শেখ হাসিনার রাজনীতির দূরদর্শিতার দুর্বলতা, সরকার পতন ও ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশত্যাগ

মো. কামাল উদ্দিন।

 

বিশ্ব বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক স্যার উইনস্টন লিওনার্ড স্পেন্সার চার্চিল এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে.ভালো রাজনীতিবিদের যোগ্যতা কি হওয়া উচিৎ? চার্চিল বলেছিলেন, বিশেষ কিছু নয়।শুধু তাঁকে দূরদর্শী হতে হবে, সে যেন ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেটা ঠিক ভাবে বলতে পারে।আর যখন সেই ভবিষ্যতবাণী মিলবে না, তখন যেন ব্যাখ্যা দিতে পারে, কেন মিলল না। দূরদর্শিতা সম্পুর্ন রাজনৈতিক ছিলেন শেখ হাসিনা নিজেই এবং তাঁর সাথে যাঁরা সবাই। রাজনীতিতে দূরদর্শিতা খুবই বেশি প্রয়োজন- অন্য দিকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছিলেন একজন মানসিক প্রতিবন্ধি নেতা, তার মধ্যে কোন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিলো না। ওবায়দুল কাদের ছিলেন একজন মোসাহেব- সব কিছু হ্যা বলতেন, এই কথা বলতে গিয়ে একটা মোসাহেব কাহিনি মনে পড়ে গেল, পাঠকদের জন্য কাহিনিটি তুলে ধরছি–তোষামোদের কথায় মহামহিম গোপাল ভাঁড় মহোদয়ের সেই বিখ্যাত গল্পটি স্মরণীয়। রাজা তাঁর পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তাঁর মোসাহেব সবটাতেই রাজাকে তাল দিয়ে যাচ্ছেন।ব্যাপারটা প্রায় দৃষ্টিকটু (অথবা শ্রুতিকটু) পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আলোচনার বিষয় হল তরকারি। কথায় কথায় পটলের কথা উঠল। রাজা বললেন, পটল খুব ভাল তরকারি। মোসাহেব সায় দিলেন ‘ভাল মানে? খুব ভাল।ভাজা খান,সিদ্ধ খান,মাছে খান,নিরামিষ খান,সরষে বাটা খান,পটলের মতো তরকারি নেই, হুজুর। রাজা বললেন, পটল কিন্তু বঠ তিতো। মোসাহেব ঘাড় কাত করে সায় দিলেন,খুব তিতো, অতি বিদঘুটে। রাজা বললেন, পটল মোটেই ভাল নয়। ভাল করে হজম হয়না। মোসাহেব বললেন,পটল মোটেই ভাল নয়।হজম করা কঠিন। হাতি পর্যন্ত পটলের বিচি হজম করতে পারে না। পটল সাংঘাতিক জিনিস হুজুর। রাজা তখন আর থাকতে পারলো না। মোসাহেবকে বললেন, তোমার কথা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি কখনও বলছে পটল খুব ভাল, কখনও বলছ পটল খুব খারাপ। মোসাহেব হাত কচলিয়ে বললেন আজ্ঞে হুজুর তা বলছি।রাজা বললেন, তা হলে তোমার আসল কথাটা কী? মোসাহেব আরও হাত কচলিয়ে বললেন, আজ্ঞে হুজুর, আমার কথাটা হল আমি তো পটলের গোলামী করি না,আমি আপনার গোলাম, আপনার গোলাম,আপনি যা বলছেন আমি তাই বলেছি। স্বীকার করা উচিত এই মোসাহেবটি খুব উচ্চস্তরের নয়। স্তাবকতা খুব সূক্ষ্ম ব্যাপার সেটা প্রকট হয়ে গেলে, মোসাহেবি ধরা পড়ে গেলে চলবে না।তাতে সাহেব এবং মোসাহেব দু,জনেরই বেকায়দা।

ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনা একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ নানা পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছে, তবে তার রাজনীতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা এবং কিছু সময়ের জন্য ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া ও দেশত্যাগের ঘটনা আলোচনা করা প্রয়োজন।

শেখ হাসিনার রাজনীতির দর্শন শেখ হাসিনার রাজনীতির দর্শনকে কয়েকটি প্রধান দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:

প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন: শেখ হাসিনার সরকার উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে। বড় প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদ তার নেতৃত্বে জাতীয়তা ও স্বাধীনতার গুরুত্বকে তুলে ধরা হয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অব্যাহত রেখে দেশের জাতীয় ঐক্য এবং স্বাধিকার রক্ষার প্রচেষ্টা চলছে।

অর্থনৈতিক মুক্তি: শেখ হাসিনা বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছেন। গ্রামীণ উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও রপ্তানি বাণিজ্যকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন।দুর্বলতা ও সমালোচনা শেখ হাসিনার রাজনীতির কিছু দুর্বলতা, সমালোচনাও রয়েছে:

বিচারিক স্বাধীনতা: শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত না হওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ উঠেছে।

গণতান্ত্রিক অনুশীলন: তার সরকারকে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সমস্যা: সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যা প্রশাসনিক কার্যক্ষমতা ও স্বচ্ছতা কমিয়েছে।

সরকার পতন ও ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশত্যাগ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে কিছু সময়ের জন্য সরকার পতন এবং দেশত্যাগের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পরে, তার সরকার কিছু সময়ে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল:

১৯৯৬ সালের নির্বাচন: শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। তবে পরবর্তীতে বিরোধী দলের চাপের মুখে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়।

২০০১ সালের নির্বাচন: নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান এবং বিরোধী নেত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক অবস্থান কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতার কারণে তিনি কিছু সময়ের জন্য রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে দূরে চলে যান।

দেশত্যাগ: ২০০১ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা দেশের পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার কারণে কিছু সময়ের জন্য বিদেশে চলে যান। তার এই পদক্ষেপটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদিও এটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

উপসংহার শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্বের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায় যে, তার সরকার উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। তবে, প্রশাসনিক দুর্বলতা, গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অভাব, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সরকার পতন ও ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনা তার রাজনৈতিক জীবনের অংশ, যা রাজনৈতিক কৌশল ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সংস্কার গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব।

রাজনীতি ও তোষামোদ: একটি বিশ্লেষণ ভূমিকা রাজনীতি একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি কার্যকরী রাজনৈতিক সিস্টেম রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবে যখন রাজনীতিতে ব্যর্থতা এবং তোষামোদ প্রবণতা বিস্তার লাভ করে, তখন তা জাতির উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এই লেখায়, আমরা ব্যর্থ রাজনীতি এবং তোষামোদ সম্পর্কিত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করব এবং এর প্রভাবগুলি আলোচনা করব। ব্যর্থ রাজনীতির সংজ্ঞা ব্যর্থ রাজনীতি বলতে বোঝায় এমন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা কর্মসূচি, যা তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করে না, বা সামাজিক উন্নয়নকে সহায়তা করে না। এর সাধারণ কারণগুলি অন্তর্ভুক্ত করতে পারে:

নেতৃত্বের অদক্ষতা: নেতাদের অযোগ্যতা বা দক্ষতার অভাব, যা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর নীতি প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা: পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে দুর্বলতা, যেমন দুর্নীতি, অপব্যয়, এবং অদক্ষ পরিচালনা।

স্বচ্ছতার অভাব: সরকারী কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব।

তোষামোদ: একটি সাংস্কৃতিক সমস্যা তোষামোদ হল এমন একটি সামাজিক প্রবণতা যেখানে এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যের প্রশংসা করে, তার জন্য অনুগত থাকে বা স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে প্রশংসা ও আদর পেতে চেষ্টা করে। তোষামোদ মূলত নিম্নলিখিত প্রভাব সৃষ্টি করে:

গুণগত নেতৃত্বের অভাব: যখন রাজনৈতিক নেতারা তাদের নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন না হয়ে, তোষামোদকারী ও লবিস্টদের দ্বারা নির্বাচিত হন, তখন গুণগত নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়।

প্রথম অবস্থান অর্জন: তোষামোদকারী রাজনীতিবিদদের প্রভাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতাহীন ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়, যা সরকারী কার্যক্রমের গুণগত মান কমিয়ে দেয়।

অনৈতিকতা ও দুর্নীতি: তোষামোদ রাজনৈতিক দুর্নীতির ক্ষেত্রকে উন্মুক্ত করে দেয়। যখন ক্ষমতার লোভী ব্যক্তিরা তোষামোদকারীদের সাথে একটি অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তখন দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। ব্যর্থ রাজনীতির প্রভাব ব্যর্থ রাজনীতির কিছু সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে যা একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে:

অর্থনৈতিক অস্থিরতা: ব্যর্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে অর্থনৈতিক নীতিগুলোর ভুল বাস্তবায়ন দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।সামাজিক অস্থিরতা: জনগণের আস্থাহীনতা এবং অসন্তোষ সমাজে বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতার সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতি: রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের মর্যাদা কমে যায় এবং বৈদেশিক সম্পর্কের মানহানি ঘটে।

প্রতিকার এবং সমাধান ব্যর্থ রাজনীতি ও তোষামোদ মোকাবেলার জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে:

শিক্ষিত ও যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন: নির্বাচনী প্রক্রিয়া সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ হতে হবে, যেখানে যোগ্যতা ভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ: দুর্নীতি ও তোষামোদকে প্রশমিত করার জন্য শক্তিশালী আইন ও কার্যকরী মনিটরিং সিস্টেম প্রয়োজন।

জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি: জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং কার্যকরী নাগরিক দায়িত্ববোধ উন্নীত করা প্রয়োজন।উপসংহার ব্যর্থ রাজনীতি ও তোষামোদ দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। একটি দেশ যদি সফলভাবে উন্নয়ন করতে চায়, তবে তাকে দক্ষ নেতৃত্ব, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সুশাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। শুধুমাত্র এইভাবে দেশের সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করা সম্ভব হবে।

আমাদের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা মোসাহেব ওবায়দুল কাদের, হাসান মাহমুদসহ তাদের তোষামোদের কাছে হার মেনেছে, তাদের মিথ্যা বুলি বিশ্বাস করতে করতে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের গালি শুনেছেন, সামান্য কোটা বাতিল আন্দোলনে উস্কানিমূলক নীতিনির্ধারনীদের ভুমিকার কারণে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করতে হলো, কতবড় দুঃখ ও লজ্জা জনক বিষয়, কেন দেশ ত্যাগ করেছে তা একদিন হয়তো ইতিহাস কথা বলবে। যে গণভবনে শেখ হাসিনা দীর্ঘ বছর অতিবাহিত করছে সেই গণভবন থেকে নিরাপত্তা হীনতার দোহাই দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও কিন্ত এই গণভবনে সম্মান রক্ষা করতে প্রশাসন সম্পুর্ন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব- চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।

[recent_tabs]