মোঃ কামাল উদ্দিনঃ
বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ চট্টগ্রাম মহানগর আহবায়ক কমিটির উদ্যোগে ১৮ মে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমি জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে আসা ও আসার আগে দেশের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি ১৯৭৫ সালে ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্ব পরিবারে হত্যারপর শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনার দুর্বিষহ জীবনের কথা তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। স্বজন হারিয়ে বিদেশে অনিরাপদ পরিস্থিতি নিয়ে বুকের কষ্ট বুকে রেখে যে বন্দী দশারমতো দীর্ঘ ৬ বছর অতিবাহিত করে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে নিজের জন্মে ভুমিতে ফিরে এসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেগড়া বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জনগণের পাশে থেকে রাজনীতি করে দেশকে আজ এই পর্যায়ে আনার কাহিনি সহ শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শীর্ষক আলোচনা সভায় আমি একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ছিলাম। প্রবন্ধটি লিখিত ছিলনা, যা লেখা ছিলো আমার মনে এবং বুকে, আমি সেই প্রবন্ধের আলোকে বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগকে সুসংগঠিত করার জন্য সবাইকে একত্রিত হওয়ার আহবান জানিয়ে এই লেখাটা উপস্থাপন করছি। গত ১৬ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের উপর ইতিহাস ভিত্তিক আমার
একটি তথ্য নির্ভর লেখা বাংলাদেশের একাধিক দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে এই লেখাতে বেশি কিছু উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই মনে করছি। আপাতত শেখ হাসিনা দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর কি কি উন্নয়ন ও দেশের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি,তবে এই লেখাতে সব তথ্য কিন্তু আমার নিজস্ব তথ্য নয়। তথ্য গুলো বিভিন্ন ভাবে সংগৃহীত--বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় শামিল হয়েছি এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রগতিবাদী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেছি। আমাদের প্রত্যাশা কখনো কখনো আকাশ ছুঁয়েও যেতে পারে। এ কথা মানতে হবে, মানুষের চিন্তা, কল্পনা এবং প্রত্যাশার পেছনে যুক্তি থাকে আস্থা ও নির্ভরতার ভিত্তি থাকে। এই আস্থা ও ভিত্তি কল্পনার রাজ্যে বসবাস করে না। লড়াই, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্যদিয়েই বাস্তব সত্যে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখেছি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংগ্রামী চেতনার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অঙ্গুলি হেলনে পুরো জাতি তাদের কর্তব্য নির্ধারণে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। তাঁরই নেতৃত্বে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ যখন সব ধ্বংস, বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত ঠিক তখনই মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এবং ক্ষমতালোভীচক্র দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যা শুধু ব্যক্তি মুজিবকে হত্যা নয়-মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং বাংলাদেশকে হত্যার শামিল। ক্ষমতা দখল করেই মোশতাক ও জিয়াচক্র সামরিক শাসন জারি করে, সংবিধানকে কেটে-ছিঁড়ে পাকিস্তানি ভাবাদর্শে বাংলাদেশকে পরিচালিত করার চক্রান্ত শুরু করে। সেই যে শুরু, মোশতাক-জিয়া-খালেদা জিয়া-এরশাদচক্র দীর্ঘ ২১ বছর এবং তারপর আরও সাত বছর একই প্রচেষ্টা ও প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, ইতিহাস, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি সংস্কৃতিকে ক্ষত-বিক্ষত করে ওই শাসকগোষ্ঠী স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার জাঁতাকলে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছে আমাদের প্রিয় স্বদেশকে।
১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন সামরিক সরকার অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ১৯৭৩ সালে প্রণীত দালাল আইন বাতিল করে সব যুদ্ধাপরাধীদের অভিযোগ থেকে মুক্তি এবং কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়। এই সময় বন্দুকের জোরে সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজুর রহমানকে বানানো হয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের রক্ষার জন্য জারি করা হয় কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স। ৩ নভেম্বরে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করে মুজিবনগর সরকারের চার স্তম্ভ বঙ্গবন্ধুর আমৃত্যু সহযোদ্ধা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে। আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ নেতা-কর্মীর জীবনে নেমে আসে জেল-জুলুম-হুলিয়া। নির্যাতন-নিপীড়নে প্রায় বিধ্বস্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এই সময় জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে ক্ষমতায় থেকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। একদিকে স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে তিনি সংগঠিত করেন, অন্যদিকে অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে সুবিধাবাদী পরিচিত মুখদের জড়ো করেন। আবার ভয় দেখিয়ে বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকেও তার নয়া দলে যোগ দিতে বাধ্য করেন। স্বৈরশাসন চালিয়ে, ক্ষমতার সর্বশক্তি নিয়োগ করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে রাষ্ট্র এবং সমাজে তার কর্তৃত্ব স্থাপনের এই প্রক্রিয়ার সময়ে ১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার হোটেল ইডেনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে দেশ এবং দলের সার্বিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতভাবে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ, দেশে প্রত্যাবর্তনসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকা থেকে দিল্লিতে যান আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মালেক উকিল, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মান্নান, আব্দুস সামাদ আজাদ, ড. কামাল হোসেন, জোহরা তাজউদ্দীন, এম কোরবান আলী, সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আইভি রহমান প্রমুখ। পূর্ব থেকেই সেখানে ছিলেন ডা. এস এ মালেক। তখন ঠিক হয়, শেখ হাসিনা ১৭ কিংবা ২৬ মার্চ দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু পরবর্তীতে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা এবং পুতুলের জলবসন্ত দেখা দেয়ায় শেখ হাসিনার ঢাকা আসা পিছিয়ে যায়। অবশেষে ঢাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর নির্ধারিত হয় ১৭ মে ১৯৮১ শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরবেন। সে এক উত্তেজনাকর আবেগময় ঘটনা। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে দেশে নিয়ে আসার জন্য দলের পক্ষ থেকে দিল্লি গেলেন আবদুস সামাদ আজাদ ও এম কোরবান আলী। ১৬ মে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমানে দিল্লি থেকে কলকাতা এলেন শেখ হাসিনা, কন্যা পুতুল, আবদুস সামাদ আজাদ ও এম কোরবান আলী। ১৭ মে বিকেলে ঢাকায় বিমান থেকে নামেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই প্রথম এলেন। পিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা, তিন ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই আর জীবিত নেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খুনিদের উন্মত্ততায় নিহত হয়েছেন তারা সবাই। ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িটি তখন মৃত্যুপুরী। জেনারেল জিয়ার সরকার বাড়িটিকে তালা মেরে পুরো বাঙালি জাতিকে শৃঙ্খলিত করতে চেয়েছেন। সেদিন আকাশে ছিল মেঘ, ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। প্রকৃতি যেন শোকের চাদর গায়ে মলিন বদনে শেখ হাসিনার জন্য প্রতীক্ষা করছিল। বিমান থেকে নামার পর শুরু হলো অঝোর ধারায় বৃষ্টি- যেন শেখ হাসিনার অশ্রু জল হয়ে ভরিয়ে দিল বাংলার প্রতিটি প্রান্তর। লাখ লাখ বঙ্গবন্ধু প্রেমীর স্লোগানের মধ্যে তিনি খুঁজে ফেরেন স্বজনের মুখ। আবেগজড়িত কণ্ঠে চিৎকার করে বলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই’। মুহূর্তের মধ্যে সে ধ্বনি প্রকম্পিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ৬৪ হাজার গ্রামের প্রতিটি লোকালয়ে। বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনাস্থল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত পুরো রাস্তা ছিল লোকে লোকারণ্য। ১০-১৫ লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল সে সংবর্ধনায়।
এরপর শেখ হাসিনার শুরু হলো এক নতুন জীবন। দলকে পুনর্গঠন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী তখনো কারাগারে বন্দি। মিথ্যা মামলা আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনকে ধ্বংস করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তাকে রুখে দিতে হবে। ভয়ভীতি প্রদর্শন আর অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে দল ভাঙা, নেতা-কর্মীদের ক্ষমতাসীন দলে ভেড়ানোর প্রচেষ্টা এবং কখনো কখনো দলীয় কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় রাখার ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করতে হবে। সারাদেশে দলকে পুনর্জীবিত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। একইসঙ্গে দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার সংগ্রামও শুরু করেন। সামরিক শাসন ও
স্বৈরশাসনের ফলে যে সব অবৈধ নির্দেশ ও কালাকানুন জারি করে পরবর্তীতে সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে তা বাতিল এবং পরিবর্তনের দাবি জানান শেখ হাসিনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সংবিধানের চার মূলনীতি পুনঃস্থাপনের দাবিও উত্থাপন করেন তিনি। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি এবং জেল হত্যাকারীদের বিচার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার ও অভিযোগ থেকে মুক্তি, চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতি করার সুযোগ দানের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম শুরু করেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, ঘুষ-দুর্নীতি এবং অবৈধ ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও তিনি দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল বিক্ষুব্ধ সেনার হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হলেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান। জেনারেল জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ১৯৮১ সালের ১২ জুন বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের সরকার বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িটি শেখ হাসিনার নিকট হস্তান্তর করে। সরকারি দখলমুক্ত হয়ে বাঙালির প্রাণভোমরার এই ঐতিহাসিক বাড়িটি ফিরে পেলে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানারা এই বাড়িটি এখন বঙ্গবন্ধু জাদুঘর হিসেবে বাঙালির এক তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিদেশিরাও আসেন এই বাড়িটি দেখতে, বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে।
জাতির এ কঠিন সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো সংগঠিত হওয়ার তাগিদ অনুভব করে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল, রাজবন্দিদের মুক্তি, জেল-জুলুম নির্যাতন প্রতিরোধ, ঘুষ-দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং সীমান্ত সমস্যা সমাধান ও ছিটমহল বিষয়ে ইন্ধিরা-মুজিব চুক্তি বাস্তবায়নে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর নেতৃত্বে সারাদেশে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রাণ ফিরে পায় এবং সব ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দল এবং জনগণকে সংগঠিত করার কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত হয়। একই সময়ে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলাম এবং অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো পঁচাত্তরপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে রাষ্ট্র এবং সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলায় সচেষ্ট হয়। মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিপরীতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি, সম্প্রীতি বিনষ্ট এবং প্রগতির বিপরীতে ধর্মান্ধ এবং পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ এ সময় প্রত্যক্ষ করা যায়। এ সব উদ্যোগকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে বিএনপি এবং পরবর্তীতে জাতীয় পার্টি। জাতির এ ক্রান্তিকালে শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে প্রতিরোধ, জনজীবনের নানাবিধ সংকট দূরীকরণ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত হন। দেশবাসীও আশায় বুক বেঁধে পাশে এসে দাঁড়ায়, পরবর্তীতে রচিত হয় নতুন ইতিহাস।
কখনো একক, কখনো যুগপৎ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চলতে থাকে। এ লড়াইয়ে ছাত্র, যুবক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, নারীÑসবাই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখে। প্রেসিডেন্ট সাত্তারের বিদায়ের পর জেনারেল এরশাদের পতন ঘটলে তিন জোটের রূপরেখা মোতাবেক সাহাবুদ্দীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়। যদিও এ নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৬ সালে নানা ঘটনার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির অধীনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি এবং ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিচুক্তি সম্পাদন করে তিনি দেশকে দুটি বড় সংকট থেকে রক্ষা করেছিলেন। হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণে তাঁর সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিশেষ করে দেশের উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করেন। সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সন্তানের পরিচয়ে পিতার পাশাপাশি মায়ের নাম লিপিবদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক করেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি অর্জন করে। তাঁর সরকার কুখ্যাত ইনডেমনিটি বাতিল করে প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ শুরু করে। এ ছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প, বিদ্যুৎ উন্নয়ন, কৃষিসহ সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এবং বিদেশি নানা মহলের আনুকূল্য পেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে জয়লাভ করে। পরে দেশব্যাপী সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়ন চালায়। বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এই সময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, অ্যাডভোকেট মমতাজউদ্দিন, সাংবাদিক মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বালুসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে। এ সব অপকর্মের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ সময় শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বারবার। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা ইতিহাসের এক কালো দিবস হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য এবং নির্মূল করার এ ধরনের ঘৃণ্য প্রচেষ্টা বিশ্ব আর কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। তারপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাকে দলিত মথিত করে বিএনপি-জামায়াত সরকার দেশে জরুরি অবস্থা সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে। শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ করে রাজনীতি থেকে বিদায় করার চক্রান্ত করা হয়। কিন্তু অনমনীয় সাহসিকতা এবং বিচক্ষণতায় সব বাধা অতিক্রম করে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা বিপুল সংখ্যাধিক্ষ্যে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেন। তার পরের ইতিহাস বাঙালির গর্ব ও সাহসের ইতিহাস। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সারা পৃথিবীতে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাঁর সততা, সাহসিকতা, দেশপ্রেম এবং বিচক্ষণতায় আমরা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি স্বপ্নের পদ্মা সেতু। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে অর্জন করেছি সমুদ্রের বিশাল এলাকা। বাংলাদেশের অর্জন আজ আমাদের বিশ্বে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা থাকলেও এ অর্জনের মূল কাণ্ডারি শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা শুধু রাষ্ট্রনায়ক বা রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
সমকালীন বিশ্বে যে কয়জন রাজনীতিবিদ তাদের নীতি-আদর্শ, প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং অনমনীয় দৃঢ়তার জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত, তার অন্যতম ব্যক্তিত্ব আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু বঙ্গবন্ধুর কন্যা নয়, স্বীয় প্রতিভা এবং কর্মগুণেই তিনি আজ বিশ্বনন্দিত। সততা, দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দৃঢ়তা তাঁকে এক দক্ষ রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে যা রাজনৈতিক চরিত্রের বাইরে এক মানবিক বোধের বাতাবরণে সবাইকে আবিষ্ট করে। আর সে কারণেই শেখ হাসিনা অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা।এই শেখ হাসিনাকে নিয়ে আমি গবেষণা মুলুক লেখা বিগত সময়ের ও লিখেছি আগামীতেও লিখবো ইনশাআল্লাহ।
লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও আহবায়ক-- বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ চট্টগ্রাম মহানগর আহবায়ক কমিটি।