নগরের নিউ মার্কেট, আমতলী ও পুরোনো রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়কে অস্থায়ী দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে পথচারীদের চলাচল ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও এসব এলাকায় ফুটপাতের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং হকারদের জন্য কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক এলাকায় ফুটপাতের ওপর দোকান, পণ্যের স্তূপ ও অস্থায়ী কাঠামো থাকলে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে পথচারীদের সড়কে নেমে চলাচল করতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং যানবাহনের চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
একাধিক অভিযানের পরও কেন ফিরছে দখল?
নিউ মার্কেট মোড় থেকে সদরঘাট রোড পর্যন্ত এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে গত ৬ জুন ২০২৬ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অভিযান চালায়। পরদিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ২০০টি দোকান উচ্ছেদের তথ্য জানানো হয়। এর কয়েক মাস পর, ৪ অক্টোবর নিউ মার্কেট থেকে কোতোয়ালি পর্যন্ত এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক থেকে হকার ও অবৈধ দোকান সরাতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (সিডিএ) অভিযান পরিচালনা করে। <escape>[সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও জাগো নিউজ২৪]</escape>
এসব অভিযান থেকে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের চিত্র পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। উচ্ছেদের পর একই স্থানে পুনরায় দোকান বসানো ঠেকাতে না পারলে অভিযানভিত্তিক উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
হকার পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন
ফুটপাত দখলের সমস্যার সঙ্গে হকারদের জীবিকার বিষয়টিও জড়িত। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিদিনের বিক্রির ওপর নির্ভর করে পরিবার পরিচালনা করেন। তাই উচ্ছেদের পাশাপাশি তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবসাস্থল, স্বচ্ছ বরাদ্দব্যবস্থা এবং পুনর্বাসনের কার্যকর পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
আমতলী এলাকায় হকারদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ২০০১ সালে সিডিএ হকার্স মার্কেট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে মার্কেটটির জমি ২০৪ জন হকারের নামে বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। তবে প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসন, বরাদ্দের ব্যবহার এবং ভবনের অনুমোদিত নকশা অনুসরণ নিয়ে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। <escape>[সূত্র: ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদন]
আমতলী মার্কেটের নিরাপত্তা ও নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ
আমতলী সিডিএ হকার্স মার্কেটের ভবনে পার্কিংয়ের নির্ধারিত জায়গায় দোকান নির্মাণ, নকশাবহির্ভূত সম্প্রসারণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে ভবনটির অনুমোদিত নকশা, বর্তমান কাঠামো, জরুরি বহির্গমনপথ এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
বাণিজ্যিক ভবনে প্রতিদিন বহু ক্রেতা, দোকানি ও কর্মচারীর উপস্থিতি থাকে। তাই সিঁড়ি, জরুরি নির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সিডিএ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট ভবন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
নিউ মার্কেট ও আমতলী এলাকার সমস্যা সমাধানে শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, বরং কয়েকটি বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্রকৃত হকারদের তালিকা যাচাই, বিকল্প ব্যবসাস্থলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, বরাদ্দসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা, নিয়মিত তদারকি এবং ফুটপাত দখল করে পুনরায় দোকান বসানোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
একই সঙ্গে পথচারীদের চলাচলের জায়গা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আইনসম্মত ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করাও জরুরি।
নগরের ফুটপাত মূলত মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য। তাই জনসাধারণের চলাচলের অধিকার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বাস্তবতা—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট ও আমতলী এলাকায় দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে ধারাবাহিক নজরদারি, স্বচ্ছ বরাদ্দব্যবস্থা, নিরাপদ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।
ইতি/
