, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 31° সে. | 💧 আদ্রতা 69%

চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নেপথ্যে ‘বড় ভাই’

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমছে না। হত্যা, সংঘর্ষ, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে একের পর এক সদস্য গ্রেপ্তার হলেও তাদের পেছনে থাকা কথিত ‘বড় ভাই’ বা পৃষ্ঠপোষকদের অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় নগরের অন্তত ১৬টি কিশোর গ্যাংয়ের নাম সামনে এসেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, এসব গ্রুপে সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত। নগরের বিভিন্ন এলাকায় আলাদা নামে এসব গ্রুপের কার্যক্রম চালানোর তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

গত ১ অক্টোবর রাতে খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধের জেরে মো. হৃদয় (১৬) নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর আগে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে তার বিরোধ হয়েছিল। পরে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন বিজয়, কামরান ও শান্ত। অপরদিকে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের নেতৃত্বে ওয়াকিল হোসেন বগা। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই পক্ষের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম জানান, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

নগরের অন্যান্য এলাকাতেও একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জামালখান ও গনি বেকারি এলাকায় ‘ডেঞ্জার’, মুরাদপুরে ‘এমবিএস’ বা ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট’, পাঁচলাইশে ‘কেবি’, ‘এনএস’, ‘এক্সমার্ক’, ‘ট্রিপল নাইন’ ও ‘ডট’, হালিশহরে ‘বিচ্ছু’ ও ‘পাইথন’ এবং চকবাজারে ‘ফোর জিরো সেভেন’ নামে কয়েকটি গ্রুপের তৎপরতা রয়েছে। আমবাগান, ডেবারপাড়, বাকলিয়া ও বায়েজিদ এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতির তথ্য জানিয়েছে পুলিশ

গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ রোডে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুরাদ ও জসিম বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি গুলির ঘটনাও ঘটে। পরে পুলিশ মুরাদ ও জসিমসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রের দাবি, সংঘর্ষে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও অংশ নেয়।

পুলিশের আগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল। প্রতিটি গ্রুপে সদস্যসংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত। এসব গ্যাংকে প্রায় ৭০ জন ‘বড় ভাই’ পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য ছিল। ২০২৪ সালের পর নগরের কিশোর গ্যাংয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আর হালনাগাদ হয়নি।

কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর খুলশীতে কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিল হোসেনকে গ্রেপ্তারের অভিযানে ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। এর আগে ২৫ জুলাই আমবাগান এলাকায় মাদক কারবারি আলমগীরকে গ্রেপ্তারে অভিযানে গিয়ে দুই উপপরিদর্শকসহ (এসআই) সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।

এ ছাড়া গত ১২ এপ্রিল বাকলিয়ায় কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে মারধরের পর আটতলা ভবনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ ওঠে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৭ জুলাই আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড়ে অটোরিকশা জব্দ করাকে কেন্দ্র করে একদল কিশোর ট্রাফিক সার্জেন্টের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগও ওঠে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিশোরদের যারা অপরাধে ব্যবহার করছে, সেই পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

তার মতে, ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শনাক্ত করে কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এসব অপরাধী গ্রুপের পেছনে থাকা ‘বড় ভাই’দেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, মাদক, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অপরাধের পর মামলা দায়েরের পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগও জরুরি। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনের কারণ চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, শিক্ষা, খেলাধুলা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো না গেলে এ সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত