, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 26° সে. | 💧 আদ্রতা 93%

নিরাপত্তা ঘাটতির পরও চলছিল কাজ, ভাটিয়ারীতে বিষাক্ত গ্যাসে গেল ৯ প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতির কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জাহাজটির ব্যালাস্ট ট্যাংকসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। কয়েকজনকে উদ্ধারে গিয়ে অন্য শ্রমিকরাও গ্যাসের সংস্পর্শে আক্রান্ত হন।

নিহত ৯ শ্রমিকের মধ্যে সীতাকুণ্ডের দুই ভাই মোহাম্মদ মনসুর ও মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, আব্দুল আলীম, রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, পলাশ জলদাস, সানি জলদাস, মতিউর রহমান ও খোকন মিয়া রয়েছেন

দুর্ঘটনার আগে ছিল নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি আপত্তি

দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কারখানাটির আগের নিরাপত্তাব্যবস্থা। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিল পরিদর্শন করে শ্রমিক নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশসংক্রান্ত কয়েকটি অনিয়ম শনাক্ত করেছিলেন।

পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা সচেতনতার ঘাটতি ছিল। পাশাপাশি জাহাজভাঙার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রয়োজনীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন না দেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে।

কর্মঘণ্টা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। নির্ধারিত সময়ের বাইরে শ্রমিকদের কাজ করানো এবং অতিরিক্ত কাজের জন্য ওভারটাইমের অর্থ না দেওয়ার অভিযোগও পরিদর্শনে উঠে এসেছিল বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।

এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সংশোধনের জন্য একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়। পরে সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় গত জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়েছে।

তবে আগের পরিদর্শনে শনাক্ত হওয়া ঘাটতিগুলো দুর্ঘটনার আগে সংশোধন করা হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

এলএনজি বহনকারী জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনা

দুর্ঘটনার শিকার ‘এমটি রাসি’ জাহাজটির ওজন প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন। এটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। জাহাজটি কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনও ছিল।

শুক্রবার সকালে জাহাজটির একটি ট্যাংকসংলগ্ন অংশ কাটার কাজ চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কাজ শুরুর কিছুক্ষণ পর দুজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন শ্রমিক আক্রান্ত হন।

একপর্যায়ে ফোরম্যান ও নিরাপত্তাকর্মীও অচেতন হয়ে পড়েন। পরে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বের করে আনেন।

প্রাথমিক তদন্তে জাহাজের ব্যালাস্ট এলাকায় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির কথা জানা গেছে। তবে ঠিক কীভাবে গ্যাস তৈরি বা ছড়িয়ে পড়ল এবং জাহাজ কাটার আগে প্রয়োজনীয় গ্যাস পরীক্ষা ও নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা।

জরুরি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন

দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকদের কয়েকজনের দাবি, আক্রান্তদের উদ্ধারের পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়নি। ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে খবর পাওয়ার পর তাদের দল ঘটনাস্থলে যায়। তবে দুর্ঘটনার সময় থেকে উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

তদন্তে দায় নির্ধারণের অপেক্ষা

দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তদন্তে জাহাজ কাটার আগে গ্যাস পরীক্ষা, ট্যাংক নিরাপদ ঘোষণা, শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং আগের সরকারি পরিদর্শনে শনাক্ত হওয়া ঘাটতিগুলো সংশোধন করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলী নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, কারখানায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম রয়েছে এবং শ্রমিকদের সেগুলো ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেই কাজে পাঠানো হয়।

তবে সরকারি পরিদর্শনে আগের নিরাপত্তা ঘাটতি, পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা এবং এর মধ্যেই বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনায় জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হবে—দুর্ঘটনাটি কেবল আকস্মিক ছিল, নাকি আগে শনাক্ত হওয়া কোনো নিরাপত্তা ঘাটতি যথাসময়ে সংশোধন না করার সঙ্গে এর যোগসূত্র ছিল।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত