চট্টগ্রাম নগরীতে তীব্র গ্যাস সংকটে জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে হতাশ চালকেরা। একই সংকটে গণপরিবহন কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরাও। কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির মধ্যেও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা যায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মিনিবাসকে। কর্ণফুলী প্রাকৃতিক গ্যাস লিমিটেডের আশপাশেও তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।
সিএনজি অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ মঞ্জুর জানান, ভোর ৬টার দিকে ফিলিং স্টেশনে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারেননি। তার ভাষ্য, গ্যাসের চাপ কম থাকায় কখনো পাম্প চালু হচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে দিনের বড় একটি সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা
নগরীর কোতোয়ালি, জিইসি মোড় ও মইজ্জ্যারটেকসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক চালককে দিনের উল্লেখযোগ্য সময় ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
স্টেশনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় থাকছে না। চাপ কিছুটা বাড়লে স্টেশন চালু করা সম্ভব হলেও তা কমে গেলে আবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
এর প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনেও। পর্যাপ্ত সিএনজি না পাওয়ায় অনেক যানবাহন রাস্তায় নামতে পারছে না। ফলে ব্যস্ত সড়ক ও মোড়গুলোতে গাড়ির অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের।
সংকটের সুযোগে বাড়তি ভাড়া
গণপরিবহনের সংকটকে কেন্দ্র করে কিছু চালকের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
এক যাত্রীর অভিযোগ, স্বাভাবিক সময়ে বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ যেতে যে ভাড়া প্রায় ১০০ থেকে ১২০ টাকা, সংকটের মধ্যে একই পথে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।
আরেক যাত্রী জানান, শিশু সঙ্গে থাকায় বাধ্য হয়ে সিএনজি নিতে হয়েছে। কিন্তু গাড়ি পাওয়া গেলেও চালকদের চাওয়া অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
অন্যদিকে চালকদের দাবি, গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে যে সময়ের মধ্যে একাধিক ট্রিপ দেওয়া সম্ভব, এখন সেই সময়ের বড় অংশই ফিলিং স্টেশনে চলে যাচ্ছে।
রান্নাঘরেও গ্যাস সংকট
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ নেই। নগরের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রান্না ব্যাহত হচ্ছে।
অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি খরচের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে রান্নার জ্বালানির ব্যয়।
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাও নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে। রড, স্টিল, পোশাক, জাহাজ ভাঙা ও অন্যান্য শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএসআরএমের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন সেনগুপ্ত জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় মাত্রায় গ্যাস পাচ্ছে না। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। রাউজান ও আনোয়ারা এলাকার কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের উৎপাদনও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় কারখানা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সংকট দীর্ঘ হলে সার সরবরাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংকটের পেছনে এলএনজি সরবরাহে বাধা
চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুলাই একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে মেরামতের মাধ্যমে গত ৬ আগস্ট সেটি আংশিকভাবে চালু করা হলেও সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি।
এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সমুদ্র পরিস্থিতি নতুন এলএনজি কার্গো খালাসে বাধা তৈরি করেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে।
আরপিজিসিএলের কর্মকর্তা মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন জানান, সাগর উত্তাল থাকায় এলএনজিবাহী জাহাজকে টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবহাওয়া অনুকূলে এলে দ্রুত কার্গো সংযোগের কাজ শেষ করার আশা রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম
কেজিডিসিএল সূত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। স্বাভাবিক সময়েও বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট। সাম্প্রতিক সংকটে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কেজিডিসিএল কর্মকর্তাদের মতে, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ না বাড়লে নগরীর গ্যাস সংকট দ্রুত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
কবে কাটবে সংকট?
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামের গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এলএনজি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রের আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়া এবং এলএনজি কার্গো খালাসের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু না হওয়া পর্যন্ত সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে আপাতত গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, গণপরিবহনের সংকট, বাড়তি ভাড়া এবং বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভোগ দ্রুত কমার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ইতি/
