চট্টগ্রামের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, চাল, আটা-ময়দা থেকে শুরু করে মাছ-মাংস ও বিভিন্ন মসলার দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ। বাজারে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান চললেও দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কিছু পণ্যের সরবরাহ ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে এসব কারণকে কাজে লাগিয়ে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজে বাড়তি চাপ
চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার প্রতি মণ (৩৭.৩২ কেজি) সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে দাম ছিল ৭ হাজার ৪০০ টাকা। পাম তেলের মণ বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৫৮০ টাকায়।
খুচরা বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত ২০৪ টাকার পরিবর্তে ২১০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নগরীর কয়েকটি দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। ভালো মানের পেঁয়াজ পাইকারিতে কেজিপ্রতি ৪৭ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা তিন দিন আগে ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। খুচরা বাজারে এ পেঁয়াজের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। তুলনামূলক নিম্নমানের পেঁয়াজ খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়।
চাল, আটা-ময়দার দামও ঊর্ধ্বমুখী
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চালের বাজারেও বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। চাক্তাই চালপট্টিতে ৫০ কেজির মোটা সিদ্ধ চালের বস্তার দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। মানভেদে এসব চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকায়।
মিনিকেট আতপ চালের ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। দিনাজপুরী পাইজাম চালের দাম ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকা। কাটারিভোগ চালের বস্তার দাম ছাড়িয়েছে ৩ হাজার ৯০০ টাকা।
আটা-ময়দার বাজারেও স্বস্তি নেই। প্যাকেটজাত আটা কেজিপ্রতি ৬৫ টাকা এবং খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগেও খোলা আটা পাওয়া যেত প্রায় ৪৫ টাকায়। খোলা ময়দার দাম কেজিপ্রতি ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৭০ থেকে ৭৫ টাকা।
আদা-রসুনের দামেও ঊর্ধ্বগতি
নগরীর কাঁচাবাজারে আমদানি করা আদা ও রসুনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চীনা আদার দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়ে ২০০ থেকে ২২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। চীনা রসুন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৮০ টাকায়। দেশি রসুনের দাম বেড়ে হয়েছে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৩০ টাকা।
মাছ-মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই
সাগরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মাছের বাজারে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বর্তমানে পাঙ্গাশ মাছ কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, মাঝারি ও বড় তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা, চাষের রুই ৩৮০ থেকে ৫০০ টাকা এবং কাতল ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাংসের বাজারেও দাম চড়া। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা, তবু চড়া দাম
কিছু সবজির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও অধিকাংশ পণ্যের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। প্রতি কেজি শিম ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১৪০ টাকা, শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বরবটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৮০ টাকা এবং পটোল ও ঢ্যাঁড়স কেজিপ্রতি ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। চিচিঙ্গা, ঝিঙা ও কচুমুখির দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।
অভিযান চললেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের দাবি
বাজার তদারকিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, অনিয়ম ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং দায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হচ্ছে। তবে বাজারে স্থায়ী স্বস্তি ফেরাতে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান পর্যবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও অতিরিক্ত দাম আদায় ও অন্যান্য অনিয়ম প্রতিরোধে বাজার তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে। ক্রেতাদের পণ্য কেনার আগে মূল্যতালিকা ও মোড়কে উল্লেখিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য যাচাই এবং কেনাকাটার রসিদ সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে শুধু অভিযান নয়, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।
ইতি/
