কার্ল মার্কসের এর জন্মদিনের স্মরণে কিছু কথা

মো. কামাল উদ্দিন:

 

লেখাটি লিখার শুরুতেই কার্লমার্ক্স এর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি পৃথিবীর সকল নির্যাতিত অধিকার হারা মানুষদেরকে। এই লেখাটি যাকে নিয়ে লিখতে বসলাম আমি ছোট বেলা থেকেই এই মহান দার্শনিকের প্রতি দুর্বল ছিলাম, উনার বই পড়ে আমি চিন্তা চেতনা ও বিশ্বাসের পরিবর্তনের আমার উপর প্রভাব অনুভব করেছিলাম। উনার অসংখ্য বই আমি পড়েছি, যেই সময় কার্ল মার্ক্স এর থিউরি পরতাম তখন কিন্তু কার্ল মার্ক্সকে হজম করার আমার বয়স হয়নি। তার লেখাতে একটি আত্মপ্রতিবাদী মনোভাব পোষণের মতো শব্দ থাকতো, যা পাঠকরলে একধরনের চিন্তা চেতনার মনোভাব জন্মিত যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। তবে বই গুলো জার্মান বা ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলাতে

অনুবাদিত হতো বিদায় শব্দ চয়নে একটু কঠিন ছিলো, আজকে বুঝতে পাচ্ছি তখন যেই ব্যক্তিকে নিয়ে জল্পনা কল্পনা করতাম সেই ব্যক্তি কোন সাধারণ মানুষ নয় তিনি হলেন পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ জীবন-শিক্ষক এবং দার্শনিক, আজ আমি এই মহান চিন্তার নামককে নিয়ে কিছু লিখতে বসলাম।

ইতিহাস নিজেই নিজের পুনরাবৃত্তি করে। প্রথমে মর্মান্তিক ঘটনার দ্বারাআর দ্বিতীয় একটা রসিকতার দ্বারা।আমাদের এটা কখনোই বলা উচিত নয় যে, একটা মানুষের এক ঘণ্টার মূল্য অন্য আরেকজন মানুষের এক ঘণ্টার মূল্যের সমতুল্য। বরং আমাদের এটা বলা উচিত যে, ওই এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে একটা মানুষ ঠিক ততটাই দামি যতটা অন্য বাকি মানুষরাও। পুঁজিবাদীরা উৎপাদনের প্রযুক্তিকে বিকাশ করে আর নানা ধরনের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ সমাজে মিশিয়ে দেয়। এইসব তারা করে সম্পত্তির মূল স্রোত, মাটি আর শ্রমিকদের সম্পূর্ণ শোষণ করতে।সময় উদ্ভাবন হয়েছিল ঘড়ি কোম্পানিগুলো দ্বারা যেন তারা বেশি বেশি ঘড়ি বিক্রি করতে পারে।কারণ সবসময় বিদ্যমান ছিল কিন্তু সেটা সর্বদা সঠিক অবস্থায় ছিল না। শান্তির অর্থ সাম্যবাদের বিরোধিতা করা নয়। বিশ্বের শ্রমিকরা একত্রিত হও, তোমাদের কাছে হারানোর মতো কিছুই নেই শুধুমাত্র নিজেদের বাঁধন ছাড়া।

শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক চিন্তা, মতাদর্শের তাত্ত্বিক বিশ্লেষক ও প্রবক্তা, মহান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্ক্সের এবার ২০৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৮১৮ সালের ৫ মে জন্ম নেয়া দুনিয়া কাঁপানো মতবাদের বৈজ্ঞানিক প্রবক্তা এই মানুষটি ১৮৮৩ সালে মাত্র ৬৫ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছিলেন।১৪ মার্চ বেলা পৌনে তিনটায় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক চিন্তা থেকে বিরত হয়েছেন। মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য তাকে একা রেখে যাওয়া হয়েছিল। এঙ্গেলস লিখলেন, ‘আমরা ফিরে এসে দেখলাম যে তিনি তার আরাম কেদারায় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন কিন্তু ঘুমিয়েছেন চিরকালের জন্য।’ এই মানুষটির মৃত্যু ইতিহাস বিজ্ঞানের অপূরণীয় ক্ষতি বলে এভাবেই এঙ্গেলস বর্ণনা করেছিলেন। কেন? তার উত্তরে এঙ্গেলস উক্ত বক্তৃতায় বলেছিলেন- ‘ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন তেমনি মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম, মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা এই সহজ সত্য যে, রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথমে চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ। সুতরাং প্রাণধারণের আশু বাস্তব উপকরণের উৎপাদন এবং সেইহেতু কোনো নির্দিষ্ট জাতির বা নির্দিষ্ট যুগের অর্থনৈতিক বিকাশের মাত্রাই হলো সেই ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট জাতির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের ধ্যানধারণা, শিল্পকলা, এমনকি তাদের ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত এবং সেই দিক থেকেই এগুলির ব্যাখ্যা করতে হবে, এতদিন যা করা হয়েছে সেভাবে উলটো দিক থেকে নয়।’

কার্ল মার্কসের মৃত্যুর ৩দিন পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালের ১৭ মার্চ লন্ডনের হাইগেট সমাধিক্ষেত্রে তার সমগ্র জীবনের বন্ধু ও সহযোদ্ধা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বক্তৃতায় উপরোক্ত কথাগুলো বলেছিলেন। বিগত প্রায় ১৭৫ বছর ধরে সমগ্র পৃথিবীতে মানব চিন্তন প্রক্রিয়াকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছেন যিনি তিনি হলেন কার্ল মার্কস। অধুনা জার্মানিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এই বছর সমগ্র দুনিয়ার শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামরত সমস্ত মানুষ কার্ল মার্কসের দুইশত পাঁচতম জন্মদিবস পালন করছেন।

১৮১৮ সালের ৫ মে প্রুশিয়ার ট্রিয়ের শহরে কার্ল মার্কস জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন ইহুদি। তিনি ছিলেন আইনজীবী।ট্রিয়ের শহরে

শিক্ষালাভের পর মার্কস প্রথমে ‘বন’ পরে ‘বার্লিন’বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৮৪১ সালে মার্কসের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলে ‘এপিকিউরাসের’ দর্শন সম্বন্ধে তিনি একটি ‘থিসিস’ রচনা করেন। এই সময়ে মার্কস হেগেলের মতবাদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন এবং ‘বামপন্থী হেগেলীয়’ গ্রুপের সদস্য ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে মার্কস ‘বন’-এ এলেন অধ্যাপক হওয়ার আশায়। কিন্তু সরকার যেমন আগে ফয়েরবাখ ও ব্রুনোকে অধ্যাপনার অনুমতি দেয়নি, তেমনই মার্কসকেও দিলো না। বস্তুবাদের প্রবক্তা ফয়েরবাখের “Principles of Philosophy of the Future” প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কসসহ ‘বামপন্থী হেগেলীয়রা’ ফয়েরবাখের মতবাদের সমর্থক হন। সেই সময় কোলনে যে পত্রিকাটি (Rheinische Zeitung) প্রকাশিত হতো, মার্কস তাতে লিখতে লাগলেন। ১৮৪২-এ মার্কস সে পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হলেন। মার্কসের সম্পাদনায় এই পত্রিকার বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ঝোঁক ক্রমশ পরিস্ফুট হতে থাকলে, সরকার এই পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তখন মার্কস সম্পাদকের দায়িত্ব ত্যাগ করেন।

১৮৪৩ সালে মার্কস জেনিকে বিবাহ করেন। ১৮৪৩ সালের শরৎকালে তিনি প্যারিসে যান একটি পত্রিকা প্রকাশের জন্য। একজন ‘‘বামপন্থী হেগেলীয়’’ আর্নল্ড রির্ডজের সাহায্যে এখান থেকে মার্কস যে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন, তার মাত্র একটি সংখ্যাই বেরোয়। কারণ সেগুলি জার্মানিতে গোপনে প্রচার করা অসম্ভব হয়ে ওঠে এবং রির্ডজের সঙ্গে তার মতপার্থক্য দেখা দেয়। ১৮৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস প্যারিসে আসেন এবং তখন থেকেই মার্কসের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তারা দুজনে প্যারিসে তদানীন্তন বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সমাজতন্ত্রবাদের নামে যে সব ভুয়ো মতবাদ তখন প্রচলিত ছিল, তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হন। তারা দুজনে তখনই সর্বহারার বিপ্লবী সমাজতন্ত্র বাদের তত্ত্ব ও কৌশল রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রুশিয়ার সরকারের চাপে ১৮৪৫ সালে মার্কসকে বিপজ্জনক বিপ্লবী এই অজুহাতে প্যারিস থেকে নির্বাসিত করা হয়। তিনি ব্রাসেলসে যান। ১৮৪৭ সালে মার্কস ও এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লিগ’ নামে একটি গোপন দলে যোগদান করেন। ১৮৪৭ সালেই ঐ সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস হয় লন্ডনে। সেই কংগ্রেসে মার্কস ও এঙ্গেলসের বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। এই কংগ্রেসের অনুরোধে তারা ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ রচনা করেন, যা ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। তাদের এই সৃষ্টি এক নতুন চিন্তা, এক নতুন পথের নিশানা সকলের সামনে তুলে ধরে। অসীম প্রতিভাবান এই দুই পুরুষের কাছ থেকে মানুষ পেল : জগত সম্পর্কে এক নতুন ধারণা, বস্তুবাদ সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা, সমাজজীবনে বস্তুবাদের প্রয়োগ তত্ত্ব, বিকাশের বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব তত্ত্ব, শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্ব এবং সর্বহারার সাম্যবাদী সমাজের স্রষ্টারূপে ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক ভূমিকা।

১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিপ্লবের সূচনাতেই মার্কসকে বেলজিয়াম থেকে নির্বাসিত করা হলো। তিনি প্যারিসে এলেন, তারপর জার্মানির কোলনে গেলেন। সেখানে ‘নিউ জাইটুং’ পত্রিকা তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো। মার্কসের নতুন তত্ত্বের সত্যতা নির্ধারিত হলো – ১৮৪৮-৪৯ সালে ইউরোপের বৈপ্লবিক ঘটনাবলীর দ্বারা। প্রতিবিপ্লবীরা শঙ্কিত হলো। তারা প্রথমে মার্কসকে আদালতে হাজির করাল। কিন্তু আদালত মুক্তি দিলে, ১৮৪৯-এর ১৬ই মে জার্মানি থেকে তাকে নির্বাসন দেওয়া হলো। প্রথমে মার্কস প্যারিসে গেলেন, সেখানে থেকেও নির্বাসিত হলেন। তারপর গেলেন লন্ডনে। তখন থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত লন্ডনেই তিনি ছিলেন।

মার্কসের রাজনৈতিক নির্বাসিত জীবন খুবই কষ্টকর ছিল। মার্কস এবং তার পরিবারবর্গকে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতে হতো। এঙ্গেলস যদি এই সময়ে মার্কসকে নিয়মিত নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য না করতেন, তাহলে মার্কস শুধু ‘ক্যাপিটাল’ রচনা শেষ করতে পারতেন না, তাই নয়, তাকে অভাব-অনটনের মধ্যে ভেঙে পড়তে হতো। মার্কস এই সময়ে তার বস্তুবাদী তত্ত্বের আরও বিকাশ সাধন করেন এবং অনেকগুলো অমূল্য রচনায় ও অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। যার ফলে তৈরি হয় : A Contribution to the Critique of Political Economy (১৮৫৯) এবং ক্যাপিটাল, ১ম খন্ড (১৮৬৭)। পঞ্চম ও ষষ্ঠ দশকে ইউরোপে গণতান্ত্রিক আন্দোলন মাথা তোলে। মার্কস আন্দোলনের কাজে নিজেকে নিয়োগ করেন। ১৮৬৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর লন্ডনে International Working men’s Association গঠিত হয়। এটিই হলো প্রথম আন্তর্জাতিক। মার্কসই ছিলেন এই সংগঠনের প্রাণপুরুষ। এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের বহু ঘোষণা, প্রস্তাব, ম্যানিফেস্টো প্রভৃতি মার্কসেরই রচনা। এই সময়ে মার্কস যেমন বিভিন্ন দেশের শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামগুলোকে একই ধরনের কৌশলের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার প্রাণপণ চেষ্টা করেন, তেমনই ভুল ও অবৈজ্ঞানিক মতবাদগুলোর বিরুদ্ধেও নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালান। ‘প্যারি কমিউনে’র পতনের পর (১৮৭১) মার্কস তার বিখ্যাত রচনা The Civil War in France প্রকাশ করেন। ১৮৭২ সালে হেগ কংগ্রেসের পর প্রথম আন্তর্জাতিক ‘জেনারেল কাউন্সিল’ নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত হয়। মার্কসের নেতৃত্বে এই প্রথম আন্তর্জাতিক এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। এই আন্তর্জাতিক পৃথিবীর সকল দেশের শ্রমিক আন্দোলনে আরও অগ্রগতির পথ রচনা করে। এই আন্তর্জাতিক এমন একটি যুগের সূচনা করে, যে যুগে গণ-সমাজতন্ত্রবাদী দল প্রতিষ্ঠার পথে বিভিন্ন দেশের শ্রমিকশ্রেণি অনেকদূর এগিয়ে যায়। প্রথম আন্তর্জাতিকের এই অবদান অবিস্মরণীয়। ‘আন্তর্জাতিক’-এর জন্য কঠোর পরিশ্রম এবং তত্ত্বগত গবেষণার কাজে অধিকতর কঠোর পরিশ্রমের ফলে মার্কসের স্বাস্থ্য এই সময়ে ভেঙে পড়ে। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও ক্যাপিটালের পরবর্তী খন্ডগুলো সমাপ্ত করার জন্য তিনি এই সময় বিভিন্ন দেশের প্রভূত তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো পড়বার জন্য অনেকগুলো ভাষা শিক্ষা করেন। কিন্তু তার জীর্ণ স্বাস্থ্য শেষ পর্যন্ত তাকে ক্যাপিটাল সমাপ্ত করতে দেয় না।ন১৮৮১ সালের

২রা ডিসেম্বর তার স্ত্রী মারা যান। আর ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ তাকে তার প্রিয় আরাম-কেদারায় চিরনিদ্রায় শায়িত দেখা যায়। মানব সমাজের বিকাশধারাকে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার কাজ প্রথম করলেন কার্ল মার্কস। ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের সঙ্গে একযোগে তিনি সমাজের বিকাশধারার চর্চাকে বিজ্ঞানে রূপান্তরিত করলেন। সমাজ সম্পর্কিত রূঢ় নির্মম সত্যগুলোকে আড়াল থেকে প্রকাশ্যে আনলেন কার্ল মার্কস, সেইদিক দিয়ে তিনি ছিলেন প্রথম প্রকৃত অর্থে সমাজবিজ্ঞানী। কমরেড লেনিনের কথায়, ‘‘মানব সমাজের অগ্রণী ভাবনায় যেসব জিজ্ঞাসা আগেই দেখা দিয়েছিল মার্কস তারই জবাব দিয়েছেন।’’

অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে দর্শনের ক্ষেত্রে যে বিপুল অগ্রগতি ঘটেছিল মার্কস ও এঙ্গেলস তাকে আত্মস্থ করেছিলেন। জার্মান চিরায়ত দর্শন বিশেষ করে হেগেলীয় তত্ত্ব ও ফয়েরবাখের বস্তুবাদ মতবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উৎসের ভূমিকা পালন করেছে। জার্মান দর্শন প্রধানত হেগেলের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের কথা এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন। দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব হলো বিকাশের গভীরতম, পূর্ণতম, একদেশদর্শিতা বর্জিত তত্ত্ব। তবে জার্মান দর্শনে এই দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব মাথা নিচে বা পা ওপরে করে দাঁড়িয়েছিল। দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসার ঐতিহাসিক ভূমিকা মার্কসই পালন করেছিলেন।

মার্কসের পূর্বে অর্থশাস্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল তৎকালীন সর্বাধিক অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশ ইংল্যান্ডে। অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকাডো মূল্যের শ্রম তত্ত্ব প্রকাশ করেন। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের সব থেকে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এই যে তারা পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। মানুষের মধ্যেকার সম্পর্কের বিষয়টি তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। সামন্ততন্ত্রের পতনের পর মুক্ত দুনিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মেহনতী মানুষের ওপর পীড়ন ও শোষণের নতুন ব্যবস্থাই হলো পুঁজিবাদ। সমাজতান্ত্রিক মতবাদ নানাভাবে উপস্থিত হতে শুরু করে। শোষণহীন ও মুক্ত সমাজই হলো সমাজতন্ত্র। কিন্তু এই সমস্তই ছিল ইউটোপীয় সমাজবাদ। পুঁজিবাদী সমাজের সমালোচনা করেছে তার অবসান ঘটিয়ে এক উন্নততর সমাজ ব্যবস্থার কল্পনা করলেও কি উপায়ে তা প্রতিষ্ঠিত হবে সেই পথ দেখাতে পারেনি এই ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব। দর্শন, অর্থনীতি ও শ্রেণি

সংগ্রামের তত্ত্ব- এই তিনটি অঙ্গ নিয়ে মার্কসবাদ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে বস্তুবাদই একমাত্র সঙ্গতিপরায়ণ দর্শন হিসাবে দেখা দিয়েছে। বস্তুবাদ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমস্ত সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ত এবং কুসংস্কার, ভন্ডামির তা চরম শত্রু। মার্কসীয় দর্শন শুধুমাত্র বস্তুবাদই নয়, দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের সাথে তাকে যুক্ত করেছেন। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হলো মার্কসীয় দর্শন। আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্ত আবিষ্কারের দ্বারা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ সমর্থিত হয়েছে।

মার্কসীয় অর্থনীতির মধ্য দিয়ে কি করে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করে দেখানো হলো। পুঁজির কাছে শ্রমিকদের পরাধীনতা বাড়িয়ে তোলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। তার ফলেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্মিলিত শ্রমের শক্তি গড়ে ওঠে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদনের নৈরাজ্য, সঙ্কট, বাজারের জন্য প্রতিযোগিতা এবং জনসাধারণের ব্যাপক অংশের মধ্যে জীবনধারণের অনিশ্চয়তা অবশ্যম্ভাবী। সামাজিক উৎপাদন ও ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী মালিকানা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দ্বন্দ্ব। মার্কসীয় মতবাদকে শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব বলেও অনেক সময়ে অভিহিত করা হয়। সমস্ত নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ রয়েছে। শোষকশ্রেণির স্বার্থ এবং শোষিতশ্রেণির স্বার্থ। শোষিতশ্রেণির সংগ্রামই একমাত্র শোষকশ্রেণির প্রতিরোধকে চূর্ণ করতে পারে। পুরাতনের উচ্ছেদ ও নতুনের সৃষ্টি শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়েই সম্ভব। প্রলেতারিয়েতের জয়লাভ ঘটাবে শ্রেণিসংগ্রাম।দুনিয়াটাকে পরিবর্তিত করার লক্ষ্য নিয়ে মার্কস তার মতবাদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হয়েছিলেন। তাই বিপ্লবী তত্ত্বের সাথে সাথে বিপ্লবী সংগ্রাম সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। কমিউনিস্ট লিগ, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এই সমস্ত সংগঠন গড়ে তোলা ও তা পরিচালনায় তিনি ছিলেন কর্ণধার। শ্রমিকশ্রেণিকে সংগঠিত করা ছিল তার সমগ্র জীবনের লক্ষ্য। আমরা এই সময়ে কার্ল মার্কসের জন্মের দ্বিশতপাঁচতম বর্ষ, ক্যাপিটাল প্রথম খন্ডের ১৭৫ বছর এবং নভেম্বর বিপ্লবের একশতছয়তম বর্ষ উদযাপন করছি। এগুলোর ঐতিহাসিক প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মাথায় রাখতে হবে সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পরিবর্তন ঘটে গেছে। কার্ল মার্কসের সময়কালে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদ ছিল শিল্পপুঁজি নির্ভর। ফরাসি বিপ্লবে সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করে পুঁজিবাদ যখন ক্ষমতায় আসে তখন শিল্পপুঁজি ছিল প্রতিযোগিতা মূলক। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে লগ্নিপুঁজির একচেটিয়া যুগ প্রতিষ্ঠা পায়। পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের মৌলিক পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা করেছিলেন লেনিন। তিনি দেখিয়েছিলেন, সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জন্য কেন যুদ্ধ অনিবার্য। তিনি এটাও দেখিয়েছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের দুর্বলতম অংশে আঘাত করে অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ রাশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করা সম্ভব। আর একবিংশ শতাব্দীতে এখন আমরা যে পুঁজিবাদকে দেখতে পাচ্ছি তাকে উগ্র উদারবাদী অর্থনীতি বলতে পারি যেখানে পুঁজি শুধু উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে নয়, সরাসরি লুটের মাধ্যমে মুনাফা করছে। পুঁজিপতি, শাসকদল ও রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে আঁতাত গড়ে এই লুটপাট চলছে যাকে আমরা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা সোজা কথায় ধান্দার পুঁজিবাদ বলছি। এটাই বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলা প্রবণতা।

