বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে স্বস্তি ফিরছে না সাধারণ মানুষের জীবনে। সরকারি হিসাবে জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র বলছে, চাল ছাড়া অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও খরচ কমেনি
মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। বরং আগের বছরের তুলনায় দাম যে হারে বাড়ছে, সেই বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমূল্যে থাকা পণ্যগুলোর কারণে ক্রেতাদের ওপর ব্যয়ের চাপ এখনো রয়ে গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে চাল, তেল, ডিম, মুরগি, মাছ ও সবজিসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে সয়াবিন তেল, মুরগি, ডিম ও মাছের দাম বেড়েছে।
মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি
বাংলাদেশ পরসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ।
অর্থাৎ মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় তার চেয়ে কিছুটা দ্রুত বাড়ছে। টানা ৫৩ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকায় সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
এর ফলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙা, ধার করা কিংবা খাবার, পোশাক ও যাতায়াতের মতো খাতে ব্যয় কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
যেসব পণ্যে বেড়েছে দাম
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় আটার দাম বেড়েছে। খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। মসুর ডাল, মাছ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
গত বছরের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিমের দামও ডজনপ্রতি আগের চেয়ে বেশি। মাছের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রজাতির দামে কেজিতে কয়েক দশ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সবজির বাজারেও গত মাসে অস্বস্তি ছিল। অতিবৃষ্টি ও বন্যায় বিভিন্ন এলাকার সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ কমে কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে সরবরাহ বাড়ায় বেশ কিছু সবজির দাম আবার কমেছে।
বাজারের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাজার-অভিজ্ঞতার পার্থক্য রয়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতির হিসাব একটি সামগ্রিক গড়ের ভিত্তিতে করা হয়, যা প্রত্যেক পরিবারের বাস্তব ব্যয়ের চাপকে সমানভাবে প্রতিফলিত করে না।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই ব্যয় হয়। তাই এসব পণ্যের দাম বাড়লে তাঁদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে।
স্বস্তির জন্য প্রয়োজন আয় ও দামের ভারসাম্য
অর্থনীতির হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমা ইতিবাচক সংকেত হলেও সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত স্বস্তি আসবে তখনই, যখন পণ্যের দাম স্থিতিশীল হবে এবং আয় বৃদ্ধির হার মূল্যবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়, নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতি/
