মো. কামাল উদ্দিনঃ
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমান ৪ জুন ১৯৫৭ হতে ২৩ অক্টোবর ১৯৫৮ পর্যন্ত তদানীন্তন পাকিস্তান চা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তদানীন্তন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার স্মারক নং ৩৩৫/৯১৩/৫৬-সিপি তারিখ জুন ৪ ১৯৫৭ মূলে তাঁকে চেয়ারম্যান করে ১৩ সদস্যের বোর্ড গঠন করে। এই বোর্ড গঠনের আগে ১৯৫৪ সালের ২২ ফেব্র“য়ারি হতে ২১ ফেব্র“য়ারি ১৯৫৭ পর্যন্ত গঠিত তিন বছর মেয়াদী বোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ৬ জুন ১৯৫৭ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তান চা বোর্ড পূনর্গঠিত’ শিরোনামে এতদসংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। নতুন বোর্ড
গঠিত হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। এর আগে সরকারের মনোনীত চেয়ারম্যান ছিলেন এম এম ইস্পাহানী। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন না। তাঁর পূর্ববর্তী চেয়ারম্যান এস এ সেলিম ও বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু চেয়ারম্যান থাকা কালে বোর্ডে সদস্য ছিলেন সি. এফ. গুডচাইল্ড, এম.হিল্ড, জে.এফ.স্মিথ, আমিনুর রশীদ চৌধুরী, এম. রহমান, এম.আলম শের, জি.এম.মেলোন, এ.এ. সাইদ, আবুল খায়ের, ড.এস.এ.হোসেন, ফরিদ উদ্দিন আহমদ এবং মোসলেম আলী মোল্লা প্রথম তিন জন ছিলেন পাকিস্তান টি এসোসিয়েশনের সদস্য। আমিনুর রশীদ চৌধুরী পাকিস্তান টি এসোসিয়েশনের সদস্য ছিলেন না-যারা সদস্য নন সেসব চা উৎপাদনকারীদের প্রতিনিধি ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান চেম্বার প্রতিনিধি ছিলেন এম. রহমান। চট্টগ্রামের এম. আলম শের টি ট্রেডার্স এসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ছিলেন। টি ব্রোকার এবং শিপারদের প্রতিনিধিত্ব করেন জি.এম.মেলোন। এ.এ. সাইদ পাকিস্তান পাট বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের উপ-সচিব আবুল খায়ের পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। ড. এস.এ হোসেন পাকিস্তান সরকারের কো-অপারেশন এবং মার্কেটিং এডভাইজার ছিলেন। তাঁকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার কৃষি বিশেষজ্ঞ হিসাবে বোর্ডে সদস্য নিয়োগ করে। ফরিদ উদ্দিন আহমদও একই যোগ্যতায় সদস্য হন। তবে তাঁর পরিচয় ছিল পূর্ব পাকিস্তান কৃষি ইনষ্টিটিউটের অধ্যক্ষ। তিনি মূলত উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ছিলেন। মোসলেম আলী মোল্লা বোর্ডে ন্যাশনাল এসেম্বলীর সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ১৩৩ টি চা বাগানের আওতায় ৮২,০৭০ একর জমি চাষাধীন ছিল। তৎকালীন পাকিস্তানে চা আবাদ, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানী নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ১৯৫০ সালে চধশরংঃধহ ঞবধ অপঃ-জারী করা হয়। এই আইনের ৩নং ধারার ক্ষমতা বলে সরকার ওপরে বর্ণিত একজন চেয়ারম্যান এবং ১২জন সদস্য নিয়ে চা বোর্ড গঠন করে।
চা বোর্ড গঠনের পর ঢাকার ওয়েজঘাট এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে অফিসের কার্যক্রম শুরু করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আমলে এই অফিসে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেন এঁরা হলেন-এস.এ.ই হুসাইন সচিব, ড.এফ.এইচ.আব্বাসী প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পরে তিনি শ্রীমঙ্গলে পাকিস্তান টি রিসার্চ ষ্টেশনে চলে যান) এবং ড. এ. ব্রাবস্ত স্পেশাল রিসার্চ অফিসার। তার কর্মক্ষেত্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের রিসার্চ অর্গেনাইজেশন।
