নিউজ ডেস্ক

বাবা দিবস নিয়ে কিছু কথা-মো:কামাল উদ্দিন। 

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

 

সন্তান জন্মের পর বাবার জীবনে যে আনন্দের আষাঢ় আলো নেমে আসে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এটি এক অপার্থিব অনুভূতি, যা শুধু হৃদয় দিয়েই অনুধাবন করা যায়।

যখন একটি শিশু প্রথম পৃথিবীতে আসে, তখন বাবার চোখে প্রথম যে আলোর ঝলকানি দেখা দেয়, তা সমস্ত ক্লান্তি এবং কষ্টকে মুহূর্তেই মুছে ফেলে। সেই মুহূর্তে বাবা অনুভব করেন এক নতুন জীবন, এক নতুন দায়িত্বের শুরু। সন্তানের প্রথম কান্না, প্রথম শ্বাস-প্রশ্বাস, বাবার হৃদয়ে গভীর ভালোবাসার বন্যা বইয়ে দেয়। বাবা যখন প্রথমবার তার শিশুকে কোলে তুলে নেন, তখন তিনি অনুভব করেন এক অদ্ভুত মমত্ববোধ। ছোট্ট সেই হাত-পা, কোমল মুখের হাসি, বাবার মনে এক অপার আনন্দের সঞ্চার করে। তিনি তখন ভুলে যান জীবনের সমস্ত কষ্ট, সমস্ত দুশ্চিন্তা। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি খুঁজে পান জীবনের প্রকৃত অর্থ। বাবা হিসেবে এই অনুভূতি তাঁকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে তোলে সন্তানের প্রতি সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে। তিনি তখন নিজের জীবনের সব স্বপ্ন, সব চাওয়া-পাওয়া সন্তানের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। তাঁর হৃদয়জুড়ে তখন শুধুই সন্তানের মঙ্গল কামনা।

সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, স্কুলে যাওয়া—প্রতিটি মুহূর্তে বাবা তাঁর সন্তানের সাথে সাথে বাঁচেন, হাসেন এবং কাঁদেন। সন্তানের প্রতিটি সাফল্যে তিনি গর্বিত হন, প্রতিটি দুঃখে তিনি ব্যথিত হন। সন্তানের হাসি-আনন্দেই বাবার জীবনের সমস্ত আনন্দ নিহিত। এই আবেগময় সম্পর্কের কোনো সমাপ্তি নেই। সময়ের সাথে সাথে সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা আরও গভীর হয়, আরও মজবুত হয়। সন্তানের প্রতি এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সবচেয়ে বড় আনন্দ।

 

সন্তান জন্মের পর বাবার জীবনে যে আষাঢ় আলো নেমে আসে, তা একটি নতুন ভোরের সূচনা, একটি নতুন জীবনের যাত্রা। এই যাত্রায় বাবার ভালোবাসা, মমত্ব এবং দায়িত্বশীলতা সন্তানের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আলো ছড়িয়ে দেয়, পথ দেখায়।বাবারা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিজেদের নিঃস্বার্থভাবে উৎসর্গ করেন। কিন্তু অনেক সময় তারাই সন্তানের নিষ্ঠুরতার শিকার হন।

 

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বাবা যখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না, তখন সন্তানরা তাদের অবহেলা করে। কেউ কেউ তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়, যাতে তাদের দায়িত্ব কমে যায়। অথচ এই বাবা একসময় নিজের সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

বাবার প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণ কেবল তাদের শারীরিক কষ্টই নয়, মানসিক যন্ত্রণাও বাড়িয়ে দেয়। তাদের মনে হয়, জীবনের সমস্ত পরিশ্রম, ত্যাগ এবং ভালোবাসা যেন বৃথা গেল। সন্তানদের উচিত বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা এবং যত্ন প্রদর্শন করা। তাদের জীবনের শেষ দিনগুলোকে আনন্দময় করে তোলাই সন্তানের প্রকৃত দায়িত্ব। বাবা-মায়ের প্রতি এই ভালোবাসা এবং যত্নই আমাদের প্রকৃত মানবিকতার পরিচায়ক।বাবা দিবসের ইতিহাস একটি সমৃদ্ধ এবং আবেগময় অধ্যায়। এই দিবসটির উদযাপন মূলত বাবাদের সম্মান জানাতে এবং তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে শুরু হয়। ইতিহাসে বাবা দিবস উদযাপনের প্রচলনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে।

