ফ্রান্সে চলমান ভয়াবহ দাবানল দ্রুত বিস্তার লাভ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বোর্দোর মাত্র ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ মঙ্গলবার থেকে নতুন করে তীব্র তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বোর্দোর মেয়র টমাস কাজেনাভে জানিয়েছেন, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের আগাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, গিরোন্দে অঞ্চলের দাবানল পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশ বর্তমানে নজিরবিহীন এক দুর্যোগ মোকাবিলা করছে।
দাবানলের কারণে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রতিবেশী স্পেনেও দাবানলের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। দেশটির রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে আগুন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ায় ১ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে নতুন তাপপ্রবাহ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা ও দমকা বাতাস দাবানল নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেন, দেশের প্রতি ১০টি দাবানলের মধ্যে ৯টির জন্যই মানুষের অসতর্কতা দায়ী। ফেলে দেওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, খোলা জায়গায় বারবিকিউ কিংবা নিরাপত্তাবিধি না মেনে আগুন ব্যবহার—এসব কারণেই অধিকাংশ দাবানলের সূত্রপাত ঘটে।
প্রেসিডেন্ট মাখোঁ জানান, লঁদ অঞ্চলের একটি তুলনামূলক ছোট দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও গিরোন্দে অঞ্চলে আগুন নেভানোর অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কিছু অগ্রগতি হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। তিনি বলেন, তাপমাত্রা আবার বাড়তে পারে এবং দমকা বাতাস অব্যাহত থাকায় এখনই স্বস্তির সুযোগ নেই।
বোর্দোর দক্ষিণে অবস্থিত সেস্তাস শহরের মেয়র জেরোম স্তেফ বিবিসিকে বলেন, এটি শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলে পরিণত হতে পারে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দুই দিন আগে রাতারাতি তাঁর শহরের প্রায় ১৭ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে এবং ২৪০টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। যদিও আগুনের বিস্তার কিছুটা ধীর হয়েছে, তবে উড়ে যাওয়া জ্বলন্ত অঙ্গার ও বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে এখনও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
দাবানল ঠেকাতে প্রতিরক্ষামূলক ফায়ারব্রেক (আগুনের বিস্তার রোধে বড় পরিসরে গাছপালা ও দাহ্য উপাদান পরিষ্কার করে ফাঁকা এলাকা তৈরি) নির্মাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানান জেরোম স্তেফ। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ১৩ হাজার ৫৬৬টি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে পুড়ে গেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টরেরও বেশি জমি, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দাবানল মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইতি/