপতিদের ও ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও দুই পাক হয়। সাহেবদের জন্য আলাদা, চাকরদের জন্য আলাদা। আমাদের দেশে যখন একচেটিয়া সামন্তবাদ ছিল, তখন জমিদার, তালুকদারদের বাড়িতেও এই ব্যবস্থা ছিল না। আজ সামন্ততন্ত্রের কবরের উপর শিল্প ও বাণিজ্য সভ্যতার সৌধ গড়ে উঠতে শুরু করেছে, তখনই এই রকম মানসিক পরিবর্তনও শুরু হয়েছে। সামন্ততন্ত্রের শোষণের চেয়েও এই শোষণ ভয়াবহ।’স্বাধীনতার পর তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় তিনি কোনো বৈষম্য দেখতে চাননি। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন:
‘বাংলাদেশে মানুষে মানুষে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে এবং উচ্চতর আয় ও নিম্নতম উপার্জনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এত দিন ধরে বিরাজ করছিল, সেটা দূর করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা ও সংবিধানের চার মূলনীতি
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারার যে চারটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমি আলোচনা করেছি, তার প্রতিফলন আমরা আমাদের সংবিধানের চার মূলনীতিতে দেখতে পাই। তাঁর কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য তিনি খুব সহজ দুটি শব্দে প্রায়ই ব্যক্ত করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে ‘সোনার বাংলা গড়ে তোলা’, কিংবা তিনি বলতেন ‘দুঃখী মানুষের মুখে তিনি হাসি ফোটাতে চান’। বঙ্গবন্ধু তাঁর জনসভায় খুবই সরল ভাষায় বক্তৃতা করতেন। তাই তাঁর বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে এক জনসভায় তিনি বলেন: আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসেখেলে বেড়াক। আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।’তাঁর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিংবা অন্য তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তিনি ঠিকই জানতেন জীবনে একটি হাসি কত কথা
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।