দেলওয়ার হোসেন, তখনকার বাঁশখালীর সেই অজপাড়া গাঁয়ের- বর্তমান পৌরসভা ৫ নং ওয়ার্ড, সিকদার পাড়া, জলদি গ্রামের এক স্বপ্ন দেখা মানুষ, যিনি নিজের জীবনটাকে মসৃণ কোনো পথ হিসেবে দেখেননি। চট্টগ্রামের পাহাড়-নদী-সমুদ্রের পবিত্র বাতাসে শ্বাস নেওয়ার মতোই তিনি স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি দায়িত্বকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর দায়িত্বের কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না, কোনো সম্মাননায়ও তা যথার্থভাবে পূর্ণ হবে না। তিনি কাজ করতেন মাটির মানুষের জন্য, সেই সব সাধারণ মানুষের জন্য, যারা স্বাস্থ্যসেবার সংস্পর্শে এসে কিছুটা হলেও সুস্থতা ফিরে পেতে চেয়েছে। আর তাই, গত ১ নভেম্বর তাঁর অবসরের দিনটি শুধুই একটি বিদায়ের দিন ছিল না; এটি ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্যসেবার এক আদর্শিক অধ্যায়ের অবসান।
অনুষ্ঠানে যখন তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন দেলওয়ার হোসেনের চোখে একদিকে ছিল গর্ব আর অন্যদিকে ছিল মৃদু বিষণ্ণতার ছায়া। তিনি জানেন, দীর্ঘ বছরের এই অমর যাত্রা তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু কিছু প্রাপ্য সম্মান, কিছু গভীর স্বীকৃতি তাঁকে এড়িয়ে গেছে। তাঁর কপালে সেই সাফল্যের মুকুট নয়, বরং বিরুদ্ধ মতের কাঁটাগুলোই ছিল বেশি। নানান প্রতিবন্ধকতা, প্রভাবশালীদের রোষ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মধ্যেই সবকিছুকে জয় করে তিনি দাঁড়িয়ে থেকেছেন সততার মশাল হাতে। দেলওয়ার হোসেনের মেয়ে সাবিহা আকতার সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাবার জন্য ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় ভরপুর একটি আবৃত্তি করেন। তাঁর কণ্ঠে তখন যেন এক অসম্ভব মায়া, করুণার সুর ধ্বনিত হচ্ছিল। বাবার সততার কথা, আদর্শের কথা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন দৃঢ়তার কথা, সাবিহা এমনভাবে তুলে ধরলেন যে উপস্থিত সকলেই আবেগাপ্লুত হয়ে উঠল। মেয়ের মুখে বাবার কর্মমুখর জীবনের এই শেষ উপাখ্যানটি যেন এক অমলিন কাব্যের মতো শোনাচ্ছিল। দেলওয়ার হোসেনের সহকর্মীরা যখন তাঁর কথা বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, তাঁরা এক স্থায়ী শক্তিকে হারাতে চলেছেন। তাঁরা জানেন, এই মানুষটি কেবল তাঁদের সহকর্মী নন, তিনি তাঁদের সবার জন্য এক জীবন্ত আদর্শ। তাঁর কর্মপ্রণালী, প্রতিটি দায়িত্ব নিষ্ঠাভরে পালন করার দৃঢ়তা, স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর অবদান—সবকিছু তাঁদের কাছে এক অনন্য শিক্ষার বিষয়। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন, কীভাবে নিজের দায়িত্বকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হয়, কীভাবে অসহায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে কাজ করতে হয়।
এই বিদায়বেলায় দেলওয়ার হোসেন জানেন, তিনি নিজের জীবনকে পূর্ণতা দিয়েছেন, তাঁর সততা আর নিষ্ঠার কোনো ক্ষুদ্রতম পদক্ষেপও বৃথা যায়নি। তবু, এই দীর্ঘ ৩৫ বছরের প্রতিটি অধ্যায়ের মধ্যে কিছু না পাওয়ার বেদনা জমে আছে, কিছু গভীর হতাশা। হয়তো তাঁর এই অবসরে যাওয়ার ক্ষণে সেই বেদনার ভার কিছুটা কমল, কারণ তাঁর সহকর্মী, বন্ধুরা তাঁর প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার স্মারক হয়ে তাঁর এই বিদায়বেলা আলোকিত করল।
দেলওয়ার হোসেনের জীবনের গল্প যেন এক অসামান্য মহাকাব্য। সততা, নিষ্ঠা, সাহস, এবং মানবিকতা—এই গুণগুলোই তাঁকে একজন মহান কর্মী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাঁর অবদান শুধু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্যসেবাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁর জীবনপ্রবাহে সেই আদর্শিক স্রোতও প্রবাহিত হয়েছে, যা প্রতিটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।নির্ঝর স্রোতের মতো একটি জীবন যাপন করে, বাঁশখালীর সেই উজ্জ্বল সন্তান দেওওয়ার হোসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর কর্মজীবনের সোনালী সময় উৎসর্গ করেছেন। বছরের পর বছর নিজের নিষ্ঠা, দক্ষতা, এবং সততার গুণে এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছেন, তবুও অবসরের শেষে তাঁর হৃদয়ে কিছু না পাওয়ার বেদনা জমা হয়েছে।
গত ১ নভেম্বর, যেদিন তিনি সিটি করপোরেশন থেকে অবসর গ্রহণ করেন, সেদিন তাঁর বিদায় উপলক্ষে একটি সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বহু সহকর্মী, বন্ধুরা তাঁর পাশে দাঁড়ালেও, তাঁর মনের অপ্রাপ্তির বেদনাটি যেন আড়ালেই রয়ে গেল। কারণ তিনি জানেন, তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রম আর নিষ্ঠার যথার্থ স্বীকৃতি বা প্রতিদান তিনি পাননি। দেলওয়ার ভাই একাধারে অন্যায়ের প্রতিবাদকারী এবং নীতির প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। তাঁর নৈতিক অবস্থান তাঁকে সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে, এবং এজন্যই হয়তো কিছু প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়েছিলেন, যা তাঁর এই অবহেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বিদায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন তাঁর মেয়ে, সুকণ্ঠী আবৃত্তিকার সাবিহা আকতার। বাবার সম্মাননায় সিক্ত করে তিনি যেন বেদনাবিধুর মুহূর্তটিকে সাহিত্যের মতো এক শিল্পীসুলভ আবেগে উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানের পরিবেশে করুণার ছোঁয়া ছিল, তবু মেয়ের কণ্ঠে বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা যেন এক মধুর শেষ সুর হিসেবে থেকে গেল সবার মনে। দেলওয়ার হোসেনের জীবনের গল্প হয়তো কোনো দুঃখের উপাখ্যান, কিন্তু সেই জীবনের রং, গভীরতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার কাহিনী সমাজে অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর অবদান সময়ের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকবে, যদিও সেই স্বীকৃতির অভাব আজ তাঁকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।
বিরামপুরের মহামান্য অতিথি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পূর্ণকালীন সন্মানিত মেয়র, জেনারেল হাসানুল পরিকল্পনার কর্মধারা (প্রঃ) গননার রহমান (দেশের সেনা হোসদ্ধ কর্মচারীদের বিদায় মহাবর্ণ সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কারনে কর্পোরেশনের সন্মানিত সংযোগ সংহিত ডা. মো. তরিকুল ইসলাম, গনযান করিমজনকতা প্রধান বিশেষ অতিথি, দেশের প্রাচ্য রাষ্ট্রের প্রধান অতিথি:সংবর্ধিত বিদায়ী: মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন পরিকল্পনার কর্মধারা (প্রঃ) করিয়া।
আশাবাদবন্ধু বক্তা: গা. মো. ইলিয়াস চৌধুরী সহকারি কর্মজীবী অধিকারী, মানচেষ্টিন ডনশ্যার্ক কনফেডারেশন। হা(মো. আবু তাহের), সমূহ প্রচারণিক কর্ণার।তামা আহমদ, তাবাসি আমরুসিন আসহিন সভা ও অধিষ্ঠানের হাকিম সেবর ডা. মো. কামাল আহসান।ফুলদিয়ে বরণ এবং ক্রেষ্ট ও অতবন প্রণয় পত্র ডা. মো. কামাল আহসান। আবৃত্তি অনুষ্ঠান প্রধান: মেইডিকেল অধিকারী জনাব ডা. ডম্পকার। আলোচনায় প্রধান পুরস্কার: ডা. তরিকুল ইসলাম। কর্পোরেশনের সভাপতিত্ব: মিয়া আবুল কাদের। অনুমোদন মহানুভবতা করেন: সম্মানিত অধ্যক্ষ। কর্ম বীর দেলওয়ার হোসেন, এক সময়ের নিরলস সেবাশ্রমিক, যিনি কর্মজীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। আজ অবসরের আঙ্গিনায় এসে তিনি এক নতুন সত্তার সন্ধানে মগ্ন, যার নাম ‘কলম সৈনিক’। বহুদিন ধরে তার মধ্যে যে প্রতিভা ছিল নিঃশব্দে লুকিয়ে, আজ সেই প্রতিভা জেগে উঠছে কাগজের বুকে। তিনি কলম যুদ্ধাদের কাতারে দাঁড়াতে চান, তার কলমে ফুটে উঠবে জীবনের অভিজ্ঞতা, মানবতা আর চেতনার গল্প। নিজেকে সাহিত্যের পথে উৎসর্গ করার যে প্রতিজ্ঞা করেছেন, তা যেন এক নতুন সূর্যের আগমন। কলম হয়ে উঠবে তার অস্ত্র, আর তার প্রতিটি শব্দ হবে বীরত্বের প্রকাশ। অবসরের প্রতিটি ক্ষণকে তিনি লিখনের মাধ্যমে সাজিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন, যেখানে থাকবে আত্মার মুক্তি, স্বদেশের মঙ্গল, আর মানবতার জয়গান।এই সাহসী যোদ্ধার পথচলায় যেন লেখা হয়ে ওঠে এক মহাকাব্যের অধ্যায়, আর তার লেখা আলোকিত করে মানবতার পথ।
লেখকঃ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান ও যুগ্ন সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ ও The Daily banner এবং গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক।