
আজ যে বিষয়ে লিখতে বসেছি, তা নিয়ে আমি বহুবার লিখেছি। তবে আজকের লেখায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বর্তমানে দেশে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এক বিপুল পরিবর্তন শুরু হয়েছে, এবং চট্টগ্রামও এর থেকে পিছিয়ে নেই। চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন পর ‘চট্টগ্রাম ক্লাব’ নামে এক শ্রেণীর মাফিয়া সাংবাদিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকরা বৈষম্যের শিকার হয়ে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।
এ ক্লাবের প্রভাবশালী সাংবাদিকদের মুখোশ উন্মোচনে কর্মরত সাংবাদিকরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন জোরদার করেছে। আমিও তাদের একজন, কারণ একজন কলম সৈনিক হিসেবে বৈষম্যের শিকার হওয়া সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমার অবস্থান স্পষ্ট। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের কিছু বন্ধুরা একটি সংঘবদ্ধ দল গঠন করে সাংবাদিকদের লাইসেন্স দেওয়া শুরু করেছে। তাদের সনদ ছাড়া কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারবে না! তাদের দৃষ্টিতে প্রেসক্লাবের সদস্য ছাড়া আর কেউ সাংবাদিক নয়। তারাই নিজেদের এজেন্ট হিসেবে সাংবাদিক তৈরির কারিগর মনে করছে। সাধারণ মানুষ এখন আর বোকা নয়; তারা এ কলকারখানা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। প্রেসক্লাবে হাতেগোনা কয়েকজন পেশাদার সাংবাদিক ছাড়া বাকি সবাই কবে কোথায় সাংবাদিকতা করেছে, তা খুঁজে দেখার প্রয়োজন।
আমি যখন লেখালেখি শুরু করি, আজকের এই প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব দানকারীদের অনেকেই তখন শহরেই আসেনি। আমি ১৯৮৮ সাল থেকে লেখা শুরু করি, আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে। প্রথমে ম্যাগাজিন দিয়ে লেখালেখির শুরু, যার স্বাক্ষী রূপম চক্রবর্তী এখনো বেঁচে আছেন। এরপর ঢাকার বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লিখতাম, তবে পুরো দমে সাংবাদিকতা শুরু করি অপরাধ জগতের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দিয়ে। এরপর বিনোদন ম্যাগাজিন ‘রূপনগর’ এবং রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘সংবাদচর্চা’তে কাজ শুরু করি। পরে দৈনিক খবর গ্রুপের ‘দৈনিক খবর’, জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘চিত্রবাংলা’, ‘বর্তমান দিনকাল’, ও বিনোদন ম্যাগাজিন ‘ছায়াচন্দ’তে একনাগাড়ে বহু বছর কাজ করেছি।
১৯৯৪ সালে আমি এবং মুক্তিযোদ্ধা গবেষক সাংবাদিক জামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম থেকে সর্বপ্রথম ফোরকালার অপরাধ ও রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘চট্টলচিত্র’ প্রকাশ করি। আমি ছিলাম নির্বাহী সম্পাদক, এবং রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও মহসিন কাজি নিয়মিত লিখতেন। প্রথম সংখ্যার প্রকাশের দিন মোঘল বিরিয়ানিতে খাওয়ার স্মৃতিটি নিশ্চয় তাদের মনে আছে। এরপর আমি ও চৌধুরী লোকমান মিলে ‘দৈনিক সময়ের আলো’ কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দুঃখজনক ভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে আমরা টাকা হারাই। তবে আমরা হতাশ না হয়ে ‘সাপ্তাহিক সময়ের আলো’ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করি, যা এখনো চলছে।
এর মধ্যে আমি ‘দৈনিক পূর্বকোণ’ ও ‘দৈনিক আজাদী’তে নিয়মিত কলাম লিখেছি প্রায় পাঁচ বছর। এর আগে ‘দৈনিক ঈশান’ ও ‘নয়াবাংলা’তে লিখতাম, পরে ‘দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ পত্রিকাতেও নিয়মিত লিখেছি। দেশের অসংখ্য ম্যাগাজিন ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখা দিতাম। বর্তমানে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা “সকালের সময়” বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে লিখে আসছি: তাও ২০১৮ সাল থেকে। দেশের বাইরের বিভিন্ন পত্রিকায়ও লেখার সুযোগ পেয়েছি এবং এখনো লিখছি।
পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি ২০১৭ সালে বাংলা টিভিতে আমার উপস্থাপনায় ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’ অনুষ্ঠান শুরু করি। চট্টগ্রাম সংলাপের পাশাপাশি ‘সচিত্র চট্টগ্রাম’, ‘কিছু কথা কিছু গান’, এবং ‘কথার কথা’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানসহ একটানা প্রায় চার বছর টেলিভিশনে উপস্থাপনা করেছি। মাঝখানে কয়েকটি টকশো এটিএন বাংলাতেও করেছি। আমার অনুষ্ঠানের কারণে বাংলা টিভি দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে।
একটি কথা বিশ্বাস করি, লিখতে হলে পড়তে হবে। সেই সুবাদে আমি দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি অন্তত পঞ্চাশ হাজার দেশি-বিদেশি বই পড়েছি। বাংলাদেশের এমন কোনো পাবলিক লাইব্রেরি নেই, যেখান থেকে আমি বই পড়িনি বা সংগ্রহ করিনি। আমার বাসা এবং অফিসকে বইয়ের ভাণ্ডার বলা যায়। সেই পড়া থেকেই বই লেখা শুরু করেছি।
২০০৮ সালে আমার প্রথম বই “বাঁকা কথা” প্রকাশিত হয়। বর্তমানে আমার বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৩০টি, আমার লেখা গ্রন্থসমূহ এবং সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা আমার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বাঁকা কথা, সমকালীন কথা, টক টক কথা, নারী কথা, সমকথা, কথার কথা, কথার মতো কথা, চোর কথা, ঠাট্টা কথা, বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচনি তথ্য-উপাত্ত, সর্বনাশা আগস্ট, পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ, তাদের কথা, জানা অজানা কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা, কর্ণফুলী কথা, জীবন কথা, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা, আদিবাসী সাহিত্য ও সংস্কৃতি, রোহিঙ্গাদের ইতিকথা, মেঘের বুকে জল, নির্মম নিয়তি, অবশেষে, মনের কথা, চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা, ইতিহাসের পাতা থেকে জানা কথাএবং আমার জীবন কথা।
এছাড়াও আরো ৪-৫টি বই প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।, বাংলাদেশের নির্বাচন, বিষয়ক বইটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স হিসেবে গৃহীত হয়েছে, যা আমার জন্য অত্যন্ত গৌরবের। নারী কথা, বইটির মধ্যে একটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখযোগ্য—সৌদি আরবের বিদ্রোহী রাজকন্যা সুরাইয়া’র সাক্ষাৎকার, যা আমি ২০০৪ সালের ফাস্ট নাইটে কাতারের হোটেল শেরাটনে নিয়েছিলাম।
আমার প্রথম উপন্যাস **নির্মম নিয়তি** শীঘ্রই ধারাবাহিক নাটক হিসেবে প্রচারিত হবে। এর মধ্যে আমার লেখা একাধিক টেলিফিল্ম বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর উপর আমার লেখা একটি গান আর্কাইভে সংরক্ষিত হয়েছে। আমি বর্তমানে দৈনিক সকলের সময়, পত্রিকায় বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি, দৈনিক শাহ আমানত পত্রিকা, চট্টগ্রাম পাতা, এবং একাধিক পত্রিকা ও অসংখ্য অনলাইনে চলমান বিষয়ে নিয়মিত লিখে যাচ্ছি।
তবে আমি নিজেকে দালালি, চাঁদাবাজি বা তোষামোদকারী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত করা থেকে সবসময় দূরে রেখেছি। আমার সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো **সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা** বইটি।
আমি মনে করি,সাংবাদিকতা করতে হলে বা কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কথা বলার আগে এই বইটি পড়া জরুরি। এ বইতে সাংবাদিকতা কী, কত প্রকার, এবং এর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
যারা সাংবাদিকতা সম্পর্কে জানার আগ্রহ রাখেন, তাদের কাছে আমার অনুরোধ—এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে আমার কাছে আসুন। আমার বইটিই আপনার প্রশ্নের যথেষ্ট উত্তর দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।আমি পেন ইন্টারন্যাশনাল এর সদস্য, এবং অসংখ্য দেশে ভ্রমণ করেছি। বিশ্বের সাতজন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশিষ্ট মানুষদের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি।
সত্যি বলতে, যারা প্রকৃত নির্ভীক মনোভাবের লেখক বা সাংবাদিক, তারা অন্য কোনো সাংবাদিককে ছোট করে দেখে না। আমাদের দেশে বিশেষ করে চট্টগ্রামে কিছু কিছু সংকীর্ণ মানসিকতার সাংবাদিক আছেন, যারা নিজের অবস্থান ভুলে গিয়ে অন্যদের সমালোচনা করেন। তারা কতটা নিচুমানের সাংবাদিক, তা তাদের আচরণেই স্পষ্ট। আমি পৃথিবীর বিখ্যাত সাংবাদিকদের কাছে পেয়েছি, কিন্তু তাদের মধ্যে আত্মঅহংকার দেখিনি। বরং, তারা যত বড় মাপের সাংবাদিক, তাদের মনও তত বড়। আমাদের চট্টগ্রামের কিছু তথাকথিত সাংবাদিকদের মতো ক্ষুদ্র মনের নয়।
আমি বুঝি না, সাংবাদিকের মধ্যে ছোট-বড় কীভাবে হতে পারে? মনে রাখবেন, সাপ বড় হলেও বিষ একই থাকে, সাপ ছোট হলেও। সাংবাদিক যেই হোক, কলমের বিষ কিন্তু সমান। প্রেসক্লাব সদস্যের কলমে যে আগুন জ্বলে, তেমনি তৃণমূলের অখ্যাত সাংবাদিকের কলমেও তা জ্বলে। মফস্বল সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের “কাগজের মানুষ” বইটি প্রেসক্লাবের তথাকথিত নেতাদের পড়া দরকার।
আমাদের মতো যারা আত্মপরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করি, তারা যখন তথাকথিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কলম ধরবে, তখনই বোঝা যাবে, আসল সাংবাদিকতা কাকে বলে। প্রেসক্লাব বা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য হওয়া বড় কথা নয়, বড় কথা হলো বড় মন নিয়ে সাংবাদিকতা করা।
পরিশেষে, জাতির বিবেকরূপে সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রাখলাম: প্রেসক্লাবের সদস্য যারা নয়, তারা কি সাংবাদিকতার অধিকার রাখে না? তারা কি সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে হলে প্রেসক্লাবের তথাকথিত নেতাদের অনুমতি নিতে হবে?
লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক।