বাবা দিবসের উৎপত্তি বাবা দিবস উদযাপনের মূল ধারণাটি প্রথম উঠে আসে ১৯০৮ সালে আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্ট শহরে। গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটন নামে এক নারী স্থানীয় গির্জায় একটি বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজন করেন, যা ছিল পূর্ববর্তী ডিসেম্বরে এক কয়লা খনি বিস্ফোরণে নিহত ৩৬১ জন পুরুষের স্মরণে। যদিও এই আয়োজনটি জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি।

সোনোরা স্মার্ট ডডের প্রচেষ্টা বাবা দিবসের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সোনোরা স্মার্ট ডডকে গণ্য করা হয়। ১৯০৯ সালে, ওয়াশিংটনের স্পোকেনে বসবাসকারী সোনোরা স্মার্ট ডড তার বাবাকে সম্মান জানাতে একটি বিশেষ দিন উদযাপনের উদ্যোগ নেন। তার বাবা, উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট, একজন গৃহযুদ্ধের প্রাক্তন সৈনিক, যিনি তার ছয় সন্তানকে একাই বড় করে তুলেছিলেন। সোনোরা তার বাবার কৃতিত্বের প্রতি সম্মান জানাতে মা দিবসের মতো একটি দিবস উদযাপন করতে চেয়েছিলেন।

১৯১০ সালের ১৯ জুন, প্রথমবারের মতো স্পোকেনে বাবার দিবস উদযাপিত হয়। সোনোরা স্মার্ট ডডের প্রচেষ্টার ফলে ধীরে ধীরে এই উদযাপনটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়ে।

জাতীয় স্বীকৃতি বাবা দিবস উদযাপনের দাবিটি ক্রমে ক্রমে জনপ্রিয়তা পেলেও এটি জাতীয় স্বীকৃতি পেতে অনেক সময় লেগে যায়। ১৯২৪ সালে, প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ বাবার দিবসকে একটি জাতীয় উৎসব হিসেবে পালনের পক্ষে সমর্থন জানান। তবে ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন প্রথম জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। অবশেষে, ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বাবা দিবসকে একটি স্থায়ী জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

বর্তমান উদযাপন আজ, বাবা দিবস বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে উদযাপিত হয়। যদিও অনেক দেশে এটি জুন মাসের তৃতীয় রবিবার উদযাপিত হয়, কিছু কিছু দেশে এটি ভিন্ন ভিন্ন দিনে পালিত হয়। বাবা দিবসে সাধারণত বাবাদের প্রতি ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে উপহার দেওয়া, কার্ড পাঠানো, এবং বিশেষ আয়োজন করা হয়। বাবা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাবাদের অবদান এবং তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব। এই দিনটি বাবাদের সম্মান জানানোর একটি বিশেষ সুযোগ এবং তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি উপলক্ষ।

বাবা দিবস, যেটি আমরা প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার উদযাপন করি, আমাদের জীবনে বাবার অসীম অবদানকে স্মরণ করার এক বিশেষ দিন। বাবা আমাদের জন্য সমস্ত কষ্ট স্বীকার করেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের জন্য অগাধ ভালোবাসা এবং নিরাপত্তা প্রদান করেন। তবুও, কিছু সন্তান যখন বৃদ্ধ বয়সে বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়, তখন এই প্রশ্নটি উঠে আসে: আমরা কি সত্যিই বাবার প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি?

বৃদ্ধাশ্রম, যেখানে অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা শেষ বয়সে আশ্রয় খুঁজে পান, সেখানে বাবার পাঠানোর সিদ্ধান্ত একটি অত্যন্ত জটিল ও মানবিক বিষয়ের জন্ম দেয়। বাবা, যিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সন্তানদের সুখের জন্য নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দেন, যখন তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো হয়, তখন তা তাদের মানসিক কষ্ট এবং একাকীত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একজন বাবা তার জীবনের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানদের বড় করে তোলেন, তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। সন্তানেরা যখন বৃদ্ধ বয়সে তাদের বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়, তখন তা এক ধরণের অবহেলার পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায়। এটি বাবা-মায়ের প্রতি এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব এবং দায়িত্ব

জ্ঞানহীনতা প্রকাশ করে। আমাদের উচিত বাবাদের সেই ভালবাসা এবং স্নেহের প্রতিদান দেওয়া। তাদের শেষ বয়সে যত্ন ও ভালোবাসায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো নয়, বরং তাদের সাথে থাকা, তাদের যত্ন নেওয়া এবং তাদের জীবনের শেষ সময়গুলোকে আনন্দময় করে তোলা আমাদের কর্তব্য।

বাবা দিবসে আমাদের এই উপলব্ধি হওয়া উচিত যে, বাবার প্রতি আমাদের ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা কেবল এক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি দিনই বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের দিন। তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠিয়ে নিজের বাড়িতেই যত্ন নেওয়া, তাদের সাথে সময় কাটানো এবং তাদের জীবনের শেষ দিনগুলোকে আনন্দময় করে তোলা উচিত। এই বাবা দিবসে, আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে নয়, বরং তাদেরকে ঘরে রেখে, স্নেহ-মমতায় ভরে তাদের জীবনের শেষ দিনগুলোকে স্মরণীয় করে তুলব। বাবার প্রতি আমাদের এই ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধই হবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। সকল সন্তানদের নিয়ে আমার কিছু কথা — প্রিয় সন্তান, তোমাদের জীবনের প্রতিটি অর্জন, প্রতিটি সাফল্যের পেছনে একজন নিরলস পরিশ্রমী বাবার অবদান লুকিয়ে আছে। তিনি যিনি দিনের আলো থেকে রাতের আঁধার পর্যন্ত তোমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে নিঃস্বার্থভাবে নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দেন। আজ, সেই বাবারা যখন বয়স্ক ও অসহায় হয়ে পড়েন, তাদের জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই?

বাবা, যিনি তোমার প্রথম পদক্ষেপ দেখেছিলেন, যিনি তোমার প্রতিটি কান্নার পেছনে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, তিনি আজ হয়তো একাকীত্বে ভুগছেন, হয়তো অসুস্থতায় কাতরাচ্ছেন। তিনি তোমার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন, আর আজ তোমার একটু সময়, একটু ভালোবাসার আশায় পথ চেয়ে থাকেন।

তোমার বাবার সেই নির্ভীক হাতগুলো, যা একদিন তোমাকে সুরক্ষা দিয়েছে, আজ সেগুলো অসহায় হয়ে গেছে। এই অবস্থায় তোমার কর্তব্য হলো তার পাশে দাঁড়ানো, তার সাথী হওয়া। শুধু খাবার ও ওষুধ দিয়ে নয়, বরং তোমার ভালোবাসা, তোমার সান্নিধ্য দিয়ে তার জীবনের শেষ দিনগুলোকে আনন্দময় করে তোলা।

একটি সন্তানের দায়িত্ব কেবল জন্ম দিয়ে শেষ হয়ে যায় না। তাকে ভালোবাসা, যত্ন এবং সন্মান দিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে থাকা। বাবার প্রতি এই ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধই তোমার প্রকৃত মানবিকতার পরিচায়ক।

তোমার বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে নয়, বরং তাকে নিজের বাড়িতে রেখে, স্নেহ-মমতায় ভরে তার জীবনের শেষ দিনগুলোকে স্মরণীয় করে তোলা উচিত। তার প্রতি তোমার এই ভালোবাসা, তার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।

তোমার বাবার মুখে হাসি ফোটাও, তাকে বলো কতটা ভালোবাসো। তাকে জানাও, তার সন্তান হিসেবে তুমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্মান ও ভালোবাসায় আগলে রাখবে। সন্তান হিসেবে তোমার এই দায়িত্ব পালন করো, বাবার প্রতি তোমার এই ভালোবাসা এবং যত্নই তার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তোমার বাবার চোখে অশ্রু নয়, বরং হাসি এনে দাও। এই ভালোবাসাই হোক তোমার প্রকৃত উপহার।

লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন