, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 26° সে. | 💧 আদ্রতা 93%

সাগরতীরে বেরিয়ে এসেছে সাবমেরিন কেব্‌ল ঝুঁকিতে সন্দ্বীপের বিদ্যুৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরভাঙনে জাতীয় গ্রিড থেকে দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি সাবমেরিন পাওয়ার কেব্‌লের অংশবিশেষ মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে। ভাটার সময় প্রায় ৪০ ফুট কেব্‌ল দৃশ্যমান হলেও দীর্ঘদিন ধরে এর ঝুঁকি নিরূপণে কোনো পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সমীক্ষা হয়নি

প্রায় তিন মাস আগে প্রথম কেব্‌ল দুটির উন্মুক্ত অংশ নজরে আসে। এরপর বর্ষা ও জোয়ারের সময় তীরভাঙন অব্যাহত থাকলেও কেব্‌ল দুটির নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত প্রকৌশলগত মূল্যায়ন করা হয়নি। এতে কেব্‌লের দৃশ্যমান অংশের পাশাপাশি পানির নিচে থাকা অংশও ঝুঁকিতে আছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় কেব্‌ল দুটি উন্মুক্ত হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা স্থায়ীভাবে টেকেনি। জুলাইয়ের মাঝামাঝি প্রবল জোয়ারে আবারও তীরের মাটি সরে যাওয়ায় কেব্‌লের আরও কিছু অংশ দৃশ্যমান হয়।

দীর্ঘদিন উন্মুক্ত থাকলে যে ঝুঁকি

সাবমেরিন পাওয়ার কেব্‌ল সাধারণত সমুদ্র বা নদীর তলদেশে নির্দিষ্ট গভীরতায় মাটির নিচে স্থাপন করা হয়। তলদেশের মাটি সরে গিয়ে কেব্‌লের কোনো অংশ পানিতে ঝুলে পড়লে সেটিকে প্রকৌশলগতভাবে ‘ফ্রি স্প্যান’ বলা হয়।

এ অবস্থায় পানির স্রোত, ঢেউ ও জোয়ার-ভাটার প্রভাবে কেব্‌লে বারবার নড়াচড়া ও কম্পন সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘ সময় এ ধরনের যান্ত্রিক চাপ অব্যাহত থাকলে কেব্‌লের বিভিন্ন স্তরে ক্লান্তিজনিত ক্ষতি, বক্রতা বা স্থানীয় চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অস্বাভাবিক স্রোতের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

তবে কেব্‌ল দুটির বর্তমান অবস্থায় তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে কি না, সেটি কেবল দৃশ্যমান অংশ দেখে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এজন্য পুরো কেব্‌ল রুট, বিশেষ করে পানির নিচের অংশের গভীরতা ও তলদেশের বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা

২০১৭ সালে সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশ দিয়ে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে দ্বীপকে যুক্ত করতে দুটি সাবমেরিন পাওয়ার কেব্‌ল স্থাপন করা হয়। পরের বছর থেকে এর মাধ্যমে সন্দ্বীপে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দুটি কেব্‌লের মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে একটি কেব্‌লের মাধ্যমে প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কেব্‌ল দুটির পরিকল্পিত স্থায়িত্বকাল ৫০ বছর।

কোনো একটি কেব্‌ল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। আর দুটি কেব্‌লই বিকল হলে সন্দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে দ্বীপের আবাসিক গ্রাহক, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জরুরি সেবায়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞের অপেক্ষায় পিডিবি

কেব্‌ল স্থাপনকারী চীনা প্রতিষ্ঠান জিয়াংসু ঝোংথিয়েন টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেডের (জেডটিটি) বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সরেজমিন পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে তিন মাসেও ওই বিশেষজ্ঞ দল সন্দ্বীপে আসেনি।

পিডিবি জানিয়েছে, পরিদর্শনের আগে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে আর্থিক, আবাসন ও যাতায়াতসংক্রান্ত কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। এসব শর্ত পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

পিডিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং তীরভাঙন নিয়ন্ত্রণে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কেব্‌ল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানকেও পরিস্থিতি জানানো হয়েছে।

নয় বছর আগের সমীক্ষা কতটা কার্যকর?

কেব্‌ল স্থাপনের আগে সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশের ভূপ্রকৃতি, পানিপ্রবাহ, পলি পরিবহন, ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সমীক্ষা করেছিল ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)। সেই তথ্যের ভিত্তিতে কেব্‌ল স্থাপনের স্থান ও গভীরতা নির্ধারণে সহায়তা করা হয়েছিল।

কিন্তু কেব্‌ল উন্মুক্ত হওয়ার পর ওই এলাকায় ভূমিরূপ ও পানিপ্রবাহের পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে আইডব্লিউএমের কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। অথচ সন্দ্বীপ চ্যানেলের মতো সক্রিয় ভাঙনপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তলদেশের ভূপ্রকৃতি পরিবর্তিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এ কারণে কেব্‌ল দুটির বর্তমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু স্থলভাগের দৃশ্যমান অংশ নয়, পুরো সাবমেরিন রুটের পানির নিচের অবস্থাও পরীক্ষা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দ্রুত সিদ্ধান্তের দাবি

সন্দ্বীপের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোগটি দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় দ্রুত সমন্বিত কারিগরি পরিদর্শনের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কেব্‌লের বর্তমান অবস্থান, মাটির নিচে পোঁতার গভীরতা, ফ্রি স্প্যানের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ ভাঙনের সম্ভাব্য গতিপথ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ দৃশ্যমান কেব্‌লটি শুধু ভাঙনের একটি চিহ্ন নয়; এটি চ্যানেলের তলদেশে চলমান পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিতে পারে। তাই কেব্‌ল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ক্ষতির আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত