সাম্প্রতিক সংঘটিত ছাত্র জবতার আন্দোলনের রাজপথে আবু সাঈদসহ প্রায় দুই শতাধিক ছাত্র ও অসংখ্য নিরীহ অসহায় মানুষের প্রাণ হারানোর কথা লিখতে গিয়ে বসালাম-এই দেশে যুগে যুগে পুলিশের গুলিতে ছাত্ররাই রাজপথে আন্দোলন রক্ত দিয়ে অর্জন করেছ, বাংলা ভাষা,মহান স্বাধীনতা, এরশাদের পতন, খালেদা জিয়াকে ক্ষমতার থেকে হটানো সহ একেবারে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ ও দেশে ত্যাগের বাধ্য করণের কথা লিখতে গিয়ে অনেক কথা মনেপড়েগেল-

বার বার রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে ছাত্ররা জাতির জন্য তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। তাদের সেই রক্তের স্রোতে গড়ে উঠেছে আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, স্বাধীনতার সংগ্রাম, স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদের কোটা বাতিল আন্দোলন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সূচনা ছাত্রদের হাত ধরেই হয়েছিল। তাদেরই আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের মাতৃভাষার অধিকার। রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার—এই নামগুলো আজও আমাদের অন্তরে জ্বলজ্বল করে, যেন তারা আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে কোনো অধিকার অর্জন সহজ ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্ররা আবারও বুকের রক্ত ঢেলে দেশের স্বাধীনতার পথ সুগম করেছে। তাদের সেই ত্যাগেই আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ, একটি লাল-সবুজের পতাকা।

তাদের ত্যাগ আমাদের মনে সাহসের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে, যা কখনো নিভে যাওয়ার নয়। এরপর এসেছে স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। ছাত্ররা আবারও রাজপথে নেমে আসে, স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে তাদের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তাদের রক্তে রঞ্জিত সেই রাজপথই সাক্ষী হয়ে আছে, যে গণতন্ত্রের পথ তারা প্রশস্ত করেছে।এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে, কোটা বাতিলের আন্দোলনেও আমরা দেখেছি ছাত্রদের দৃঢ় মনোবল। তাদের সংগ্রাম, তাদের ত্যাগ সব সময় আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে ছাত্ররা শুধু ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানেরও অগ্রণী সৈনিক। এ সকল আন্দোলনে যারা শহিদ হয়েছেন, তারা আমাদের গৌরবের অংশ। তাদের রক্তে স্নাত আমাদের প্রতিটি অর্জন, তাদের ত্যাগেই আমাদের আজকের এই স্বাধীনতা, এই অধিকার। আমরা কখনো তাদের সেই ত্যাগকে ভুলবো না। তাদের প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, এবং ভালোবাসা জানিয়ে আজকের এই লেখাটি লিখলাম- ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তার এই আত্মত্যাগ স্বৈরশাসন বিরোধী চলমান আন্দোলনকে বেগবান করে। পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন হয় স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এটি তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সরকারের বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচির মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে জীবন দেন ছাত্রনেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র আসাদুজ্জামান। আসাদ শহীদ হওয়ার পর তিন দিনের শোক পালন শেষে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে সর্বস্তরের মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার নামে ঢাকাসহ সারা বাংলার রাজপথে। সংঘটিত হয় উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। পতন ঘটে আইয়ুব খানের।শহীদ আসাদের এই বীরত্বগাথাকে স্মরণ করতে প্রতি বছর ২০ জানুয়ারি দেশব্যাপী শহীদ আসাদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়-তবে আসাদের সাথে আরো দুই শহিদ হয়েছিল, একজন মতিউল অন্যজন রুস্তম। ১৯৮৭ সালের ১০ ই নভেম্বর তৎকালীন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকার রাজপথে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মিছিলে শহীদ হন নূর হোসেন। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহন করেছে। বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ও ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগান ধারণ করে এইদিন মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন শহীদ নূর হোসেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে শহীদ নূর হোসেনের মহান আত্মত্যাগ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রেরণাদায়ী ঘটনা। শহীদ নূর হোসেনের রক্তদানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান হয় এবং অব্যাহত লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসকের পতন ঘটে।

ডাঃ মিলন, ২৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের এরশাদের স্বৈরচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে আন্দোলনের সংগঠক ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। ঘটনাকালে দেশব্যাপী রাজপথ-রেলপথ অবরোধ আন্দোলন চলছিল। ’৯০-এর ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের একটি সভায় যোগ দিতে রিকশায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় যাচ্ছিলেন ডা. মিলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি এলাকা অতিক্রমকালে সন্ত্রাসীরা তার ওপর গুলি চালায়। তাৎক্ষণিক তার মৃত্যু হয়।মিলনের আত্মদানের মধ্যদিয়ে সেদিনের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। অবশেষে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের কথায় আসি-
আবু সাঈদ ২০০১ সালে রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নামঃ মকবুল হোসেন, মাতার নামঃ মনোয়ারা বেগম।
আবু সাঈদের ৬ ভাই ও ৩ বোন, ৯ ভাই বোনের মধ্যে আবু সাঈদ সকলের ছোট। আবু সাঈদ স্থানীয় জাফর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপরে স্থানীয় খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাশ করেন। ২০১৮ সালে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। পরে তিনি ২০২০ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। তিনি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ২০২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
আবু সাঈদ ছিলেন ২০২৪ সালের বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের একজন কর্মী। ২০১৩, ২০১৮ সালের পর ২০২৪ সালের ৬ জুন আবারো কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয়। তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসাবে এই আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রংপুর অঞ্চলে কোটা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৫ জুলাই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুজ্জোহাকে উল্লেখ ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন।
“স্যার! (মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা), এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার! আপনার সমসাময়িক সময়ে যারা ছিলো সবাই তো মরে গিয়েছে। কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত।
আপনারাও প্রকৃতির নিয়মে একসময় মারা যাবেন। কিন্তু যতদিন বেচেঁ আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাচুঁন। নায্য দাবিকে সমর্থন জানান, রাস্তায় নামুন, শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাড়াঁন। প্রকৃত সম্মান এবং শ্রদ্ধা পাবেন। মৃত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। আজন্ম বেচেঁ থাকবেন শামসুজ্জোহা হয়ে। অন্তত একজন ‘শামসুজ্জোহা’ হয়ে মরে যাওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের আর গর্বের।”
১৬ জুলাই দুপুর ১২টা থেকেই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলে কোটা আন্দোলনকর্মীরা বিক্ষোভ করছিলো। আবু সাঈদ এই আন্দোলনের সম্মুখ ভাগেই অবস্থান করছিলো সবসময়। ১৬ জুলাই দুপুর আড়াইটা থেকে ৩ টার দিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কোটা সংস্কার শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এই ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। ছাত্রদের মধ্যে সবাই স্থান ত্যাগ করলেও আবু সাঈদ স্থান ত্যাগ করেননি। সে হাতে একটি লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। পুলিশ এই অবস্থায় তার উপরে গুলি ছুড়ে। সংঘর্ষ শুরু হলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সবার আগে ছিলেন আবু সাঈদ। অন্যরা একটু পেছনে ছিলেন। আবু সাঈদের ঠিক সামনে অবস্থান ছিল পুলিশের। পুলিশের অবস্থানের জায়গাটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে। উল্টো দিক থেকে রাবার বুলেট ছুড়ছিলেন পুলিশের সদস্যরা। তারপরও অবস্থান থেকে সরেননি আবু সাঈদ, দাঁড়িয়েই ছিলেন, তাঁর হাতে ছিল একটি লাঠি। তিনি সেই লাঠি দিয়ে রাবার বুলেট ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে শরীরে একের পর রাবার বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আবু সাঈদ। হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অন্য দিকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন:ছাত্রদের ভূমিকা ও শহিদদের তালিকা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট: ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি দেশ সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের দুটি অংশ— পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ প্রস্তাবটি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাঝে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি করে, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ছাত্রদের ভূমিকা:
ভাষা আন্দোলনের সূচনা মূলত ছাত্রদের হাত ধরেই হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৫২ সালে আন্দোলন আরও জোরদার হয়, বিশেষ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি। এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করতে গেলে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন ছাত্র শহিদ হন। শহিদদের তালিকা:
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যারা শহিদ হন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:রফিক উদ্দিন আহমেদ: ঢাকার শাহবাগে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। আবুল বরকত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ হন।আব্দুস সালাম: ডাকা মেডিকেলকলেজের কর্মচারী, গুলিতে আহত হয়ে পরবর্তীতে মারা যান। আবদুল জব্বার: পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
শফিউর রহমান: কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন এবং মারা যান। আহমদ নূরুল্লাহ: তিনিও একইভাবে শহিদ হন। ভাষা আন্দোলনের ফলাফল, এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব এতটাই যে এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে মূল প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারিবাংলাদেশে' আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালিত হয়, যা জাতিসংঘের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের গৌরব গাঁথা ইতিহাসের কথা বলতে গেলে পৃথিবীর প্রথম ছাত্র আন্দোলনের কথা বলতে হয়- পৃথিবীতে ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল চীনে। ১৬০ খ্রিষ্টাব্দে চীনের ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারের কয়েকটি নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল। সেই আন্দোলন ছুঁয়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষকেও। কারাগারে যেতে হয়েছিল ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে। এভাবেই ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ হতে থাকে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানেও ছাত্র আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিল ছাত্র সমাজ। যুগে যুগে ছাত্ররাই অধিকার আদায়ে মাঠে নেমেছে। তারা জয়ী হয়ে ফিরেছে। নয়তো ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে,
বাংলাদেশের তেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন—বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনসাতচল্লিশের দেশভাগের পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার আন্দোলন। ১৯৫২ সালে ঢাকা শহরের ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এ আন্দোলনে নামেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে গুলি করে শাসকরা। বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আইয়ুব খান শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। তাতে আইয়ুব খানের সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষা সংকোচন নীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল। রিপোর্টে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সাম্প্রদায়িক চেতনা প্রকট হয়। এ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য ১৯৬০-১৯৬১ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা হয়। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনেও বাধা আসে।১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হলে ফেব্রুয়ারিজুড়ে আন্দোলন চাঙা থাকে। শিক্ষার্থীদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আগস্টে ছাত্র ধর্মঘট ও সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্দোলন পরিণতির দিকে যায়। যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। হরতালের মিছিলে পেছন থেকে আক্রমণ করে পুলিশ ও ইপিআর। দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ হয় কোর্ট এলাকায়। পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ৩ জন। আহত হন অনেকে। গ্রেফতার হন শত শত শিক্ষার্থী। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশের ছাত্ররা পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেন। তারা সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ আন্দোলনে ছাত্ররা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এটিই মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়লেও ছাত্রদের ভূমিকা কম ছিল না। ছাত্ররা মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ নেন।নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে স্বাধীন দেশের ছাত্ররা এরশাদ সরকারের পতন ঘটান। এর জন্য কঠিন আন্দোলন করতে হয়েছে। নূর হোসেন এই আন্দোলনে শহীদ হন। যার বুকে-পিঠে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। এ আন্দোলনে ছাত্ররা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং সরকারের পতন নিশ্চিত করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন২০১৮ সালে বাংলাদেশের ছাত্ররা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এ আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শেষপর্যন্ত সরকার কোটা ব্যবস্থা সংস্কারে বাধ্য হয়। কোটা প্রথাই বাতিল ঘোষণা করেন
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ২০১৮ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে সড়কের নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনে নামে সহপাঠিরা। এ আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন পায়। সরকারকে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনবৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশ ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত জুলাই মাস থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংহিসতায় ২ শতাধিক ছাত্র-জনতা শহীদ হন। ফলে দিন দিন উত্তাল হয় সারাদেশ। এক পর্যায়ে সারাদেশের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সাধারণ ছাত্র-জনতার হাতে। ফলে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। ছাত্র আন্দোলন সব সময়ই পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ছাত্ররা তাদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। তাদের সংগ্রাম এবং ত্যাগের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। যার প্রভাব আজও বিদ্যমান। আমি পরিশেষে সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তাদের ত্যাগের কথা পৃথিবীতে চন্দ্র সূর্য যতদিন থাকবে ততদিন তাদের ইতিহাস লেখা থাকবে।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব - চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।