, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 34° সে. | 💧 আদ্রতা 58%

দ্রব্যমূল্যের চাপে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে কোটি মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে দৃশ্যমান খাদ্যসংকট না থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা। বাজারে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস ও শাকসবজির সরবরাহ থাকলেও অনেক পরিবারের পক্ষে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি এবং দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

অর্থনীতির সামগ্রিক চাপ, আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, মূল্যস্ফীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সাধারণ মানুষের সংকটকে আরও তীব্র করছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো প্রতিদিনের সংসার খরচ মেটাতে গিয়ে সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছে। পরিস্থিতির এই ধারাবাহিক অবনতি জনজীবনে এক ধরনের নীরব খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

 

বাজারের চাপে কমছে পুষ্টিকর খাবারের জোগান

 

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। সংসারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। কোনো কোনো পরিবারকে চাল-ডাল ও স্বল্পমূল্যের খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার কিনতে পারছে না, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খাদ্যসংকট মানেই বাজারে খাবারের অনুপস্থিতি নয়; অনেক ক্ষেত্রে খাবার কেনার সামর্থ্য হারানোও সংকটের বড় কারণ। তাই খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং ন্যায্যমূল্যে পণ্যপ্রাপ্তির বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

বাজার তদারকি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

 

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা দ্রুত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে সব মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ, আমদানি পরিস্থিতি, সরবরাহের ঘাটতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও বিশ্লেষণ করা দরকার। কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য এসব কারণ চিহ্নিত করে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

বাজার তদারকি কেবল অভিযান বা জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে মূল্য ও মুনাফার কাঠামো পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত বাজার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ভোক্তাদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

 

টিসিবি ও ওএমএস: সহায়তা পৌঁছাতে হবে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে

 

স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য বিক্রি এবং খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রির (ওএমএস) কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা। তবে এসব কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করতে পণ্য সরবরাহের পরিমাণ, বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা, বিতরণের সময়সূচি এবং উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

সহায়তা কর্মসূচিতে অনিয়ম, বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধা বণ্টনের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত অসচ্ছল পরিবার, দিনমজুর, নিম্নবেতনের কর্মজীবী এবং সংকটে পড়া মধ্যবিত্তদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সহায়তার আওতা নির্ধারণ করা জরুরি।

দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় পণ্য না পাওয়া কিংবা যোগ্য হয়েও সহায়তার বাইরে থেকে যাওয়ার পরিস্থিতি এড়াতে ডিজিটাল তালিকা, স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

 

অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে মধ্যবিত্তের অনিশ্চয়তা

 

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট বেতনে চলা চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। আয় না বাড়লেও খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে হয়।

অনেক পরিবার জরুরি সঞ্চয় ব্যবহার করছে, কেউ কেউ ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা নয়, সীমিত আয়ের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

 

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

 

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, কৃষক ও উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

একই সঙ্গে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্যসহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যস্ফীতির প্রকৃত প্রভাব নিরূপণে পরিবারের খাদ্যব্যয়, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সক্ষমতা এবং আয়-ব্যয়ের পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহও জরুরি।

বাজারে খাদ্যপণ্যের উপস্থিতি থাকলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; মানুষের সেই খাবার কেনার সামর্থ্যও থাকতে হয়। তাই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ক্রয়ক্ষমতার সংকট আরও বিস্তৃত হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পারিবারিক সঞ্চয় এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানের ওপর। জনস্বার্থে তাই খাদ্যনিরাপত্তাকে কেবল বাজারের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত