প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২৪, ২০২৬, ৩:৪৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৪, ১১:০৪ পি.এম
ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেপ্তার: দুবাইয়ে পাচারকৃত টাকার সিন্ডিকেটে চরম অস্থিরতাঃ-মো. কামাল উদ্দিন।

রাউজানের আলোচিত-সমালোচিত সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেপ্তারের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে গড়ে ওঠা তার বিশাল সিন্ডিকেটে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশ থেকে পাচার করা শত শত কোটি টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফজলে করিম দীর্ঘদিন ধরে আমিরাতে পাচার করা অর্থের মাধ্যমে একটি অপরাধ জগত তৈরি করেছিলেন, যেখানে চাঁদাবাজি, মাদক, নারী পাচার, জমি দখল এবং হত্যা থেকে শুরু করে একাধিক অপরাধ সংগঠিত হতো।
কালো টাকার সিন্ডিকেট এবং রাউজানের নিয়ন্ত্রণ: ফজলে করিম চৌধুরী সংযুক্ত আরব আমিরাতে অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন গ্যারেজ ফরিদ, খোরশেদ জামান, নজরুল ইসলাম, সেলিম চৌধুরী, মুসা (প্রকাশ চায়না মুসা), আবুল কাশেম, মোহাম্মদ আজগর হোসেন, মো. আক্তার হোসেন, ইউনুস মিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ আইয়ুব, আইয়ুব চৌধুরী (আইয়ুব স্টিলের মালিক), জবরুদ খান চৌধুরী (জবরুদ স্টিলের মালিক), মোহাম্মদ মোরশেদ (মুসাফ্ফা এলাকার ব্যবসায়ী), হোটেল ব্যবসায়ী নুরুন্নবী রওশন, হাটকাটা আবছার, নুরুল আমিন (প্রকাশ বডুয়া আমিন), ইঞ্জিনিয়ার মোর্শেদ, মোহাম্মদ সোলায়মান, ওমান চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি ইয়াসিন চৌধুরী, ওমান বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি মো. জসিম, নুরুল আফসার বাবলু, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ এবং ফজলে করিমের ব্যবসায়িক পার্টনার সিএনজি জসিমসহ আরও অনেকে। তাদের মাধ্যমে কালো টাকা বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করে আর্থিক সম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছিল।
দুবাইতে পাচারকৃত টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সংকট: ফজলে করিমের গ্রেপ্তারের পর পাচারকৃত টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সিন্ডিকেটের মধ্যে মতবিরোধ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। প্রবাসীদের অভিযোগ, ফজলে করিমের নির্দেশে সিন্ডিকেটের সদস্যরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন অঞ্চলে অবৈধ প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল। দুবাইয়ের শারজায় অবস্থিত রাউজান সমিতির ব্যানারে চালানো হতো এই সব অপকর্ম। খোরশেদ জামান এবং নজরুল ইসলামের অধীনে গড়ে উঠেছিল আমিরাতে ফজলে করিমের অপরাধ সাম্রাজ্য। তারা কালো টাকাকে বৈধ করার জন্য নানা অবৈধ ব্যবসা চালাতো। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন দমন এবং প্রশাসনকে ঘুষ প্রদান: ফজলে করিম চৌধুরীর সিন্ডিকেট সম্প্রতি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে দমাতে দেশের প্রশাসনসহ ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের ক্যাডারদের কাছে ১০ কোটি টাকা পাঠায়। সেই অর্থের মাধ্যমে প্রশাসনের সহযোগিতায় আন্দোলনকারীদের দমনের চেষ্টা করা হয়। ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ব্যবহার করা হয়, এমন তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের তীর সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের দিকে: ফজলে করিম ছাড়াও এই সিন্ডিকেটের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, সাবেক আর্মি চিফ জেনারেল আজিজ, তার ছোট ভাই জোসেফ, চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড ২ আসনের এমপি মামুন, নোয়াখালীর এমপি নিজাম হাজারী, সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরী, সাবেক এমপি শামীম ওসমান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, হাটহাজারী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুস গনি চৌধুরী, ফটিকছড়ি ৫ আসনের এমপি খাদিজাতুল আনোয়ার সনি, সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির, সাবেক এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চু, রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল (প্রকাশ ঘি বাবুল), পৌর মেয়র জমির উদ্দিন পারভেজ সহ আরও অনেকেই। তাদের কাছে ফজলে করিমের পাচার করা টাকার এক বড় অংশ জমা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিন্ডিকেটের ভাঙন এবং পাল্টাপাল্টি অবস্থান: ফজলে করিমের গ্রেপ্তারের পর এই সিন্ডিকেটে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ রাউজানের সাবেক বিএনপি সমর্থিত এমপি গিয়াস কাদের চৌধুরীর কাছে গিয়ে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে তার সহায়তা চেয়েছে। প্রবাসী এবং রাউজানের বাসিন্দারা ফজলে করিমের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং তার ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেপ্তার শুধুমাত্র রাউজানের মানুষের জন্য নয়, বরং প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্যও এক বড় স্বস্তির সংবাদ। তার সিন্ডিকেটের অপকর্মের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়তে শুরু করেছে এবং এখন জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এতদিন এই অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কেউ আওয়াজ তুলতে পারেনি। প্রবাসীরা এখন তার শাস্তির অপেক্ষায়।
Copyright © 2026 Chattol Voice. All rights reserved.