, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 34° সে. | 💧 আদ্রতা 55%

সার উৎপাদনের দেশেই সারের হাহাকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। দেশে রয়েছে বড় বড় সার কারখানা, আমদানি ও মজুতের ব্যবস্থাও। অথচ কৃষি মৌসুমে এসে মাঠপর্যায়ে সারের সংকটে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। প্রয়োজনের সময়ে সার না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অনেককে। কেউ কেউ আবার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কৃষকের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে সরকারের সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকার পর্যাপ্ত সার সরবরাহের কথা বললেও বাস্তবে ডিলার ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। কোথাও নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় তৈরি হচ্ছে সংকট ও অসন্তোষ। কৃষকের প্রয়োজনের সঙ্গে সরবরাহের এই ব্যবধান কেন—তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা জরুরি।

সমস্যাটি শুধু সার পাওয়ার ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন। সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, কমে যেতে পারে ফলন। অন্যদিকে সার সংগ্রহে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হলে কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়তে পারে কৃষকের আয়, বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর।

সার উৎপাদন ও মজুতের সক্ষমতা থাকার পরও যদি কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় সময়ে সার পৌঁছানো না যায়, তাহলে সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গুদামে সার থাকা আর মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, বরাদ্দ, ডিলার পর্যায়ের বিতরণ এবং খুচরা বিক্রির প্রতিটি ধাপে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। এই প্রক্রিয়ার কোথাও অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট কিংবা তদারকির ঘাটতি থাকলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

সরকারের দায়িত্ব শুধু সার উৎপাদন বা আমদানির পরিসংখ্যান তুলে ধরা নয়; বরং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে, নির্ধারিত দামে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কোথায় কত সার মজুত রয়েছে, কোন এলাকায় কী পরিমাণ চাহিদা রয়েছে এবং সেই অনুপাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুতদারি কিংবা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উপকরণের সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সারসংকটের কারণে ফলন কমে গেলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাও চাপে পড়তে পারে। ফলে বর্তমানের সারসংকটকে নিছক একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা এবং বাজার স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও জড়িত।

এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে সারের প্রকৃত মজুত ও চাহিদা যাচাই, ডিলারদের বরাদ্দ ও বিক্রির হিসাব পর্যালোচনা, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকেরা যাতে হয়রানি ছাড়াই নির্ধারিত দামে সার কিনতে পারেন, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী দেশে কৃষককে কেন সারের জন্য হাহাকার করতে হবে? উৎপাদন ও মজুতের সক্ষমতা থাকার পরও মাঠপর্যায়ে সংকট দেখা দিলে সরকারের সার ব্যবস্থাপনার সাফল্য কোথায়? কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে?

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। সেই কৃষির প্রধান উপকরণ সার সংগ্রহ করতে গিয়ে কৃষককে যদি অনিশ্চয়তা, বাড়তি ব্যয় ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রশ্ন নয়, কৃষকের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনেরও পরীক্ষা। আজকের সারসংকট যথাসময়ে নিরসন করা না গেলে আগামী দিনে তা বড় ধরনের খাদ্য উৎপাদন সংকটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, জবাবদিহি এবং কৃষকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সার সরবরাহব্যবস্থার সংস্কার।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত