Tuesday, June 23, 2026

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে বৈষম্যের অবসান – মো. কামাল উদ্দিন। 

সাংবাদিকতার মহান পেশা: অধিকার ও নৈতিকতা**

 

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা, যা সমাজের অন্তর্নিহিত সত্যগুলো উন্মোচন করে। এই পেশার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের কাছে সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য পৌঁছে দেওয়া। একটি মুক্ত সমাজের ভিত্তি হলো একটি স্বচ্ছ ও সাহসী সাংবাদিকতা, যা জনগণের অধিকার ও সঠিক তথ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করে তবে, সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত করা একটি গুরুতর বিষয়। একদিকে, সাংবাদিকদের জন্য যে বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্ব বিদ্যমান তা অনস্বীকার্য। অন্যদিকে, এই মহান পেশার সঠিক প্রতিনিধিত্বের জন্য স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা অপরিহার্য।

 

সাংবাদিকতার অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য সঠিক সম্মান এবং সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। আমরা যদি এই পেশার মৌলিক নীতিগুলো মেনে চলি এবং সকল প্রকার দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বকে দূর করি, তবে সাংবাদিকতা তার সত্যিকার মহান উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে।

 

সাংবাদিকতার পেশাকে সম্মান জানিয়ে এবং সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে আমরা একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল সমাজ গঠন করতে পারি। সাংবাদিকতায় বৈষম্য এবং সদস্যপদ সংক্রান্ত দুর্ভোগ

সাংবাদিকতা একটি সম্মানজনক পেশা, যা সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরতে সাহায্য করে। তবে, অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতার অভ্যন্তরীণ বৈষম্য এবং পক্ষপাতিত্বের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা ন্যায্য সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিতে বৈষম্য একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক মেধাবী সাংবাদিক ক্লাবের সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর বিপরীতে, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দালাল বা তথাকথিত সাংবাদিক নিজের অযোগ্যতার পরও ক্লাবের সদস্য হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে সক্ষম হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক এবং আপত্তিকর।

বৈষম্যের পেছনে কারণ ও তার প্রভাব,

দলীয় পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতি: কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থে ক্লাবের সদস্যপদ প্রদানে পক্ষপাতিত্ব করে থাকেন। এরা নিজেদের সুবিধার জন্য অযোগ্য ব্যক্তিদের সদস্য হিসেবে ভুক্তভোগী করে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের বাইরে রেখে দেয়। দালালি ও ঘুষের প্রভাব: কিছু তথাকথিত সাংবাদিক বা দালাল ক্লাবের সদস্যপদ লাভের জন্য ঘুষ প্রদান করে অথবা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। এতে করে প্রকৃত সাংবাদিকরা অসুবিধার সম্মুখীন হন এবং ক্লাবের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না।

ভুয়া সাংবাদিকদের প্রভাব: নামসর্বস্ব বা ভুয়া সাংবাদিকরা নিজেদেরকে প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করে, যা ক্লাবের স্বচ্ছতা ও সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।

প্রকৃত সাংবাদিকদের অধিকার ও পদক্ষেপ প্রকৃত সাংবাদিকরা যারা ক্লাবের সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন, তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য দূর করতে এবং সদস্যপদ প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেয়া উচিত:স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া: ক্লাবের সদস্যপদ প্রদান প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং নিয়মিত হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে কেবলমাত্র যোগ্য সাংবাদিকরা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন।

বিষয়টি উত্থাপন করা: বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা উচিত। প্রয়োজনে, সংশ্লিষ্ট পেশাদারী সংগঠন বা মিডিয়া কমিশনের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।

দালালি ও দুর্নীতি মোকাবিলা: ক্লাবের অভ্যন্তরে দালালদের কার্যকলাপ বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই কাজের জন্য একটি স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

এথিক্যাল জার্নালিজম প্রচার: সাংবাদিকতার আদর্শ ও নৈতিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য ক্লাবের সদস্যপদ প্রদান একটি নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।

এই সমস্যা গুলোর সমাধান হলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবসহ অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনে প্রকৃত সাংবাদিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে এবং সাংবাদিকতা আরও প্রফেশনাল ও সঠিকভাবে পরিচালিত হবে।

বৈষম্যের অবসান নিয়ে আন্দোলন চলছে রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সর্বস্তরে। এরই ধারাবাহিকতায়, দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অবসান ঘটানোর পথে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব। এই ক্লাবটি ৬২ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সাংবাদিকদের বিনোদন, অবকাশকালীন সময় কাটানোর এবং তথ্য বিনিময়ের জন্য। কিন্তু যেভাবে ক্লাবটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। দিন দিন বৈষম্য বেড়ে গেছে এবং একটি শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট ক্লাবটিকে কব্জা করে রেখেছে।

 

শত শত মেধাবী সাংবাদিক ক্লাবের সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ক্লাবের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজেদের সেচ্ছায় এবং আত্মঅহংকারের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকদের সদস্য হতে না দিয়ে, ক্লাবের প্রবেশেও বাধা দিয়েছেন। এর ফলে অসংখ্য সাংবাদিক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। তথাকথিত সাংবাদিক নেতারা ক্লাবকে তাদের জমিদার বাড়ি বানিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া, দালালী, চাঁদাবাজি এবং জীবন সদস্য হওয়ার নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

 

এই নেতাদের বিরুদ্ধে কেউ যেন প্রতিবাদ না করতে পারে, এজন্য তারা তাদের নিজস্ব কিছু কর্মী নিয়োগ করেছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই এখন সাংবাদিকতা পেশায় নেই। ক্লাবের খাতায় নাম থাকা এসব নামসর্বস্ব সাংবাদিকেরা প্রকৃত সাংবাদিকদের ভুয়া আখ্যা দিয়ে তাদের বঞ্চিত করেছে।

 

কিন্তু এখন প্রকৃত সাংবাদিকরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করার পর, এই ক্লাবের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য বড় ধরনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। ৬ আগস্ট, ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি বৈধ অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিনিয়র সাংবাদিক মঈন কাদের শওকত এবং সদস্য সচিব হিসেবে মনোনীত হয়েছেন দিগন্ত টেলিভিশনের ব্যুারো প্রধান গোলাম মাওলা মুরাদ।

 

এই কমিটির বৈধতা নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে। সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীলরা এই সংকট নিরসনের জন্য এগিয়ে এসেছেন। তবে তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকরা ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ করে দালাল নির্মূল এবং অপকর্ম বন্ধ করে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।

 

বিস্তারিত লিখব।

 

— লেখক: সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক

  • সর্বশেষ
  • পঠিত