যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। সোমবার (২০ জুলাই) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার অতিক্রম করেছে, যা গত ১১ জুনের পর সর্বোচ্চ অবস্থান।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) সকাল ২টা ৪১ মিনিটে সেপ্টেম্বর ডেলিভারির ব্রেন্ট ক্রুডের আগাম চুক্তির দাম ২ দশমিক ০৯ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৭১ ডলার বা ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ২০ ডলারে ওঠে, যা গত ১২ জুনের পর সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। প্রথম দফার যুদ্ধ চলাকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই রেকর্ড ভাঙবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে জোর আলোচনা চলছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা সংকটকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে বিকল্প রুট ব্যবহার করার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেগুলো অচল হয়ে পড়ে। আইআরজিসির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ট্যাংকারগুলোকে ওই রুট ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছিল। তবে এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
একই সময়ে যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের কুমজার উপকূলের উত্তর-পশ্চিমে একটি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র চারটি জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে আগের দিন এ সংখ্যা ছিল আটটি। এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি জাহাজ চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আইএনজি বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা দ্রুত কমার কোনো ইঙ্গিত নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় তেল সরবরাহে ঝুঁকি আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
বার্কলেজের জ্বালানি বিশ্লেষক অমরপ্রীত সিং এক বিশ্লেষণে বলেন, নতুন নৌ অবরোধ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি কতটা স্বাভাবিক থাকবে, তা আগামী কয়েক দিনের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তাঁর মতে, বাজার এখনো সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটকে পুরোপুরি মূল্যায়ন করছে না। অথচ বর্তমানে বৈশ্বিক তেলের মজুত গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অতীতেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে লোডশেডিং, জ্বালানি রেশনিং এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি বাজার সংশ্লিষ্টদের নজর এখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতির দিকে। বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
ইতি/