, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 28° সে. | 💧 আদ্রতা 87%

সেন্ট মার্টিনে কেয়াবন ধ্বংসের নেপথ্যে কারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক

টেকনাফের প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে রাতের আঁধারে কেয়াবনে আগুন দিয়ে গাছ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সৈকত থেকে সমুদ্রের দৃশ্য উন্মুক্ত করে হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটন স্থাপনার আকর্ষণ বাড়াতেই একটি প্রভাবশালী মহল কেয়াবন ধ্বংস করছে।

দ্বীপের পূর্বপাড়া, গলাচিপা, দক্ষিণপাড়া, কোনারপাড়া ও উত্তরপাড়ার বিভিন্ন এলাকায় কেয়াবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে। কোথাও আগুনে পুড়ে গাছের কঙ্কাল পড়ে আছে, আবার কোথাও দীর্ঘ এলাকার কেয়াবন সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, কেয়াবন শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়—এটি দ্বীপের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর শিকড় বালু আঁকড়ে ধরে বালিয়াড়িকে স্থিতিশীল রাখে এবং ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বড় ঢেউয়ের আঘাত কিছুটা প্রতিহত করে। ফলে কেয়াবন কমে গেলে সৈকত ক্ষয় ও বসতভিটায় জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কোটি টাকার প্রকল্প, তবুও থামছে না ধ্বংস

সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পরিবেশ অধিদপ্তর প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির আওতায় কেয়াবন সৃষ্টি, বনায়ন, সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার স্থান সংরক্ষণসহ পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের অংশ হিসেবে সৈকত ও বালিয়াড়িতে নতুন করে কেয়াগাছের চারা লাগানো হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে পুরোনো কেয়াবনের গাছ পুড়িয়ে বা কেটে ফেলার অভিযোগ ওঠায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কেয়াগাছ দ্বীপের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে কেয়াবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখন নতুন করে বন সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগে মামলা

সেন্ট মার্টিনে কেয়াগাছ কেটে রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরিবেশ অধিদপ্তর দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলার আসামিদের মধ্যে একজন রিসোর্ট মালিকও রয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে অবৈধ রিসোর্ট ও স্থাপনার বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর। এক অভিযানে নয়টি অবৈধ রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ এবং সৈকত দখল করে তৈরি ১০টি স্থাপনা উচ্ছেদের তথ্যও পাওয়া যায়।

আইন থাকলেও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন

১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করা হয়। পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপে কেয়াবন ধ্বংস, পরিবেশের ক্ষতি করে এমন স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। পরবর্তীতে দ্বীপসংলগ্ন সমুদ্রাঞ্চলও সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার আওতায় আনা হয়।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পর্যটন মৌসুমের বাইরে দ্বীপে নজরদারি তুলনামূলক কম থাকায় এ সময়েই অনেক অনিয়ম ঘটে। রাতের বেলায় কেয়াবনে আগুন দেওয়া বা গাছ কাটার অভিযোগও রয়েছে।

এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেন্ট মার্টিনের কেয়াবন উজাড় করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন—প্রাকৃতিক এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হলে দ্বীপের বালিয়াড়ি, বসতবাড়ি ও জীববৈচিত্র্য আরও ঝুঁকিতে পড়বে।

প্রশ্ন একটাই—কে রক্ষা করবে কেয়াবন?

একদিকে সরকারি অর্থায়নে নতুন করে কেয়াবন তৈরির উদ্যোগ, অন্যদিকে পুরোনো বন ধ্বংসের অভিযোগ—এই দুই বিপরীত চিত্র সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, শুধু নতুন চারা রোপণ করলেই হবে না; পুরোনো কেয়াবন ধ্বংস বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং রাতের বেলায় নজরদারি জোরদার করাও জরুরি।

সেন্ট মার্টিনের কেয়াবন তাই এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়—এটি দ্বীপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত