, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 27° সে. | 💧 আদ্রতা 76%

কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের মাছ, পানি ও তলদেশের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে, হ্রদের পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার পাশাপাশি তলদেশের পলি এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছেও এসব দূষকের উপস্থিতি রয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের এই বিস্তার হ্রদের জীববৈচিত্র্য ও জলজ পরিবেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এসব কণা প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গবেষণাগুলোতে প্লাস্টিক দূষণের উৎস হিসেবে গৃহস্থালির বর্জ্য, পর্যটন কার্যক্রম, মাছ ধরার সরঞ্জাম এবং প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহারের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এ সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।

পানি ও তলদেশের পলিতে দূষণের প্রমাণ

২০২৫ সালে Journal of Hazardous Materials Advances-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় কাপ্তাই হ্রদের ১৪টি স্থানের উপরিভাগের পানির ৪২টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ১৩ দশমিক ৩৩ থেকে ৬৮৩টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। নমুনায় পলিথিন (PE) ও পলিইথিলিন টেরেফথালেট (PET) ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়। গবেষকেরা গৃহস্থালির বর্জ্যপানি ও মাছ ধরার কার্যক্রমকে সম্ভাব্য দূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে Journal of Contaminant Hydrology-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় হ্রদের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে পানি ও তলদেশের পলির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৬৫০ থেকে ২ হাজার ৪৫০টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ১৩৫ থেকে ৬০৭ দশমিক ৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। স্থানভেদে দূষণের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও দেখা গেছে।

গবেষণায় শনাক্ত কণাগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র তন্তুর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। প্লাস্টিকের প্যাকেট ও মোড়ক, কৃত্রিম তন্তুর কাপড় এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম থেকে এসব কণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

মাছের শরীরেও মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা

কাপ্তাই হ্রদের মাছ নিয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলোতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের নমুনা বিশ্লেষণে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র তন্তু, অনিয়মিত আকৃতির কণা এবং বিভিন্ন ধরনের পলিমারের সন্ধান পাওয়া গেছে।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, মাছের পরিপাকতন্ত্রে এসব কণার উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তবে কিছু গবেষণায় মাছের ফুলকা ও খাওয়ার উপযোগী পেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ফলে বিষয়টি শুধু জলজ পরিবেশের দূষণ হিসেবে নয়, খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, মাছের প্রজাতি, আকার, খাদ্য গ্রহণের ধরন এবং নমুনা সংগ্রহের স্থান অনুযায়ী দূষণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কয়েকটি নমুনার ফলাফল দিয়ে হ্রদের সব মাছের দূষণের মাত্রা সম্পর্কে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

মানবস্বাস্থ্য নিয়ে কী বলছে গবেষণা?

মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়েই গবেষণা চলছে। কাপ্তাই হ্রদের মাছের নমুনায় এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া মানেই মাছ খেলে নির্দিষ্ট কোনো রোগ হবে, এমন সিদ্ধান্ত এসব গবেষণা থেকে টানা যায় না। মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা এবং নিরাপদ খাদ্যগ্রহণের সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

কাপ্তাই হ্রদ মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পর্যটন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই হ্রদে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, পর্যটনকেন্দ্র ও বাজার এলাকায় কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা গড়ে তোলা, মাছ ধরার পরিত্যক্ত জাল ও সরঞ্জাম যথাযথভাবে অপসারণ এবং নিয়মিত পানি, পলি ও মাছের নমুনা পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকেরা।

তাদের মতে, গবেষণার ফলাফলকে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে দূষণ প্রতিরোধের কার্যকর উদ্যোগে কাজে লাগানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটন ব্যবসায়ী এবং মৎস্যজীবীদের সমন্বিত অংশগ্রহণই কাপ্তাই হ্রদের পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইতি /

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত