প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২৫, ২০২৬, ৮:০২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৪, ১১:৫৯ পি.এম
কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও আমাদের দাবি: নাজমুল ইসলামের খোলামেলা আলোচনাঃ-মো. কামাল উদ্দিন।

চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনের এক অন্যতম প্রধান দাবি হলো কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট সেতু নির্মাণ। বহু বছর ধরে এই সেতুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা এই দাবি নিয়ে সরাসরি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছি। ৩০শে সেপ্টেম্বর, বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম রেলওয়ে বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম সাহেবের দপ্তরে একটি সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী, তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আমাদেরকে গ্রহণ করেন। আমি, মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব হিসেবে বিভিন্ন সময়ে নাজমুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনি একজন অত্যন্ত ভদ্র, উন্নয়নমুখী এবং দক্ষ কর্মকর্তা। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম রেলওয়েতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
আমাদের এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিলো কর্ণফুলী নদীতে কালুরঘাট সেতুর দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা। আমরা সরকারের কাছে সেতুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে স্মারকলিপি আকারে একটি প্রস্তাবনা জমা দিয়েছি। নাজমুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে আলোচনায় তিনি সেতুর বর্তমান পরিস্থিতি, সরকারের সদিচ্ছা এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি আমাদের জানান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ অনুযায়ী সেতুটির কিছু মেরামতি কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলে এটি আপাতত চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
তবে আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে কাজের স্থায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত এই মেরামত করা সেতুটি ব্যবহারের উপযোগী থাকবে। যদিও আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ছিলো যে, সেতুর মেরামতকাজ মূলত উপরের অংশে করা হয়েছে, অথচ সেতুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পানির নিচে থাকা পিলারগুলো। তিনি জানান, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল সেতুর সমস্যাগুলো মূল্যায়ন করে কাজ করেছে এবং সেই অনুযায়ী মেরামতি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আমি আরও উল্লেখ করি যে, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ইটের দুটি পিলার বহু বছর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, অথচ সেগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি। নাজমুল ইসলাম সাহেব আমাদের আশ্বস্ত করেন যে অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সেতু ব্যবস্থাপনার জন্য ইজারাদার নিয়োগের সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে আমি মনে করিয়ে দিই, এখন পাঁচ জোড়া ট্রেন চলাচল করে, যা আগের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি যানজটের কারণ হতে পারে। এতে সেতুর উপর আরও বেশি চাপ পড়তে পারে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। নাজমুল ইসলাম সাহেব বলেন, আপাতত এ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান নেই, তবে নতুন সেতু নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সাবধানে সেতু ব্যবস্থাপনা করা হবে। ফেরি পরিষেবা চালু থাকবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। আমরা চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই যে, আমরা বহু বছর ধরে কালুরঘাট সেতুর দাবিতে আন্দোলন করে আসছি এবং নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব। তিনি আমাদের দাবির প্রতি সহমত প্রকাশ করে জানান, সংস্কারকাজ যতই ভালো হোক, এটি কেবল অস্থায়ী সমাধান। নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আমরা তাঁকে মজা করে বললাম, "আপনি যদি বলেন যে মেরামতকৃত সেতুটি অনেক বছর টিকে থাকবে, তাহলে সরকার নতুন সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। বরং আপনি আল্লাহর ওয়াস্তে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রচার করুন, তাহলে আমাদের নতুন সেতুটি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে।" নাজমুল ইসলাম সাহেব হেসে বললেন, "আমি নিজেও চাই নতুন সেতু হোক, মেরামতকাজ সম্পূর্ণ অস্থায়ী।" আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পুরাতন এই সেতুর বয়স শেষপ্রায়, এবং এটি আর বেশি দিন টিকে থাকার মতো অবস্থায় নেই। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়। দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বোয়ালখালী এবং কক্সবাজারের রেল যাত্রীরা এই সেতুর কারণে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। নতুন সেতু নির্মাণ হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং বোয়ালখালী একটি আধুনিক উপশহরে রূপান্তরিত হবে, সেখানে শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং কর্ণফুলী নদীর পুরো অঞ্চল একটি নতুন উন্নয়নধারায় প্রবেশ করবে। পর্যটন শিল্পেরও উন্নয়ন ঘটবে, এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রস্তাবনা-জনাব সচিব মহোদয়,আশা করি আপনি ভালো আছেন। কর্ণফুলী নদীর উপর কালুরঘাট সেতু নির্মাণের পূর্বের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবনা পাঠানো হচ্ছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ১৯৩০ সালে নির্মিত কালুরঘাট সেতুটি এখন অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে এবং ব্যবহারের জন্য আর উপযুক্ত নয়। বহু বছর ধরে এই সেতুর সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। যদিও সাময়িকভাবে সেতুর কিছু সংস্কার কাজ করা হয়েছে, তবুও এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। এদিকে, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আধুনিক রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আশা করছি, সরকারের পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কালুরঘাট সেতুর কাজ দ্রুত শুরু হবে। নতুন সেতু নির্মাণ হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের পর্যটন ও শিল্প খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে, এই সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রাম একটি উন্নত শহরে পরিণত হবে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
আমাদের প্রস্তাব হল, কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একনেকে এই প্রকল্পটি পাশ করানো এবং ২০২৫ সালের মধ্যে কাজ শুরু করা। ২০২৮ সালের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার দাবিও আমরা জানাই, কারণ এই সেতুর দৈর্ঘ্য পদ্মা সেতুর তুলনায় অনেক কম এবং এই সময়ে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। আমরা সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সহায়তা নেওয়ারও প্রস্তাব করছি, যাতে দ্রুত ও নিরাপদভাবে সেতুটির কাজ শেষ করা যায়। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই সেতুর দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। আমাদের প্রস্তাব, কালুরঘাট সেতুর প্রকল্পটি দ্রুত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) থেকে অনুমোদন নিয়ে বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হোক। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। আমাদের প্রস্তাবটি গ্রহণ করে দ্রুত কার্যকর করার জন্য আমরা আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
প্রস্তাবনা উপস্থাপনে- চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান, ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ও মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন- এই আলোচনা থেকে বোঝা যায়, কালুরঘাট সেতু নিয়ে সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে, তবে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রেখে দ্রুত সেতু নির্মাণে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা সরকারের কাছে আমাদের দাবিগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছি এবং আমরা আশাবাদী, এই দাবি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের মাধ্যমে এই স্মারকলিপি প্রদানকালে ফোরামের আমার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের যাঁরা উপস্থিত ছিলেন আলহাজ্ব নুর মোহাম্মদ , আলহাজ্ব নুর আলী, একেএম ওসমান গনি,কবি লেখক কামরুল ইসলাম , মোহাম্মদ মুনচুর আলম, মাসুদ খাঁন, তসলিম খাঁ, মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন খন্দকার, সাংবাদিক আশিফ,মোহাম্মদ আকতার হোসেন, মোহাম্মদ নুর,পংকজ রাহুল, ইব্রাহিম, মিলনসহ নাগরিক ফোরামের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব- চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
Copyright © 2026 Chattol Voice. All rights reserved.