চট্টগ্রাম মহানগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে নগরের বড় খালগুলোতে জলযান চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি, খালপাড়ে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে নগরকে আরও বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে নগরীর টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সম্মেলন কক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের কাছে পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রী।
শনিবার প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনেও জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা, খালপাড়ে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিয়মিত পর্যালোচনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, সমাধান হতে হবে সামগ্রিক
মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সম্পন্ন কাজের কার্যকারিতা পর্যালোচনার পাশাপাশি অসমাপ্ত কাজগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী প্রকল্পে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, একটি এলাকায় উন্নয়নকাজ চলার সময় অন্য এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরি হলে সামগ্রিক সুফল পাওয়া কঠিন। তাই বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।
খালপাড়ে হাঁটার পথ, সাইকেল ট্র্যাক ও জলযানের পরিকল্পনা
নগরবাসীর চলাচল ও বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে খালের দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান আমির খসরু। উপযুক্ত স্থানগুলোতে সাইকেল ট্র্যাক তৈরি এবং বড় খালগুলোতে জলযান চলাচলের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টিও চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি নগরবাসীর হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে খালকেন্দ্রিক উন্নয়নকে শুধু পানি নিষ্কাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নগরীর সৌন্দর্য ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলেন তিনি।
নগরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং বায়ুর মান উন্নয়নে খালপাড়সহ উপযুক্ত স্থানে বৃক্ষরোপণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।
প্রতি মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা
জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।
মন্ত্রী বলেন, প্রতি মাসে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে। এতে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি, অর্থের অপচয় ও বাস্তবায়নজনিত জটিলতা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রকল্পে বরাদ্দের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও প্রকল্প জমা পড়ার পর বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
রক্ষণাবেক্ষণেও জোর সংশ্লিষ্টদের
সভায় সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলো খনন এবং সংস্কারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, পাম্প ও স্লুইসগেট স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর পরিচালনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। সাম্প্রতিক বন্যার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি দুর্যোগের সময় মানুষের আশ্রয় ও নিরাপদ চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম স্লুইসগেট ও রেগুলেটর পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন। পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে সংযোগকারী ক্রস-খাল নির্মাণ এবং খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, এমন সেতুর নকশা বিবেচনার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
সভায় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য, সিডিএ, প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, ওয়াসা, বন্দর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি হাঁটা, সাইকেল চালানো, সবুজায়ন ও জলযান চলাচলের সুযোগ তৈরি করা গেলে নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প অনুমোদন, বাস্তবায়নের গতি এবং অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।
ইতি/