চা বোর্ডের নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার ঢাকার ১১১-১১৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় .৩৭১২ একর জমি বরাদ্দ দেয়। উক্ত জমির ওপর পিডবি¬উডি ঢাকা, চা বোর্ডের অফিস ভবন নির্মাণ করে। অফিস ভবনটির নির্মাণ কাল ১৯৫৭-১৯৫৯। ২৪ জুন ১৯৫৯ ইং পিডব্লিউডি বোর্ডের কাছে বিল্ডিংটি হস্তান্তর করে। বঙ্গবন্ধুর আমলে এই ভবনের নির্মাণ কাজ তরান্বিত হয়। বঙ্গবন্ধুর বহুবার ভবনের নির্মাণ কাজ পরিদর্শনও করেন।
চায়ের আবাদ সম্প্রসারণ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য পাকিস্তান টি এ্যাক্ট-এর ৭ ধারার আওতায় সরকার একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচ জন সদস্য নিয়ে ছয় সদস্য বিশিষ্ট পাকিস্তান টি লাইসেন্সিং কমিটি গঠন করে। কমিটির অফিস নির্মাণের জন্য চা বোর্ড সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকায় .২৪ একর জমি হুকুমদখল করে এবং ২ ডিসেম্বর ১৯৫৭ তারিখে দখল বুঝে নিয়ে একটি আধাপাকা অফিসগৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা করে। পাকিস্তান টি লাইসেন্সিং কমিটির কার্যক্রম সন্তোষ জনক ছিল না। বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান টি বোর্ড ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান টি লাইসেন্সিং কমিটি বিলুপ্তির জন্য পাকিস্তান টি এ্যাক্ট, ১৯৫০ এর ৭ ধারায় সংশোধনী আনে এবং কমিটির কার্যক্রম টি বোর্ডে ন্যাস্ত করার ব্যবস্থা নেয়। বঙ্গবন্ধুর সময়ে পাকিস্তান টি এ্যাক্ট-১৯৫০ এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়। পাকিস্তান টি বোর্ড এবং পাকিস্তান টি লাইসেন্সিং কমিটির কর্মকর্তাদের তখন আইন সংশোধন করে কন্ট্রিবিউটরী প্রভিডেন্ট ফান্ড (ঈচঋ) চালু করা হয়। বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বঙ্গবন্ধুর এটি একটি বড় ধরনের অবদান-যা এখনও চালু আছে। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার প্রকাশ ছিল এটি। বঙ্গবন্ধুর সময়ে বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও দু’টি সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবৎসরের চাকুরীর জন্য এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ গ্রাজুয়েটি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনক্রমে বোর্ডে সরাসরি নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মচারীরা এ সুবিধা লাভ করে। এছাড়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অগ্রিম অর্থগ্রহণ এবং তা ফেরৎদান বা সমন্বয়ের সুযোগও সৃষ্টি করা হয়। পাকিস্তান টি বোর্ডের অধীন পাকিস্তান টি রিসার্চ ষ্টেশন শ্রীমঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে। বঙ্গবন্ধুর তৎপরতায় এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ব্যাপক গতি আসে। ১৯৫৮ সালে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অফিস ভবনের কাজ সমাপ্ত হয়। অতি দ্রুততার সঙ্গে মতিঝিলের চা বোর্ডের অফিস ভবনের মতই শ্রীমঙ্গলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অফিস ভবন নির্মিত হয়ে যায় এক/দেড় বৎসরের মধ্যেই। অফিস ভবনের পাশাপাশি ল্যাবরেটরী ভবন এবং আবাসিক ভবনও এই সময়ের মধ্যেই নির্মাণ করা হয়। পাকিস্তানের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট দ্রুততার সঙ্গে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। ১৩/১২/১৯৫৭ ইংরেজিতে শ্রীমঙ্গল রিসার্চ ষ্টেশনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়। কারণ শ্রীমঙ্গল শহর থেকে রিসার্চ ষ্টেশনের দূরত্ব কম নয়। এই ষ্টেশনে পানি সরবরাহ এবং গ্যাস সংযোগ তখনও সম্পন্ন করা যায়নি। নব-প্রতিষ্ঠিত টি রিসার্চ ষ্টেশনে যৌক্তিক কারণেই কাজের কমতি ছিল না। ১৯৫৭-৫৮ সালে টি রিসার্চ ষ্টেশনের জন্য হুকুম দখলের মাধ্যমে ৮১.৯২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ল্যাবরেটরী ইকুইপমেন্ট এবং মেশিনারীজ সংগ্রহ করা হয়। ৯৭টি বই এবং ৪১টি রিপোর্ট ক্রয় করে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়া ভারত, সিংহল, পূর্ব আফ্রিকা এবং যুক্তরাজ্য থেকে ৩১৬টি প্রকাশনা সংগ্রহ করে লাইব্রেরীটিকে সমৃদ্ধ করা হয়। পাকিস্তান চা বোর্ডের পঞ্চম বার্ষিক প্রতিবেদনে (এপ্রিল’১৯৫৭-মার্চ’১৯৫৮) দেখা যায়, ঐ সময় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের উচ্চ পদস্থ অনেক কর্মকর্তা, ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশনার এবং বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা শ্রীমঙ্গল ভিজিট করেছেন। প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ৪০টি এডভাইস এবং ৩০টি মৃত্তিকা পরীক্ষা রিপোর্ট প্রদান করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ষ্টেশনে ব্যবহারের জন্য প্র“ণিং নাইভস সংগ্রহ করা হয়েছে। এই সময়ে ২০ একর জমি জঙ্গল পরিষ্কার করে প্যান্টিং এর ব্যবস্থা নেয়া হয়। বাঁশঝাড় পরিষ্কার করে দেড় একর পরিমাণ জায়গায় প্রথম নার্সারী স্থাপন করা হয়। এছাড়া ১৩ একরের একটি সীডবাড়ি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বঙ্গবন্ধু ‘রিসার্চ কমিটি’র নাম পরিবর্তন করে ‘প্রোডাকশন এন্ড রিসার্চ কমিটি’ নামকরণ করেন। কমিটিও পুনগর্ঠন করা হয়। পুনগর্ঠিত কমিটির সদস্যরা ছিলেন এ.এ সাইদ অথবা তাঁর প্রতিনিধি (তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি), ফরিদউদ্দিন আহমেদ, জে.এফ.স্মিথ, আমিনুর রশীদ চৌধুরী, এস. এ.ই.হুসেন, ড. এম.ও.গনি এবং ড. এফ.এইচ. আব্বাসী। এই পুনর্গঠিত কমিটির দায়-দায়িত্বও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। (১) ষ্টেশনের গবেষণা কার্যক্রম প্রস্তুত, (২) প্রয়োজনীয়তা অনুসারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাঠ গবেষণা বিবেচনা করা, (৩) ব্যক্তি মালিকানাধীন (চঞঊ) বাগানগুলোর অবস্থার উন্নয়ন-পন্থা উদ্ভাবন, উৎপাদন সহায়তা প্রদান এবং (৪) গবেষণার স্বার্থে যাবতীয় কার্যক্রম বা উদ্যোগ গ্রহণ। প্রোডাকশন ও রিসার্চ কমিটি ২৪ ফেব্র“য়ারি ১৯৫৮ ইং তারিখে প্রথম সভা করে। বঙ্গবন্ধু সভায় সভাপতিত্ব করেন। এই পুনর্গঠিত কমিটি তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে চা শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। উৎপাদনও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৭-১৯৫৮ এবং ১৯৫৮-৫৯ সালের বাৎসরিক রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায় ১৯৫৭-৫৮ অর্থ বছরে একর প্রতি উৎপাদন ছিল ৬২১ পাউন্ড চা। ১৯৫৮-৫৯ অর্থ বছরে সে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় একর প্রতি ৭৪৫ পাউন্ড অর্থাৎ ১২৪ পাউন্ড বেশি। ১৯৫৭-৫৮ সালে (এপ্রিল-মার্চ) চায়ের মোট উৎপাদন ছিল ৪,৭৬,১৪,৪৯২ পাউন্ড। ১৯৫৮-৫৯ সালে (এপ্রিল-মার্চ) এই উৎপাদন দাঁড়ায় ৫,৭৫,৯৩,২৮০ পাউন্ডে। অর্থাৎ ৯৯,৭৮,৭৮৮ পাউন্ড বেশি। চা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নিঃসন্দেহে ‘রিসার্চ কমিটিকে ‘প্রোডাকশন এন্ড রিসার্চ কমিটি’ করার ফল এটি। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৭ইং ৩৩৫/৮৪৩/৫৭ সিপি স্মারকমূলে সংরক্ষিত কোটার মাধ্যমে চা রপ্তানীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। বলা হয় প্রতি মাসে সর্বোচ্চ অর্ধমিলিয়ন পাউন্ড এবং নয় মাসে সাড়ে চার মিলিয়ন পাউন্ড চা রপ্তানী করা যাবে। তবে লন্ডন অকশনে চায়ের দাম চট্টগ্রামের চেয়ে কম হলে মাসিক বরাদ্দের চাও লন্ডন অকশনে যাবে না। এই ব্যবস্থা নেয়ার অর্থ ছিল চট্টগ্রাম অকশন হাউজে চা বিক্রয়কে উৎসাহিত করা এবং বিদেশি মুদ্রার অপচয় কমানো। উলে¬খ্য, লন্ডন মার্কেটে চা অকশনের ক্ষেত্রে বড় আকারে বিদেশি মুদ্রায় ব্র“কার ব্যয়, ওয়্যারহাউস ব্যয় এবং হ্যান্ডেলিং চার্জ পরিশোধ করতে হত।
লন্ডন অকশনে চা পাঠাবার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় তাৎক্ষণিক কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়। চায়ের দাম পড়ে যায়। উলে¬খ্য, ‘প্রোডাকশন ও রিসার্চ কমিটি’র তৎপরতায় পরবর্তী অর্থ বছরে প্রায় এক কোটি পাউন্ড চা বেশি উৎপাদিত হয়। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৭ইং পাকিস্তান চা বোর্ডের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উৎপাদ ব্যয় অপেক্ষা চায়ের বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় আশংকা প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনার পর বোর্ড নিুলিখিত ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একটি স্পেশাল কমিটি গঠন করে (১) এ.এ. সাইদ সভাপতি, (২) ড. এস. এ হোসেন সদস্য, (৩) এ. খায়ের সদস্য, (৪) সি. এফ. গুড চাইল্ড সদস্য, (৫) জি.এম. মেলোন সদস্য এবং (৬) এস. এ. ই. হুসেইন সদস্য-সচিব।
বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয় কমিটি সমস্যাটির গভীরে যাবে। বাগান এবং ওয়্যারহাউজের ষ্টক যাচাই করবে। কমিটি চট্টগ্রাম অকশন হাউস পর্যন্ত চা না পাঠাবার কারণ এবং চট্টগ্রাম অকশনের বাজার ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে এবং চা শিল্পের যে কোন অভিযোগ ও সীমাবদ্ধতা অনুসন্ধান করে রিপোর্ট দেবে।
স্পেশাল কমিটি অনুসন্ধান ও যাচাই-বাছাই করে নিুলিখিত সুপারিশ পেশ করে :
১. যুক্তরাজ্যে চায়ের চালান পাঠাবার বিষয়ে বর্তমান সংরক্ষিত কোটার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে এবং কোন অবস্থায়ই তা প্রত্যাহার করা যাবে না।
২. সংরক্ষিত কোটায় শুধু লন্ডনে নয়, পশ্চিম পাকিস্তানেও চা পাঠাবার ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করতে হবে। গত তিন বছরের
গড় হিসাব করে সে গড় অনুপাতে পশ্চিম পাকিস্তানে চা পাঠাতে হবে।
কমিটির সুপারিশে বলা হয় যে, হয় পশ্চিম পাকিস্তানে চা পাঠানোর কাজে সংরক্ষিত কোটা অনুসরণ করতে হবে, অন্যথায় লন্ডন অকশনের সংরক্ষিত কোটা বাতিল করতে হবে। কমিটি কিছু বিকল্প প্রস্তাবও পেশ করে। ভারতের মতো রপ্তানী শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে চা প্রেরণে সংরক্ষিত কোটা প্রত্যাহার করা যায় বলে কমিটি অভিমত ব্যক্ত করে। কিন্তু এটি সম্ভব ছিল না একারণে যে, ভারতে রপ্তানীযোগ্য উদ্বৃত্ত চায়েল পরিমাণ ছিল তখন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড। আর পাকিস্তানের রপ্তানীযোগ্য চায়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ২০ মিলিয়ন পাউন্ড।
কমিটির সুপারিশে বোর্ড কোন সিদ্ধান্ত দেয় নি। কারণ চট্টগ্রাম অকশন হাউসকে শক্তিশালী করতে বঙ্গবন্ধু বদ্ধপরিকর ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার সম্ভবতঃ চাপের মুখেই সংরক্ষণ কোটা সম্পর্কিত নোটিফিকেশনটি সংশোধন করে ১৫ অক্টোবর ১৯৫৭ থেকে কার্যকর দেখিয়ে লন্ডনে চা লাভজনক মূল্যে বিক্রয় হোক বা না হোক ১৯৫৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সাড়ে চার মিলিয়ন পাউন্ড চা লন্ডনে পাঠাবার অনুমতি প্রদান করে। এই নমনীয়তার ফলে বস্তুতপক্ষে সংরক্ষিত কোটা মানা হয় নাই। ১৯৫৮-৫৯ সালে লন্ডন অকশনে চা গেছে ৬৭,৫৩১ টি চেষ্ট-এ ৭৪,২৮,৪১০ পাউন্ড। চট্টগ্রাম থেকে করাচি গেছে ৩৯,৫২,২৩,৫১০ পাউন্ড। ১৯৫৭-৫৮ সালে লন্ডন অকশনে গিয়েছিল ৪০,৫১,৫২১ পাউন্ড আর করাচিতে ৩,৪৬,৯৩,০৫৯ পাউন্ড। ইন্টারন্যাশনাল টি কমিটির অফিস লন্ডনে অবস্থিত। পাকিস্তান টি বোর্ড এই কমিটির সদস্য ছিল। বাংলাদেশ চা বোর্ডও বর্তমানে এই কমিটির সদস্য। সদস্য পদের জন্য সেখানে বাৎসরিক চাঁদা দেয়ার বিধান রয়েছে। আইটিসি তাদের বাৎসরিক প্রতিবেদনে নিজেদের কার্যক্রমের পাশা-পাশি সারা বিশ্বে চায়ের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, ভোগ-প্রভৃতি বিষয়ে দেশওয়ারী তথ্য প্রকাশ করে। আইটিসির বার্ষিক সভায় বিষয়গুলো আলোচিত হয়্ এতে সদস্য দেশগুলোর চা বোর্ড চেয়ারম্যানরা অংশ নিয়ে থাকেন। চায়ের মনোনয়ন এবং বিদেশে চা বাজারজাতকরণ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়।
বিদেশে চায়ের বাজার সম্প্রসারণ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের সমস্যা নিরসন কল্পে বোর্ড উচ্চ পর্যায়ের একটি মার্কেটিং সাব-কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই এবং অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন এ.এ. সাইদ, এস.এ. হোসেন, আবুল খায়ের, জি.এ. মেলোন, এম. আলম শেখ, আমিনুর রশীদ চৌধুরী, এন. এল. ম্মিথ, চা সংসদের একজন প্রতিনিধি, কেন্দ্রীয় সরকারের ট্রেডপ্রমোশন ও কমর্শিয়াল ইন্টিলিজেন্সের অতিরিক্ত পরিচালক এবং এস.এ.ই. হুসেইন সদস্য-সচিব। এই কমিটির কাজ ছিল রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্ত চায়ের বাজার সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তি প্রস্তুতকরণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের চলমান ও সম্ভাব্য চায়ের বাজার আলাদা আলাদা ভাবে চিহিৃত করে চায়ের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল উদ্ভাবন এবং বিশেষ করে চট্টগ্রাম অকশনের উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ। প্রয়োজনে এখানে ওয়্যারহাউসসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ। চা বোর্ড পুনর্গঠনের প্রেক্ষিতে নতুন করে বোর্ডের কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই কমিটিরও সভাপতি। অন্য সদস্যরা ছিলেন, এ.এ. সাইদ, আবুল খায়ের, এম. হিল্ড, ফরিদ উদ্দিন আহমদ এবং এস. এ. ই. হুসেইন। এই কমিটির সদস্যরাই মূলত বোর্ডের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। ১৯৫৭-৫৯ সালে চা বাগানগুলোতে কর্মরত ব্রিটিশ, পাকিস্তানী এবং ভারতীয় নাগরিকদের পরিচয় জানা যায় তখনকার চা সংসদের প্রেরিত তথ্য বিবরণীতে। পাকিস্তানী নাগরিকদের বাগানের ম্যানেজারসহ অন্যান্য পদে নিয়োগদানে সরকারের একটি প্রচ্ছন্ন চাপ পরিলক্ষিত হয় প্রতিবেদনগুলোয়। ১ মার্চ ১৯৫৯ তারিখে বাগানগুলোয় ম্যানেজার বা সহকারী ম্যানেজার পদে ৮৭ জন ব্রিটিশ এবং ০১ জন ভারতীয় কর্মরত ছিলেন। পাকিস্তানী ছিলেন ৫৭ জন। শতকরা হিসেবে ৫৯.১৫% ভাগ ব্রিটিশ, ৪০.১৪% ভাগ পাকিস্তানী এবং ০.৭১% ভাগ ভারতীয়। ১৯৫৭ সালে ম্যানেজারিয়াল পোষ্টে ২১ পাকিস্তানিকে নিয়োগ দেয়া হয়। চা সংসদের কর্মকর্তাগণ ১৯৬০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০% ভাগে উন্নীত করবেন বলে সচিব বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প মন্ত্রণালয়কে আশ্বস্ত করেন। চা সংসদের আরেকটি তথ্য বিবরণীতে দেখা যায় বাগানগুলোয় তখন কর্মরত ৭০০০০ হাজার শ্রমিকে মধ্যে মাত্র ২৫০ জন ছিল ভারতীয় নাগরিক। বোর্ড তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যদি পাকিস্তানী শ্রমিক পাওয়া যায় অপাকিস্তানী শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে না। তবে প্রকৃত শ্রমিক সংখ্যা তখন ছিল ৯১৭৮২ জন যা ১৯৫৮ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৪৪৫ জনে। বঙ্গবন্ধু শ্রমিকদের কল্যাণে অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। চা শ্রমিকদের ঘর-বাড়ি যাতে বসবাসের জন্য মান সম্মত হয় এজন্য বোর্ডের সভায় পাকিস্তান চা সংসদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। চা সংসদের প্রতিনিধি বোর্ড সভায় ‘মিরতিঙ্গা’ টাইপ ঘর নির্মাণ করে দেয়ার অঙ্গীকার করলে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমরা এর অগ্রগতি দেখতে চাই।
বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোর একটি অধ্যায় থাকত প্রচারণা বিষয়ের ওপর। বঙ্গবন্ধু সময়ে আভ্যন্তরীণ প্রচারণার ওপর কম গুরুত্ব দেয়া হয়। বলা হয় পর্যাপ্ত পরিমাণে চায়ের উৎপাদন না বাড়ালে অভ্যন্তরীণ প্রচারণার প্রয়োজন নেই। পরের বছরই অবশ্য পর্যাপ্ত উৎপাদনে দেশেও বাজার খুঁজতে হয়।
তবে পাকিস্তানের চাকে বহির্বিশ্বে জনপ্রিয় করে তুলবার জন্য ব্যাপক প্রচারণার উদ্যোগ নেয়া হয়। পাকিস্তান চা বোর্ড চায়ের রপ্তানী বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশে পাকিস্তান দূতাবাস এবং ট্রেড কমিশনারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে। পাকিস্তানী চায়ের গুণকীর্তন করে বুকলেট ছাপা হয়নি নামের এরূপ একটি বুকলেট বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে পাঠানো হয়। ব্রাসেলসের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় তা বিতরণ করা হয়। এখানে উলে¬খ্য, ঐ সময় বেলজিয়ামের চা সারা বিশ্বে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। জানুয়ারি ১৯৫৮ সালে সুদানের খার্তুমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ৩০০০ প্যাকেট পাকিস্তানি চা ঐ মেলায় বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। সুদান্থ পাকিস্তান দূতাবাসের বাণিজ্য সচিব সেখানকার আমদানি কারকদের মধ্যে এই চা বিতরণের ব্যবস্থা করেন। সেখানে পর্যাপ্ত বুকলেটও পাঠানো হয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে বোর্ড ১০০ পাউন্ড উন্নত জাতের চা তুরস্কের ইজমীরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মেলায় প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করে। একই বছরে অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়ও উন্নতজাতের চায়ের ১২টি নমুনা প্রদর্শনের জন্য পাঠানো হয়। বঙ্গবন্ধুর সময়ে চা বাগানগুলোর উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। উচ্চতর ফলন নিশ্চিতকরণ, সর্বোচ্চ গুনণতমান অর্জন, খরা ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনের বিষয়ে বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই লক্ষ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এবং সিলেটের ভাড়াউড়া চা বাগানে ‘রেসিষ্টেন্ট ক্লোন’ জাতের চারা লাগানো ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রথমে ক্লোন এবং পরে ক্লোন থেকে ক্লোনাল সীডবাড়ি তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। কর্ণফুলী চা বাগানে ৯৯৭ টি ব