আমরা যারা মার্কসবাদী তারা জানি অর্থনীতিই সমাজের মূল কাঠামো তৈরি করে এবং সেই কাঠামোর ওপরে নির্ভর করেই সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি নানা উপরিকাঠামো গড়ে ওঠে। যদিও উপরিকাঠামোও কাঠামোর ওপরে প্রভাব ফেলে। একথা স্পষ্ট করে বলা যায় যে, দুনিয়াজোড়া এই লুটের অর্থনীতির কাঠামোর ওপরেই উপরিকাঠামোয় রাজনীতিতে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশে দেশে চরম দক্ষিণপন্থা ও স্বৈরতন্ত্রের উত্থান দেখা যাচ্ছে। এদের উত্থানকে অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এই চরম দক্ষিণপন্থীরা মানুষের সমর্থন পেতে জনমোহিনী স্লোগান ব্যবহার করছে। পোস্ট ট্রুথ যুগে অসত্যের নির্মাণ করা হচ্ছে এই লক্ষ্যে। অসত্য নির্মাণ এমনভাবে করা হচ্ছে যাতে বহু মানুষ কিছু পাওয়ার আশা করছেন, আবার স্বৈরতন্ত্রের বিরোধিতা করলে সেই সুযোগ হারানোরও ভয় করছেন। বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

২০ জানুয়ারি বাইডেন-কমলার অভিশেকের মধ্যদিয়ে মার্কিন ইতিহাসের এক কলঙ্কময় ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। বিদায় হয়েছে বিশ্ব উন্মাদ খ্যাত এক রোখা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তার চার বছর একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ দেখেছেন অর্থনৈতিক অধোগতি, মন্দা, বিপুল ছাঁটাই, অনিয়ন্ত্রিত মহামারীর কামড়, জাতিবিদ্বেষ, অভিবাসী-বিরোধী উগ্রতা, স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচারের এক উৎকট মিশ্রণ। অন্যদিকে, তার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের কর্মসূচি প্রসারিত হয়েছে লাতিন আমেরিকা থেকে ইরান, দক্ষিণ চীন সাগর থেকে ভারত মহাসাগরে। বিদায়বেলাতেও তার আত্মদাম্ভিকতা একটুও কমে নি। উল্টো তিনি দম্ভের সাথে বলেছেন, চার বছরে বহু কাজে তিনি সাফল্য অর্জন করেছেন। বলেছেন, ‘আবার দেখা হবে’। ফলে ভবিষ্যতে ট্রাম্পিজম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ঐক্যবদ্ধ আমেরিকা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে শপথ নিতে হলো জো বাইডেনকে। তার অভিশেক ভাষণে বার বার বলতে শোনা গেছে ‘বিভক্তি নয়, ঐক্যের আহ্বান’। জো বাইডেনের অধ্যায় শুরু হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন ধনকুবের কেন মানুষের সমর্থন পেয়েছিল? তা অনুসন্ধান করতে হবে ভবিষ্যতের জন্য। ব্রিটেনের মানুষ কেন ব্রেক্সিটের পদক্ষেপকে সমর্থন করলেন? এর উত্তর রয়েছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে। প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া বিশ্ব আর্থিক সংকট এখনো

[recent_tabs]