এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে ভুল, অসংগতি এবং কেন্দ্রভেদে ভুল প্রশ্ন বিতরণের একাধিক ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করার পর পরীক্ষার্থীদের ওই প্রশ্ন দুটির জন্য পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের প্রশ্ন নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।
শুধু প্রশ্ন তৈরির পর্যায়েই নয়, পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণেও ঘটেছে একাধিক ভুল। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে পুরোনো সিলেবাসের প্রশ্ন, আবার কোনো কেন্দ্রে প্রথম পত্রের পরিবর্তে বিতরণ করা হয়েছে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন।
ঘটনাগুলোর পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং তদন্ত কমিটি গঠনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নপত্রে ভুলের অভিযোগ
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় কয়েকটি বিষয়ের প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ত্রুটির বিষয়টি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। এ দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রশ্নপত্র পরিশোধনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের ইংরেজি ভার্সনের কয়েকটি বহুনির্বাচনী প্রশ্নে বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। রসায়ন এবং উচ্চতর গণিতের প্রশ্ন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, একটি প্রশ্ন জানা থাকা সত্ত্বেও প্রশ্নের অসংগতির কারণে অনেকে সেটির উত্তর দিতে পারেননি। ফলে তুলনামূলক কম প্রস্তুত থাকা অন্য প্রশ্ন বেছে নিতে হয়েছে তাঁদের।
বিতরণ ব্যবস্থাতেও গরমিল
প্রশ্নপত্র বিতরণে ভুলের ঘটনাও এবার আলোচনায় এসেছে।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে একটি কেন্দ্রে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা প্রথম পত্রের পরিবর্তে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন বিতরণ করা হয়েছিল। পরীক্ষার্থীরা বিষয়টি জানানোর পর ভুল প্রশ্নপত্র প্রত্যাহার করে অন্য কেন্দ্র থেকে সঠিক প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ঘটনায় দায়িত্বে থাকা তিনজনকে কেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
বগুড়ার শিবগঞ্জেও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের একটি অংশকে ভুলবশত পুরোনো সিলেবাসের প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে জামালপুরে। সেখানে শতাধিক নিয়মিত পরীক্ষার্থীর হাতে আগের বছরের সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি প্রশ্ন পৌঁছে যায়।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরেও চলতি বছরের পরিবর্তে আগের বছরের প্রশ্নপত্রে ১৪ জন পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কীভাবে তৈরি হয় এইচএসসির প্রশ্ন
পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের তালিকাভুক্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে প্রশ্ন প্রণয়নকারী নির্বাচন করা হয়। তাঁরা আলাদাভাবে একাধিক সেট প্রশ্ন তৈরি করে বোর্ডে জমা দেন।
এরপর নির্বাচিত মডারেটররা গোপনীয়তার সঙ্গে প্রশ্নগুলো যাচাই করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশ্ন সংশোধন, পরিবর্তন কিংবা নতুন প্রশ্ন সংযোজনের সুযোগ থাকে।
পরিশোধন শেষে প্রশ্নপত্রগুলো নিরাপদ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। পরীক্ষার দিন লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত সেট নির্বাচন করে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এরপর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিরাপত্তার মধ্যে প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ করা হয় এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে বিতরণ করা হয়।
তবে বর্তমান ব্যবস্থায় পরীক্ষার ঠিক আগে প্রশ্নপত্রের চূড়ান্ত মান যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত। ফলে মডারেশন পর্যায়ে কোনো ত্রুটি থেকে গেলে পরীক্ষা শুরুর আগে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ
এবারের ঘটনাগুলোর পর প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরিশোধন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।
নতুন ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র মডারেশনের আগে ও পরে আরও এক দফা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্ন যাচাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক ছাড়াও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ একজন শিক্ষককে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এ পরিবর্তন অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির সময় থেকেই কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশ্নপত্রে ভুল হলে পরীক্ষার্থীদের নম্বর সমন্বয় করে তাৎক্ষণিক ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। কিন্তু বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটলে শুধু ব্যক্তিকে দায়ী করে ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন তৈরি, মডারেশন, ছাপা, সংরক্ষণ এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে বিতরণ—প্রতিটি ধাপে আলাদা করে মাননিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ, একটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের একটি ভুলও একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল ও ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই এবারের ঘটনাগুলোর পর প্রশ্ন উঠেছে—
শুধু ভুল সংশোধন নয়, পুরো প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনাতেই কি প্রয়োজন বড় ধরনের সংস্কার?
নতুন মডারেশন পদ্ধতি ও বাড়তি যাচাই ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ইতি/
