মো. কামাল উদ্দিন
মহাকালের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যপ্রবণ, জাতির জনকের আদর্শের যোগ্য আদর্শিত বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত নিবেদিত প্রাণ পুরুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুর রহমান। তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ শপথ নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর আবারও হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার নায়ক বিশ্ব বেঈমান খন্দকার মোশতাক সহ সকল হত্যাকারিদেরকে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সকলের বুকের রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো, বঙ্গবন্ধুর প্রতি অন্ধ ভালোবাসার সময়ের সাহসী বীর বজলুর রহমান ফাঁসির মুখোমুখি হয়েছিল। মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণ রক্ষা পাইলেও কিন্তু দীর্ঘ বছর শারীরিক মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে কারাগারের অন্ধকার কক্ষে সোনালী যৌবন হারিয়েছিল এই সেই বজলুর রহমান, তিনি ১৯৯৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নামকে মনে প্রাণের ধারণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বজলুর রহমান বঙ্গবন্ধুকে যেমন নিজের জীবনের চেয়ে ভালোবেসে নিজের জীবন যৌবন বঙ্গবন্ধুর হাতে অপর্ণ করেছেন, তেমনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বাঙালি জাতির আশার বাতিঘর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্তাবাজন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এই বজলুর রহমান। তিনি আজ নেই আছে শুধু বঙ্গবন্ধু থেকে শিক্ষা নেওয়া দেশের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের চিহ্ন সমূহ। বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগকে নিয়ে কিছু কিছু তথাকথিত কাগজের কমিটির রুপকার সময়ের সুযোগ সন্ধানি নেতা নেতা নামের কলংক, আড়ালে বসে ষড়যন্ত্রের নকশা
পরিকল্পনাকারি, বজলুর রহমানের নেতৃত্বে সৃষ্টিকৃত বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগকে বিতর্কের পথে ধাবিত করার ভয়ংকর রকমের মুখোশধারি স্বার্থপর নেতারা পায়তারা চালাচ্ছে বলে আজ সারাদেশের লক্ষ লক্ষ কর্মিদের কাছে পতিয়মান হয়েছে। বজলুর রহমান এ-র সুযোগ্য সন্তান তামজিদ বিন রহমান তৃর্য বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগকে বিতর্কের পথ থেকে রক্ষার জন্য সাংগঠনিক নিয়মনীতি অনুসরণ করে সারাদেশের সৈনিক লীগের প্রাণপ্রিয় নেতা কর্মীদেরকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার শপথে বলিয়ান হয়ে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে একটি জীবন্ত সাংগঠনিক রুপ দেওয়ার প্রত্যয়নিয়ে সমাজের সেরা সেরা সংগঠকদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন যখন, তখনই বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বরতরা দায়িত্বহীনতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলাতে সম্মেলন বিহীন
নামসর্বস্ব কাগজের কমিটি অনুমোদন দিয়ে নিজের নাক কেটে অন্যোর যাত্রা বঙ করারমত কাজ করে আসছেন। তাদেরকে অনভিজ্ঞ অর্বাচিন আহাম্মুক বল্লেও ভুল হবেনা। তারা একটি সুসংগঠিত ঐতিহ্যবাহী সংগঠনকে বিভক্ত করণের মিশনে নেমেছেন।
আমি আজ সেই সব নেতাদের সাংগঠনিক জ্ঞান লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে রহমত প্রার্থনা করছি। যার শ্রম ও মেধায় গড়া সংগঠন তাঁর বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় বজলুর রহমানের আত্মকথন
তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। হয়তো আজকের লেখাতে সব কথা বলা সম্ভব হবে না।আগামীতে যদি কখনো সুযোগ পায় তা বিস্তারিত লিখবো ইনশাআল্লাহ --
১৯৬২ সালে “হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন” আন্দোলনে গ্রেফতার হই। ১৯৬৬ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ঘোষণা দিলে তৎকালীন পি.ডি.পি নেতা মাহমুদ আলী লাহোরে ৬ দফার বিরোধীতা করলে ঢাকায় তাকে বাসা থেকে এনে বঙ্গবন্ধুর সামনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করি যার স্বাক্ষী শেখ আকরাম হোসেন, তৈয়বুর রহমান, রুনু ও রাজু ভাই। ৬ দফা আন্দোলনে গ্রেফতার হই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু যখন বিচারাধীন, শেখ আকরাম এবং আমি বঙ্গবন্ধুর সহধর্মীনি (বুজি)-এর নির্দেশে বিভিন্ন সাথীদের কাছ থেকে মামলার খরচ সংগ্রহ করতাম। ১৯৬৯ সালের গণঅভুত্থানে সান্ধ্য আইন ভঙ্গের দায়ে গ্রেফতার হই। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ধানমন্ডি- মোহাম্মদপুর নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের তদারকী করেছি। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলাম। আমার সাথে রাশেদ মোশারফ ভাই, রাজু ভাই, শেখ শওকত ভাই ছিলেন।
২৫ শে মার্চ রাত ১০:৩০ মিনিট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সাথেই ছিলাম। আমি অন্যান্য নেতৃবর্গের সাথে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে রাজনৈতিক আলোচনা করি। তিনি (গ্রেফতার এড়ানোর জন্য) যাবেন না বলে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, "তোরা যা, যুদ্ধ কর, আমার নির্দেশ পালন করবি শুধু"। পরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা উক্ত বাসভবন ত্যাগ করি। এমতাবস্থায় পাক হানাদাররা নিরস্ত্র বাঙালির উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং রাজারবাগ পিলখানাও আক্রমণ করে। আমি আমার সঙ্গীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমার এলাকায় (ধানমন্ডি) হানাদারদের প্রতিরোধের চেষ্টা করি। পরে আমরা বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ এলাকায় আত্মগোপন করে থাকি এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দসহ গোপনে মিটিং করে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ি। ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য কুমিল্লা সিএনবি রোড পাড় হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় পৌঁছি। আমরা একই সঙ্গে প্রায় ২৭ জন আগরতলায় যাই। তাদের মধ্যে ছিলেন - শাহাবুদ্দিন, আকতার, রমজান, আব্দুল আজিজ বীর প্রতীক প্রমুখ। আমরা আগরতলা কর্নেল চৌমুহনী শরণার্থী লিয়াজোঁ অফিস এ ৪/৫ দিন থেকে প্রশিক্ষণের জন্য ২ নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার মেলাঘরে যাই। সেখানে আমি ৩ মাস বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ কালে আমার প্লাটুন নম্বর ছিল ১৭ আমি ছিলাম উক্ত প্লাটুনের টু-আই,সি। জনাব মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া) বীর বিক্রম, আব্দুল আজিজ বীর প্রতীক, খন্দকার আব্দুল আজিম, নাসির উদ্দিন ইউসুফ (বাচ্চু) সহ আমি একই সেক্টরের অধীনে প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ শেষে
আমরা তৎকালীন মেজর সালেক সাহেব ও ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন সাহের এর অধীনে থেকে সীমান্ত এলাকা - শালদা নদী, আশাবাড়ী, কৈখোলা, রামচন্দ্রপুর, বল্লভপুর এলাকায় পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। সেপ্টেম্বর মাসে শালদা নদী সীমান্ত এলাকায় পাক বাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প আক্রমণ করে ধ্বংস করি, রসদ ও গোলাবারুদ ছিনিয়ে নেই, এরপর ওরা ১৫ দিন সেইভাবে কোনো রসদ সংগ্রহ করতে পারেনি। কৈখোলা যুদ্ধে আমাদের এক সাথী মুক্তিযোদ্ধা ঢাকাস্থ গোপীবাগ এলাকার জাকির শহীদ হন। মেলাঘরে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আমার কমান্ডে থাকা গ্রুপটি-ই পাক সেনাদের সাথে প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ করে।প্রশ্নঃ সমর্পন করায় ঢাকা উত্তর মুক্তিযোদ্ধাদের দল গ্রুপ কমান্ডার মোঃ বজলুর রহমান, জনার হাকিম, কোম্পানি কমান্ডার নাসির উদ্দিন ইউসুফ (বাচ্চু), প্লাটুন কমান্ডার শাহাবুদ্দিন আহামদ (চিত্রশিল্পী)। ছবিস্বত্ব: শফিকুল ইসলাম স্বপন ১৯৭১ সালে অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে আমরা কোম্পানি কমান্ডার নাসির উদ্দিন ইউসুফ (বাচ্চু) এর নেতৃত্বে দেশের অভ্যন্তরে সাভার এলাকার রৌহা গ্রামে চেয়ারম্যান শাহজাহান সাহেবের বাড়ী উঠি।
বাড়ি থেকে আমরা গ্রুপ করে আমার গ্রুপ নিয়ে ঢাকাতে অপারেশন এর জন্য সলমাসী, বট তলি, বসিলা, আটি, কলাতিয়া, রুটির চর এলাকায় হাইড-আউট (গোপন আস্তানা) স্থাপন করি। আমরা উক্ত স্থানগুলো থেকে এাস মাঝে মাঝে মোহাম্মদপুর, রায়ের বাজার, কল্যাণপুর ব্রীজ, মিরপুর স্ত্রীজ, সোলাটেংলার রাজাকার ক্যাম্প, গ্রীন রোড রেডিও অফিস, ভূতের গলি, গোপীবাগ, রামপুরা, ধানমন্ডি ওয়াপদা সাবস্টেশন সহ বিভিন্ন স্থানে বহুবার অপারেশন করি, যাতে অনেক পাকসেনা ও রাজাকার হতাহত হয় কিন্তু আমাদের তেমন ক্ষতি হয়নি। ঢাকায় যে সমস্ত অপারেশন করি তাতে জনাব মায়া'র প্লাটুন (ক্র্যাক প্লাটুন), জনাব আব্দুল আজিজ এর প্লাটুন ও আমাদের প্লাটুন যৌথভাবে অনেক অপারেশন করি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমি ঢাকার উত্তর এলাকার গ্রুপ কমান্ডার ছিলাম। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সকালে আমরা প্লাটুন কমান্ডার সাহাবুদ্দিন (চিত্র শিল্পী) সাহেবের নেতৃত্বে শাহবাগস্থ তৎকালীন পূর্ব- পাকিস্তান রেডিও অফিস দখল করতে গেলে আমার গ্রুপই প্রথম বাংলাদেশ বেতার দখলের জন্য আক্রমণ করে এবং উভয় পক্ষে গুলিবিনিময় হলে আমার একজন যোদ্ধা কলাবাগানের মফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ বেতারের সামনেই মারা যায়, আমি ডান বাহুতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পড়ে থাকলে সাথী মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। হাসপাতালে সপ্তাহ খানেক চিকিৎসা লাভ করে ডাক্তারের পরামর্শে বাসায় এসে বিভিন্ন ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা লাভ করি। তাদের মধ্যে গ্রীন রোড এর ডা: খান অন্যতম। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী দেশে ফিরে আসার পর লাখো জনতার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু আমাকে ভুলে যান নাই। এসেই বলেছেন "বজলু কোথায়? ওকি জীবিত আছে না মারা গেছে?" হানিফ ভাই মারফত খবর দিলেন যাওয়ার জন্য, গেলাম নেতার কাছে, কান্নায় ভেঙ্গে পরলাম দুই জনই। বললেন, "আমার সাথে গণভবনে চল"। গণভবনে গিয়ে বললেন, "তুই আমার কাছে থাকবি"। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অমান্য করার দুঃসাহস আমার ছিল না। তাই তাঁহার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার (রাজনৈতিক) হিসাবে নিয়োগ পেলাম। এমন মহান নেতার কাছে থাকতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি এবং গর্ববোধ করি। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আর্তদের সেবায় সহকর্মীদের সাথে নিয়ে নোঙ্গরখানা পরিচালনায় ধানমন্ডি ল' কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও ধানমন্ডি থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা জনার মোঃ বজলুর রহমান।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর শুনার সাথে সাথে দৌড়িয়ে গেলাম ৩২ নং বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে কিন্তু কারফিউ বিধায় যাওয়ার সাধ্য হয় নাই। এর মধ্যে রাশেদ (মোশাররফ) ভাই এর বাসা থেকে টেলিফোন করলাম তোফায়েল ভাই এবং ব্রিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সাহেবের কাছে। কিন্তু প্রতিশোধের কোন উদ্যোগ বা নির্দেশ পাই নাই (হয়তো, তাদের সেই পরিস্থিতি ছিলনা; হয়তো, ঘটনার আকস্মিকতায় তারা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন)। সেইদিন ছিল শুক্রবার, ১ (এক) ঘন্টা সান্ধ্য আইন সিথিল হল। আমি ঐ সময় একমাত্র ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর বাড়ী যাবার চেষ্টা করি প্রকৃত অবস্থা দেখার জন্য যার সাক্ষী শেখ কবির এবং ডি.এস.পি. ইউসুফ সাহেব এবং আমার জানামতে আর কোন কর্মী বা নেতা ঐ এক ঘন্টার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে যায় নাই।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট এর পর বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের জন্য কাজ শুরু করি। জনাব আনোয়ার চৌধুরী এর মূল উদ্যোক্তা। তাহার সাহস, উৎসাহে একবার ৬০ জন এম.পি. দের এক বৈঠক করি। আরেকবার পুরান শহরে এক বাসায় ১২ জন এম.পি. দের নিয়ে বৈঠক করি। কিন্তু নেতাদের সবাইকে আনতে পারি নাই। ১৯৭৫ সালে একবার সাজেদা আপার সাথে কর্ণেল শওকত ভাইয়ের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি এবং আরেকদিন পঙ্কজ ভট্টাচার্য এর সাথে আজিমপুরের এক বাসায় বৈঠক করি। ১৯৭৫ সালের কাল রাত্রিতে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর প্রতিশোধের জন্য একক ভাবে সকল নেতাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি এবং বলেছি আসেন কোথাও বসে ভাবি কিভাবে কি করা যায়। এই ব্যাপারে যাদের সাহায্য-সহযোগিতা, সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছি তারা হলেন জনার আনোয়ার চৌধুরী, ডাঃ এস. এ মালেক (সাবেক সংসদ সদস্য), নুরুল ইসলাম ভান্ডারি, মরহুম শুকলাস উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ রওশন আলী, মোঃ হানিফ, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, বহি উদ্দিন আহম্মেদ, সৈয়দ হায়দার আলী, নরুল কাদের জুনু, ডাঃ আবুল খায়ের (ঘটু ডাক্তার), জনাব আজিজুর রহমান আক্কাস, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, লুৎফুর রহমান, জনাব কামরুজ্জামান, সালাউদ্দিন ইউসুফ, আঃ আউয়াল, আঃ রউফ, হাসান আলী তালুকদার।
জনাব সালাউদ্দিন ইউসুফ সাহেবকে ৩ দিন বুঝানোর পর আমার সাথে কাজ করার প্রস্তুতি নেয়। মহিউদ্দিন ভাইকে ২ বার আমি নিজে এক জায়গায় বসার ব্যবস্থা করেছি, কি করা যায়। একবার সিরাজউদ্দিন হোসেন সাহেবের বাসায় ৬২ জন সংসদ সদস্যদের সভা করা হয়। দেশের প্রায় সকল সংসদ সদস্যদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। আসেন বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নেই। এই ব্যাপারে বন্ধুর (তৎকালীন ভারত সরকার) কাছ থেকে নিশ্চিত আশ্বাস পেয়ে সকল সংসদ সদস্যদের প্রস্তুতি নেবার আহ্বান জানাই। কিন্তু কোন উদ্যোগ পাই নাই। তারপর চিঠি দিলাম, যার ভাষা ছিল "আমরা কঠিন রোগে আক্রান্ত অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে রোগ মুক্তি লাভ করুন, ডাঃ সাহেবেরা প্রস্তুত"। এই চিঠিও কেহ লিখতে সাহস পায় নাই। পরে আমি নিজ হাতে লিখি এবং অনেকের বাসায় নিজে এবং ডাকযোগে পাঠাই।
সর্বশেষ মালেক উকিল সাহেবকে হাসপাতালে ভর্তি করার (আমাদের সাথে কাজ করতে সম্মত করানোর) (চষ্টা করি এবং আমি, সালাউদ্দিন ইউসুফ ভাই এবং ডাঃ মালেক ভাই সহ ৩ জন তার বাসায় গিয়ে প্রায় ২ ঘন্টা আলোচনার পর তিনি রাজী হলেন ভর্তি হওয়ার জন্য। কিন্তু আসলে মিথ্যা আশ্বাস দিলেন তিনি। একদিন তাকে আনতে গেলাম, দেখলাম তিনি সেই বাড়ী হইতে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন দায়িত্ব এড়ানোর জন্য। তৎকালীন রক্ষী বাহিনীর উপ-পরিচালক মিঃ সরওয়ার হোসেনকে অনুরোধ করেছি, 'যার জন্য আপনি এই পদমর্যাদায় আছেন; আসেন তার (বঙ্গবন্ধু) জন্য কিছু করি'। কিন্তু কেউই কিছু করার চেষ্টা করলেন না। এর পর আমি একা বন্ধু-সাথীদের সাথে যোগাযোগ করে কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, ঠাটারীবাজার, গেন্ডারিয়া, ইসলামপুর, ফার্ম গেইট, আনোয়ার চৌধুরীর বাসায় গোপনে বৈঠক করি এবং সংগঠিত করার চেষ্টা করি। দেখলাম খালি হাতে হবে না। চলে গেলাম ভারতে, সাথে কামরুজ্জামান সাহেব, ডাঃ মালেক, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, নুরুল কাদের জুনু, হাসান আলী তালুকদার, আঃ আউয়াল, এখলাস উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ রওশন আলী এবং নুরুল ইসলাম ভান্ডারী। আবার দেশে ফিরে এলাম। এসে সাজেদা আপার সাথে যোগাযোগ করেছি। কিছু করার যায় কিনা। এর মধ্যে তৎকালীন রক্ষীবাহিনীর মহা-পরিচালক নুরুজ্জামান সাহেবের সাথে আলোচনা করি আমি নিজে। এর পরে বৈঠক করলাম কর্ণেল নজরুল হুদার সাথে। মেজর নাছিরের কাছে গেলাম। তিনি বললেন আওয়ামী লীগ দেশকে ধ্বংস করেছে, আওয়ামী লীগ দ্বারা কিছু হবে না। পরিশেষে আমি নিজস্ব উদ্যোগে নিশ্চিত মৃত্যুকে বরণ করে নিয়ে, চেষ্টা করেছি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু পারি নাই। এ জন্য
আমার আত্মা পরিষ্কার। বেকার কর্মী হিসাবে দায়িত্ব কর্তব্য অবহেলা করি নাই।১৯৭৬ সালে কাদের সিদ্দিকীর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রতিরোধ সংগ্রামের সৈনিকরা ঢাকায় এসে এখানে-সেখানে অজানা-অচেনা পথে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরাঘুরি করে। এমন সময় ঐ চরম দুর্দিনে আমি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে সাহস, উৎসাহ, আশ্রয় দেওয়ার আশ্বাস দেই। ব্যাক্তিগত উদ্যোগে বন্ধু এবং বঙ্গবন্ধুর নিরব অনুসারীদের বাসায় আশ্রয় দেই। ওদের খাওয়া পড়া টাকা আশ্রয় সবই দরকার। কারো কাছ থেকে কোন উদ্যোগ পাই নাই। কিছু কিছু বঙ্গবন্ধু-পাগল আছে যারা আমাকে সাহায্য করেছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধের জন্য লিফলেট ছাপানোর কোন প্রেস পাই নাই। সাইক্লোস্টাইল মেশিনে লিফলেট ছাপিয়েছি। কেউ লিফলেট রাখার সাহস দেখায় নাই। বাসায় গিয়ে লিফলেট করিয়ে আবার নিয়ে আসতে হয়েছে। "বাংলার ডাক" পত্রিকা বের হতো বঙ্গবন্ধু হত্যা ও কাদের সিদ্দিকীর প্রতিরোধ সংগ্রাম সম্পর্কে, তাহাও কেউ পড়ার সাহস পায় নাই। পকেটে করে নিয়ে যেতাম আবার নিয়ে আসতাম। এইভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। তারপর শুরু হলো প্রতিশোধের পরিকল্পনা। খুনীদের তালিকা সংগ্রহ করলাম। কে কোথায় থাকে জেনে নিলাম। পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই খুনী মোস্তাককে হত্যা করব। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে (সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পূর্বে ১৯৭৬ সালের ৪ঠা নভেম্বর বিকাল ৪ টায় জিগাতলায় কৃষক লীগ নেতা সাবুর বাসা থেকে বের হওয়ার সময়) ধরা পরলাম। ধানমন্ডি থানায় ছিলাম ১৭ দিন। অমানুষিক নির্যাতন সহা করলাম। সেদিন দলের কোন সাথী ছিল না দেখার। আত্মীয়রা প্রয়োজনে খোঁজখবর নিয়েছেন।
আজাক লাখো লোকের ভীড়, লাখো লোকের মিছিল ৩২ নম্বরে দেখি। সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশ ৩২ নম্বরের বাসায় পরে ছিলো, রক্ত ঝড়েছে, কিন্তু একটি লোক লাশ দেখার চেষ্টা করে নাই, এমনকি ইচ্ছাটাও পোষন করে নাই।
জেল থেকে নিয়ে গেলো ক্যান্টনমেন্ট এর সেলে। তিন (৩) মাস সেলে ছিলাম। পৃথিবীর কোন আলোবাতাস দেখি নাই। সূর্য আছে তা বোঝা যায় নাই। ৩ মাস পর আবার জেলে। ক্যান্টনমেন্টের নির্যাতন আমাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ৬ মাস আমি হাঁটতে পারি নাই। বিচার শুরু হলো ১ (এক) নং বিশেষ সামরিক আদালতে। বিচারে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে ফাঁসীর হকুম দিল ৩ জনকেই (যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো: বজলুর রহমান সহ তার বাসা থেকে গ্রেফতারকৃত দুজন সহযোগী বীর মুক্তিযোদ্ধা অসিত সরকার সজল এবং মানু মজুমদার; বর্তমান এম.পি.)। পরে ফাঁসীর আদেশ আমার শিশু কন্যার জন্য বিবেচনা করে যাবতজীবন কারাদন্ড ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ৯ বৎসর কারাভোগের পর সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে ১৯৮৫ সালের ১৯শে জুন মুক্তি লাভ করি। কারাগারে বসেও এক মুহুর্তের জন্য আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নাম নিতে ব্যর্থ হই নাই। জেলে সাধারণ বন্দীদের দাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেছি, ৩৯ দফা কারাবন্দীদের দাবী আদায়ের আন্দোলনে অনশন ধর্মঘট করেছি, দীর্ঘ ১২ দিন অনশন-ধর্মঘটের পর ১৯ দফা দাবী আদায় করতে সমর্থ হই। জেল কোড সংশোধন এবং সংস্কার করার কমিটি হলে আমি তার মধ্যে একজন এবং মূল ভূমিকা আমারই ছিল। যে কারনে আমাকে বিভিন্ন জেলে বদলী করে হয়রানী করেছে।
এত অত্যাচার অবিচার করেও বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারে নাই। আমি বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সৈনিক এবং কষ্টি পাথার যাচাই করা পরিক্ষিত দূর্দিনের সাথী। আমার মত আরো ১০০ জন কর্মী থাকলে অনেক আগেই এদেশে খুনীদের বিচার করতে পারতাম; বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি কামনা করে আমার প্রতিবেদন শেষ করলাম। বীর সেনানি বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা বজলুর রহমানের জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনার আংশিক উনার আত্মকথন পাঠকের কাছে তুলে ধরেছি, আরো হাজারো অজনা কথা রয়েছে যা পরবর্তীতে আমি প্রকাশ করার চেষ্টা করবো। তবে পরিশেষে বলবো বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা বজলুল রহমানের হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানকে অহেতুক বিতর্কে নিয়ে সাংগঠনিক হানাহানি না করে মানামানির মাধ্যমে আমরা যদি এগিয়ে যায় তাহলে ফজলুর রহমান এর আত্মা শান্তি পাবে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক,প্রার্বন্ধিক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও আহব