বিগত ৮ বছরে পাঠকের আস্থা ও ভালোবাসায় জাতীয় দৈনিক বিজয় পত্রিকা বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশের মাধ্যমে আরও একধাপ এগিয়ে গেছে। এই উপলক্ষে ৯ নভেম্বর ২০২৪, শনিবার বিকেল ৩টায় চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনস্টিটিউটের গ্যালারি হলে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আমি মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাই। আমার বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা, এবং সাংবাদিকতার বর্তমান প্রেক্ষাপট।
আমি আলোচনা করি, সাংবাদিকতা শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি একটি বিবেকের তাগিদে পরিচালিত দায়িত্ব। কিন্তু আজকের দিনে আমরা দেখছি, সংবাদপত্রে সাংবাদিকতার নামে কতিপয় নামধারী সাংবাদিকের আনাগোনা, যাদের কাছে সাংবাদিকতা শুধুমাত্র এক ধরনের কার্ডধারি পরিচয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা পড়াশোনার দিকে মনোযোগ দেন না, ফলে তাদের লেখার গভীরতা ও ধারাবাহিকতায় অভাব দেখা যায়। অথচ প্রকৃত সাংবাদিক হতে হলে এবং কলমের শক্তি বাড়াতে হলে পড়াশোনা অপরিহার্য।
বর্তমান সাংবাদিকতার জগৎটিতে দেখা যাচ্ছে, মালিকানা চলে গেছে এক শ্রেণীর মাফিয়াদের হাতে, যারা কেবল নিজের স্বার্থেই কাজ করছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ দালালি ও তোষামোদিকে পেশার অংশে পরিণত করেছেন। সংবাদপত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য জনগণের সঠিক খবর পৌঁছে দেওয়া, কিন্তু এই পেশাদারিত্ব হারিয়ে গিয়ে সংবাদপত্রে মুক্ত সাংবাদিকতার জায়গা সংকুচিত হয়েছে। সাংবাদিকদের কাছে আমার আহ্বান, আমরা যেন আবারো নৈতিকতা ও মানের প্রশ্নে সাংবাদিকতাকে মূল্যায়ন করি। সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সত্য এবং নির্ভীক মনোভাব। পত্রিকার প্রচার সংখ্যা নয়, বরং সংবাদ ও লেখার মানই আসল। আজকের দিনে সাংবাদিকতার নামে অনেকেই কেবল একটি কার্ড হাতে নিয়ে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করেন, অথচ প্রকৃত সাংবাদিকের পরিচয় নির্ভর করে তার কলমের শক্তির উপর। এই কার্ডটি কেবল একটি পরিচয়ের বাহক, যা তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি দিতে পারে, কিন্তু এটি সাংবাদিকতার আসল গুণাবলি ও মূল্যবোধের মাপকাঠি নয়। প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিচয় হলো তার লেখনীর গভীরতা, সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা, এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসিকতা।
সাংবাদিকতার কাজ হলো সমাজের বিভিন্ন স্তরের সঠিক চিত্র তুলে ধরা এবং সত্যকে প্রকাশ্যে আনা। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কলমই প্রমাণ করে, তিনি আদতে আসল নাকি নামধারী সাংবাদিক। কলমের ধারায় তার সততা, নিরপেক্ষতা, এবং দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হয়। কোনো কার্ড বা বাহ্যিক পরিচয়ের মাধ্যমে এই গুণাবলি অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, কিছু লোক কেবল সংবাদপত্রের পরিচয়পত্র বা কার্ড ব্যবহার করে নিজেদের ব্যক্তিগত লাভের জন্য এই পেশায় অবস্থান নিয়েছেন। এরা নিজেদের পরিচয় দিতে পারেন “সাংবাদিক” নামে, কিন্তু এদের কলমে নেই সঠিক সংবাদের জন্য সমাজের দায়বদ্ধতা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। এমনকি, অনেক সময় এরা বিভিন্ন স্বার্থপরায়ণ গোষ্ঠীর স্বার্থে দালালি বা তোষামোদির কাজ করেন, যা প্রকৃত সাংবাদিকতার মূল্যবোধকে অবমাননা করে। প্রকৃত সাংবাদিকের পরিচয় আসে তার কাজের মান থেকে। তার লেখনীর মাধ্যমে সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংকটের কথা উঠে আসে। একজন প্রকৃত সাংবাদিক নিজেকে শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের সঙ্গে সীমাবদ্ধ রাখেন না; বরং সমাজের প্রকৃত সমস্যা ও জনগণের দাবির পক্ষে দাঁড়িয়ে লেখেন। তার কাজের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ন্যায়, সত্য, এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
এজন্য প্রয়োজন হয় পড়াশোনা ও গবেষণার, কারণ একজন প্রকৃত সাংবাদিক হতে হলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে শাণিত করতে হয়। এ ধরনের সাংবাদিকতা করতে হলে পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। কলমের ধারাই প্রকৃত সাংবাদিকের মর্যাদা নির্ধারণ করে। এই জন্য আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কার্ডধারী নয়, কলমধারী সাংবাদিকই সমাজের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারেন। তার কলমই তার আসল পরিচয়, এবং এই পরিচয়ের ভিত্তিতেই তিনি সত্যিকারের সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাই, আসুন আমরা সাংবাদিকতার প্রতি এই দায়িত্ববোধের পরিচয় দিই। আমাদের কলম যেন হয়ে ওঠে ন্যায় এবং সততার প্রতীক, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সাহসিকতা।পৃথিবীতে বিভিন্ন পেশার মানুষেরা সাংবাদিকতা করে বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক হয়েছে, তা দেখুন–কয়েকজন বিশিষ্ট সাংবাদিক আছেন, যাঁরা মূলত অন্য পেশায় কাজ করলেও সাংবাদিকতা পেশায় এসে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁদের মধ্যে কিছু বিখ্যাত নাম হলো: এডগার স্নো (Edgar Snow) – মার্কিন সাংবাদিক এবং লেখক, মূলত চীনে সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিখ্যাত হন। তিনি ছিলেন একটি ব্যাংকের কর্মী, পরে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন এবং চীনের অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম নিয়ে তাঁর লেখা খুবই প্রভাবশালী। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (Ernest Hemingway) – নোবেলজয়ী লেখক, যিনি মূলত সাহিত্যিক হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেবাকর্মী এবং পরে সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছেন। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহেও তিনি ছিলেন অন্যতম।মার্থা গেলহর্ন (Martha Gellhorn) – একজন লেখক হিসেবে শুরু করেন, কিন্তু পরে সাংবাদিকতায় এসে যুদ্ধসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কভার করেন।
অরওয়েল জর্জ (George Orwell) – সাহিত্যিক ও লেখক, যিনি সাংবাদিক হিসাবেও কাজ করেছেন এবং স্পেনের গৃহযুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করেছেন। হান্টার এস. থম্পসন (Hunter S. Thompson) – সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, যিনি গনজো সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠাতা। সাংবাদিকতার জন্য মূলত তিনি নিজের অনন্য ধারায় পরিচিতি লাভ করেন। এঁরা সাধারণ পেশা থেকে সাংবাদিকতায় আসার পর তাদের স্বকীয়তার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় অবদান রেখেছেন এবং তাঁদের লেখা আজও প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা খুব সাধারণ পেশা বা সংগ্রামী জীবনের মধ্য দিয়ে উঠে এসে সাংবাদিকতায় অবদান রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই একসময় অর্থের অভাবে নানা রকম সাধারণ কাজ করেছেন, এমনকি রাস্তায় ফেরি করতেন। এখানে কিছু উল্লেখযোগ্য নাম দেওয়া হলো: এলি উইজেল (Elie Wiesel) – হলোকাস্ট থেকে বেঁচে আসা এই নোবেলজয়ী সাংবাদিক ও লেখক তাঁর জীবনযুদ্ধে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। তিনি একসময় টুকিটাকি কাজ করতেন এবং পরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।
নেলসন এলগ্রেন (Nelson Algren) – যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক, যিনি বিভিন্ন সংগ্রামী কাজ করতেন এবং রাস্তায় বইপত্র ফেরি করতেন। তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁর লেখার মাধ্যমে ফুটে ওঠে। এ. জে. লিব্লিং (A.J. Liebling) – এই মার্কিন সাংবাদিক ছিলেন সংগ্রামী ব্যক্তি, যিনি নিউইয়র্ক সিটিতে নানা রকম সাধারণ কাজ করতেন। তাঁর সাংবাদিকতা ও লেখালেখি তাঁকে একসময় বিখ্যাত করে তোলে। জ্যাক লন্ডন (Jack London) – মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক, যিনি তাঁর কিশোর বয়সে অনেক কঠিন কাজ করেছিলেন, এমনকি এক সময় রাস্তায় জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। পরে তাঁর সাংবাদিকতা ও লেখার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।এঁরা জীবনের শুরুতে অর্থের অভাবে বা সংগ্রামী জীবনের কারণে বিভিন্ন সাধারণ কাজ করলেও পরে তাঁদের কাজ ও লেখার মাধ্যমে সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রভাব ফেলেছেন।
সাংবাদিকতার সংকটে যে মূল বার্তা উঠে আসে তা হলো, সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয় এবং মর্যাদা নির্ভর করে একজন সাংবাদিকের সৎ কাজ, নির্ভীকতা, এবং পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতার উপর। কেবলমাত্র একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং সমাজের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকারই তাদের প্রকৃত মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে। তাই, সত্যিকার অর্থে সাংবাদিক হতে হলে তাদের নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে।
এই লেখার আলোকে সাংবাদিকদের জন্য পরামর্শমূলক কিছু কথা সত্যের পক্ষে নির্ভীক থাকুন: পেশার নির্ভীকতা ও সত্য বলার সাহসই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয়। কোনো স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর চাপ বা রাজনৈতিক প্রভাব আপনার কলমের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে দেওয়া উচিত নয়। পঠন-পাঠনের গুরুত্ব: প্রতিনিয়ত পড়াশোনা ও গবেষণা করতে হবে। একজন ভালো সাংবাদিকের লেখার গুণমান এবং ভাবের গভীরতা তার জ্ঞানের ভিত্তিতেই নির্ভর করে। কাজের ক্ষেত্রে সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা জরুরি। নৈতিকতার মান বজায় রাখুন: পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখাই একটি দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য নৈতিকতা এবং পেশাদারিত্বের মান বজায় রাখা অপরিহার্য।
পেশার সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ: সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের বিভিন্ন স্তরের বাস্তবতা তুলে ধরা। ব্যক্তিগত লাভের জন্য এই পেশাকে ব্যবহার করা সাংবাদিকতার মূল স্রোতকে বিপথে চালিত করে। পাঠকদের আস্থা অর্জন করুন: একটি সংবাদপত্র বা সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার পাঠকদের আস্থা। এই আস্থা অর্জন করতে হলে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে, যাতে পাঠকের মনের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন হয়। প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন: আজকের পৃথিবীতে সাংবাদিকতা নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রকৃত সাংবাদিকদের উচিত এই চ্যালেঞ্জগুলোকে জয় করে সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আমরা আলোর পথে থাকি এবং কলমকে সমাজের পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।
লেখকঃ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান ও যুগ্ন সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ ও The Daily banner এবং গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক।