
চোখের পলকে দেখতে দেখতে নয়বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। আমাদের প্রাণপ্রিয় মানুষ চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের পুরোধা বীরমুক্তিযোদ্ধা বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চট্টলবন্ধু আলহাজ্ব এস এম জামাল উদ্দিনের ১৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৮ জুলাই। এই মহান মানুষটির কথা আমরা ভুলতে পারছি না, ভুলার কথাও নয়। মরহুম এস.এম জামান উদ্দিন ছিলেন হাটহাজারী মাদার্শা গ্রামের প্রথম মুসলিম ডিগ্রি পাশ ব্যক্তি হেদায়েত আলী মাস্টারের ২য় ছেলে। জামাল উদ্দিন সাহেব জন্মের আগেই বাবা হেদায়েত আলী মাস্টার মৃত্যুবরন করেন। হেদায়েত আলী মাস্টার ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের মুসলিম হাই স্কুলের শিক্ষক। জন্মের পর থেকে এস এম জামাল উদ্দিনের জীবন-যুদ্ধ শুরু হয়। স্কুলে অধ্যায়ন কালীন রাজনীতির সাথে জড়িত হন। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের বিভাগীয় শ্রম সম্পাদক ছিলেন। তখন সভাপতি ছিলেন এম এ হান্নান ( যিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে) এস এম জামাল উদ্দিন স্বাধীনতা যুদ্ধে- মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন এবং জীবন বাজি রেখে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শ্রমিক সংগঠনকে পুরো দেশে সংগঠিত করেন। বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করেন তখন তিনি বাকশালের চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে সোচ্ছার ছিলেন। বর্ষিয়ান নেতা আবদুর রাজ্জাক বাকশাল পুনর্গঠন করলে এস এম জামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, তিনি ৭৯ সালে জিয়াউর রহমান সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে হাটহাজারী আসন থেকে নির্বাচন করেন, তখন এস এম জামাল উদ্দিনের প্রতিদ্বন্দী ছিলেন বর্তমান পরিবেশ মন্ত্রী ব্যারিস্টার জনাব আনিসুল ইসলাম মাহামুদ চৌধুরী। এস এম জামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন। এস এম জামাল উদ্দিন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করতেন। ১৫ আগস্ট জাতীয় ভাবে তখন শোক দিবস পালিত না হলেও এস এম জামাল উদ্দিন বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত শোক দিবস পালন করতেন। এস এম জামাল উদ্দিন এর সামাজিক ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ইতিহাস এ লেখায় পুরো তুলে ধরা সম্ভব নয়। এস এম জামাল উদ্দিন সাংসারিকভাবে খুবই উদাসীন ছিলেন। পুরো পরিবারকে রাজনৈতিক ও উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির কর্মকান্ডের ব্যবহার করতেন। উনি বিয়ে করেছিলেন চট্টগ্রাম মুনসুরাবাদের জমিদার খান বাহাদুর আব্দুল হাকিম মিয়ার ছেলে শফি মিয়ার কন্যাকে। এস এম জামাল উদ্দিনের দু’ছেলে, দু’মেয়ে বড় মেয়ে ডাক্তার। যখনই চট্টগ্রামের উন্নয়নের কথা আসে তখনই এস এম জামাল উদ্দিন নামটি চলে আসে। জামাল ভাইয়ের জন্য আমরা বেশি কিছু করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। আমরা প্রথমে স্মরণ সভা, পরে নাগরিক শোকসভা ও ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে সেমিনার। কিন্তু একটি স্মারক গ্রন্থ এখনও প্রকাশ করতে পারি নাই। উনার সুযোগ্য সন্তান এস এম ফরহাদ আলী ও আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছুুদিনের মধ্যে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করতে যাচ্ছি। সর্বশেষ ২৫ শে জুন ২০১১ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সম্মেলন এস এম জামাল উদ্দিন বিহীন দীর্ঘ ১১ বছর পর মুসলিম হলে সম্পন্ন করেছিলাম। জামাল ভাই থাকলে খুবই খুশি হতেন ওই দিনের উপস্থিতি দেখে। তাঁর হাতে গড়া সংগঠন আজ নতুন নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে তাঁরই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে আন্দোলন কর্মসূচীর মাধ্যমে। আজ আমাদের সংগ্রাম কমিটির অনেক দাবি বাস্তবায়নের পথে। জামাল উদ্দিন সাহেব এটা দেখলে আরো খুশি হতেন। চট্টগ্রাম থেকে কক্রবাজার পর্যন্ত রেললাইন চালু করণ, শহরে ফ্লাই ওভার নির্মাণ এবং কর্ণফুলী নদীতে টানেল ও মহেশখালী সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত, ভারতের সাথে বন্দরের ট্রানজিট চুক্তিসহ বহু মৌলিক দাবি বাস্তবায়ন হওয়ার পথে। আরো অনেক দাবি জামাল ভাইয়ের আদর্শ অনুসরণ করে আদায় করে নিতে হবে। জামাল ভাই এর স্থানে আমরা দক্ষ, আদর্শবান ও চট্টগ্রামপ্রেমী স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরীকে চেয়ারম্যান হিসেবে পেয়েছিলাম তিনিও গত বছর চীর বিদায় নিয়েছেন। তাঁর স্থানে বর্তমানে ডা: শেখ শফিউল আজম সাহেব চেয়ারম্যান হিসেবে দায়ীত্ব পালন করছেন। উনার যোগ্য নেতৃত্বে আমরা আপনার প্রিয় সংগঠনকে ধরে রাখার চেষ্টা করব। অবহেলিত চট্টগ্রামের উন্নয়ন করতে সরকারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে অবগত করব। আজ অশ্রুঝরা চোখ, বুকভরা ব্যথা নিয়ে আমার প্রাণপ্রিয় মানুষ চট্টলবন্ধু এস এম জামাল উদ্দিনের কথা লিখতে বসলাম। এস এম জামাল উদ্দিন আমার বড় ভাইয়ের মত ছিলেন। চট্টগ্রামের উন্নয়নের আন্দোলন করতে এসে ৮৮ সালে এস এম জামাল উদ্দিনের সান্নিধ্যে আসি। এই চট্টগ্রামপ্রেমী মানুষটির নির্দেশে ও পরামর্শে আমি পথ চলতাম। তাঁর নির্দেশে পৃথক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার দাবিতে ৯৪ সালের ৯ জুলাই চট্টগ্রামে আমি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে হরতাল ঘোষণা করেছিলাম। তাঁর সাথে শত শত আন্দোলনের কর্মসূচী পালন করেছি। এই সময় অনেকেই সংগ্রাম কমিটিকে ‘জামাল উদ্দিন-কামাল উদ্দিন’ কমিটি নামে উল্লেখ করতেন। যে মানুষের মনে প্রাণে রক্তে চট্টগ্রাম জড়িত ছিলো, সেই মানুষটি আমাদেরকে ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন। যেখান থেকে পুনর্বার ফিরে আসা যাবে না। মানুষটি দীর্ঘ জীবন অবহেলিত চট্টগ্রামের উন্নয়নের কথা বলেছিলেন, তিনি চট্টগ্রামের উন্নয়নের ব্যাপারে কোন আপোষ করতেন না। তাঁর কোন ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া ছিল না, একমাত্র চট্টগ্রামের উন্নয়ন ব্যতীত। যে মানুষ ক্ষমতার লোভ করতেন না, সেই মানুষ আজ আর নেই। তাঁর লাশ সামনে রেখে আমি কলম ধরেছিলাম সেই সময় বিবেকের মাধ্যমে কিছু জিজ্ঞাসা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম জামাল ভাই আপনি চলে যাচ্ছেন? চলে যান আমার কোন আপত্তি নেই, আপত্তি করার ক্ষমতাও নেই। কারণ সব নিয়তির খেলা। কিন্তু আপনার অবহেলিত চট্টগ্রামের উন্নয়ন কে করবে? আপনার অগ্নিদগ্ধ চট্টগ্রামের বুকে এখনও বৈষম্যের আগুন জ্বলছে। প্রাচ্যের রাণী খ্যাত সেই সুন্দরী চট্টগ্রামের সৌন্দর্য ফিরে আনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আপনি রাজপথে নেমেছিলেন। সেই প্রাচ্যের রাণীর সৌন্দর্য ফিরে পাওয়ার আগেই আপনি চলে যাচ্ছেন। আপনার দাবিকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী পরিপূর্ণতা পাওয়ার সম্ভাবনা না দেখে আপনি অভিমান করে কি চলে যাচ্ছেন? কে বলবে চট্টগ্রামের নির্যাতিত নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষের কথা। কে বলবে বিদ্যুতের সমস্যা, গ্যাস ও পানির সমস্যার কথা। জামাল ভাই, আপনি কি জানেন চট্টগ্রামের মাটি থেকে আরেকটি এস এম জামাল উদ্দিন জন্ম নেবে? আমি বিশ্বাস করি না। জামাল উদ্দিন আর জন্ম নেবে না। জামাল উদ্দিন একজনই। আপনি তো বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। পৃথিবী তথা পুরো বাংলাদেশে যেমন আরেক জন বঙ্গ বন্ধু জন্ম নেবে না তেমনি চট্টলবন্ধু জামাল উদ্দিনও দ্বিতীয়বার জন্ম নেবে না। আপনি কেন অভিমান করে চট্টগ্রামবাসীকে সাগরে ভেসে দিয়ে চলে যাচ্ছেন? আপনি ব্যতীত চট্টগ্রামবাসীর অধিকারের কথা নি:শর্তভাবে বলবে কে ? আপনি তো জানেন চট্টগ্রামের উন্নয়নের কথা যারাই বলুক না কেন সবাই ক্ষমতার স্বপ্ন দেখতেন। এস এম জামাল উদ্দিন একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় বিশ্বজনীন মুক্তবাজার অর্থনীতির আবহে জাতীয় অর্থনীতিকে সবল ও দৃঢ়করণের লক্ষ্যে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নের আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে ভেবে ১৯৮৮ সালের ১৬ আগস্ট সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠান হতে দলমত নির্বিশেষে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটিকে সকল প্রকার বৈরিতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও হরতাল-অবরোধ ইত্যাদি নানান কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে ১৫ দফা, পরবর্তীতে ২১ দফা দাবিতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নের আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। এরই ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্লোগান রাজনৈতিক স্লোগান রূপান্তরিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির ২১ দফা কর্মসূচী ভিত্তিক আন্দোলনের ন্যায্যতা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যতটুকু অর্জিত হয়েছে তার সাফল্য বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির প্রাণপুরুষ এস এম জামাল উদ্দিনের একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকবেলায় এর কোন বিকল্প নেই বিবেচনায় এনে সেই প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির দাবিকৃত ২১ দফার যা অর্জিত হয়নি তা আদায়ের লড়াই – সংগ্রাম পরিচালনার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের দাবি ৭ দফাকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মসূচী নিয়েছিলেন। এস এম জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে অনেকে ছিলেন সক্রিয় নেতা। আমরা তাঁদের মধ্যে অনেককেই হারিয়েছি। অসংখ্য আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রসৈনিকদের ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিদায় দিতে হয়েছিল। এখন চট্টগ্রাম নগরী জলনগরীতে পরিণত হয়েছে। পুরো শহর পানিতে ভাসমান থাকে। কিন্তু এই জলাবদ্ধতার জন্য কেউ বাদ প্রতিবাদ করে নাই এবং এই দায়ভার কেউ নেন নাই। এই সময় আপনার খুব প্রয়োজন ছিলো। আমাদের চট্টগ্রামবাসির দুঃখ ও লজ্জা হয় আমরা এস এম জামাল উদ্দিনের নামে চট্টগ্রাম মহানগরে একটি সড়কের নামকরণের দাবী করেছিলাম। তৎসময়ের মেয়র এবি মহিউদ্দিন চৌধুরী এস এম জামাল উদ্দিনের নামে সড়কের নামকরণের কথা দিয়ে থাকলেও অদ্যবদি বাস্তবায়ন হয় নাই।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি ও মহাসচিব- চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম

