ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতময় ইতিহাস

শাহিদা আকতার জাহানঃ

 

ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত বর্তমান সময়ের চলমান একটি দীর্ঘতম কঠিন সংকটময় সংঘাত। কিন্তু কেন কীভাবে দীর্ঘদিন এ সংঘাতের সূচনা হয়েছে তা আমরা অনেকেই জানি না। দীর্ঘ ইতিহাস আলোচনায় জানা যায় ইসরায়েল দাবি করে জেরুসালেমের ওপর ন্যায় সঙ্গত ভাবে তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ফিলিস্তিন হলো মধ্যপ্রাচ্যের দক্ষিণাংশের একটি ভূখণ্ড।

যা ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান নদীর মাঝে অবস্থিত। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা এই তিন মহাদেশের জন্যই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। এটি ইহুদি ধর্ম ও খ্রিস্টধর্মের জন্মস্থান। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের এই সম্পূর্ণ ভূ-খণ্ড বা এর কোন কোন অংশ বিভিন্ন রকমের মানুষদের দ্বারা পরিচালিত ও শাসিত হয়ে আসছে। এদের মধ্যে আছে- কেনানীয়, আমরীয়, প্রাচীন মিশরীয়, ইসরায়েল বংশের ইহুদি, ব্যাবিলনীয়, পারস্য, প্রাচীন গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টাইনীয়, প্রাথমিক যুগের মুসলিম খিলাফাত, উমাইয়াদ, আব্বাসীয়, সেলজুক, ফাতমি প্রভৃতি। খ্রিস্টান ক্রুসেডার বা ধর্মযোদ্ধাগণ, শেষের দিকের মুসলিম খিলাফাত, আইয়ুবি, মামলুক, উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রভৃতি। ব্রিটিশ, জর্ডানি, পশিম তীরের অংশটুকু, মিশরীয়, গাজা অঞ্চল।ফিলিস্তিনের অপরাপর নামগুলো হলোঃ কানান, জায়ন, ইসরায়েলের ভূমি, দক্ষিণ সিরিয়া, জুন্দ ফিলাস্তিন এবং পবিত্র ভূমি।

ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে দুটি প্রধান ধর্মের সূতিকাগার। তাই স্বভাবতই ফিলিস্তিন নামক ভূখণ্ডটির রয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি, বাণিজ্য অর্থনৈতিক ও রাজনীতির এক দীর্ঘ আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইতিহাস। ফিলিস্তিন অঞ্চলটি পৃথিবীর প্রাচীন অঞ্চলগুলোর একটি।যেখানে মানুষের বসবাস হচ্ছে কৃষিনির্ভর জনসমষ্টি এবং সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয় ইসরায়েল । তারপর থেকে জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী বলে ঘোষণা করলে ও আন্তর্জাতিক ভাবে এর কোন স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এই চরম সংঘাতের পুরনো ‘ইতিহাস’ জানতে হলে বিশ্লোষণ করতে হলে নজর দিতে হবে ধর্মগ্রন্থে। প্রথমে আমাদের জানতে হবে ইজরায়েলের ধর্মীয় ইতিহাস কী।ইজরায়েলের ধর্মীয় ইতিহাস হলো হিব্রু বাইবেল, ইসলামী ধর্মীয় ইতিহাস মোতাবেক, নবী হযরত ইব্রাহিম (আ) ঈশ্বর ইয়াহওয়েহ হিব্রুতে ঈশ্বরকে এ নামেই ডাকা হয়, আর আরবিতে আল্লাহ্‌। তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে পবিত্র ভূমি কেনান তার সন্তানাদিকে দেয়া হবে যেটা এখন ইজরায়েল ফিলিস্তিন অঞ্চল। অর্থাৎ তার বংশধররা এ এলাকার মালিক হবে। সীমান্ত এবং এলাকা নিয়ে তাদের মধ্যে চরম বিরোধ। ফিলিস্তিনিরা দাবী করেন ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে যে সীমান্ত ছিলো সেই সীমানার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। কিন্তু ইসরায়েল কোন মতে এটা মানতে রাজি নয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনিদের এলাকা দখল করে নিয়েছিলো, সে সব এলাকায় অনেক ইহুদী বসতি বাড়ি গড়ে তুললে ও আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসত-বাড়ি অবৈধ। জানা যায় পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে এখন বসতি গেড়েছে প্রায় পাঁচ লাখের বেশি ইহুদী। এখানে উল্লেখ্য যে হযরত ইব্রাহিম (আ) এর প্রধান দুই পুত্র ইসমাইল (আ) আর ইসহাক (আ)। ভাগ্যক্রমে, আল্লাহর হুকুমে হযরত ইসমাইল (আ) আর তার মা হাজেরা-কে আরবের মক্কায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। আর ওদিকে কেনান দেশে রয়ে যান ইসহাক (আ)। তার পুত্র ছিলেন ইয়াকুব (আ), ইয়াকুব (আ) এর আরেক নাম ছিল ইসরাইল, হিব্রুতে যার আক্ষরিক অর্থ “ঈশ্বরের সাথে জয়ী”। তার বারো সন্তান। এই বারো সন্তানের নামে ইজরায়েলের বারো গোত্রের নামকরণ করা হয়। ১২ সন্তানের একজন ইউসুফ (আ) ভাইদের কুচক্রান্তে স্বীকার হয়ে মিসরে দাস হিসাবে উপনীত হয়। জেলে বন্ধি থেকে সাত বছর পর ভাগ্যেক্রমে মিসর রাজকর্তার আস্তাভাজন হিসেবে আবিষ্কার করেন। এবং তিনি হন নবী। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল লাখ-লাখ ফিলিস্তিনি। এরা ইসরায়েলের ভেতর তাদের যে বাড়িঘর ছিলো সেখানে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। পিএলও’র হিসেবে এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। কিন্তু কোন মতোই ইসরায়েল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। তাদের আশংকা, এত বিপুল সংখ্যাক ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলে ফিরে আসে, তাদের রাষ্ট্রের ইহুদী চরিত্র আর ধরে রাখা যাবে না। তাই তারা বার-বার ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে মিসরীয় যুবরাজ পালিত পুত্র তাদের রাজপরিবার থেকে সমস্ত আনন্দ আরাম আয়েশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেক বছর পরে ইজরায়েলের নির্যাতিত-নিপীড়িতদের মানুষের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। নবী হযরত মুসা (আ)। তিনি লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে ইজরায়েল জাতিকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করে। নবী হযরত মুসা (আ) পেলেন আসমানী কিতাব তাওরাত। তখন ইহুদীরা পৌত্তলিক র্ধমে মগ্ন হয়ে পড়ায়,আল্লাহ্‌ তাদেরকে ৪০ বছর শাস্তি দেন । ফিলিস্তিনিরা নিজেদের কেনানীদের বংশধর বলেই মনে করে। তাই জিনগতভাবে তারা আসলে প্রায় একই। শুধুমাত্র ধর্মবিশ্বাস ছিলো আলাদা ইজরায়েলিরা যখন কেনান দেশে থাকত, তখন তারা স্থানীয়দের সাথে বিবাহ করে। ফলে পরবর্তী বংশধর এমনভাবে বাড়তে থাকে যে, ৮৭.৫%-ই হলো কেনানীয় রক্ত। ইজরায়েলিরা যেখানে উপাসনা করত এক ঈশ্বরের, সেখানে ফিলিস্তিনিরা ছিল পৌত্তলিক।

সুলাইমান মারা যাবার পর পুত্র রেহোবামের রাজত্বকালে ইজরায়েলের পতন শুরু হয়, পৌত্তলিকতায় ডুবে যেতে থাকে। শক্তিমান ব্যাবিলন রাজ্যের আক্রমণে ইজরায়েলিরা বন্দি হয়ে পড়ে। তাদের নির্বাসন শুরু হয়। আর ওদিকে ইজরায়েল রাষ্ট্র ধুলায় মিশে যায়।

কিন্তু আল্লাহর চোখে শাস্তি শেষ হলে, পারস্যের রাজা সাইরাস তাদের ব্যাবিলন থেকে মুক্ত করেন। এ সময় নবী হযরত দানিয়েল (আ) এর কীর্তি উল্লেখযোগ্য। ফিরে এসে তারা পুনরায় বানায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাইতুল মুকাদ্দাস। আর নবী/পাকব্যক্তি হজরত উজাইর (আ) আর নেহেমিয়া (আ) এর নেতৃত্বে ইজরায়েল আবার ভালোর দিকে ফিরতে থাকে। তাছাড়া সাহায্য করেন হজরত হিজকিল (আ)।

সুলাইমানপুত্র রেহোবামের সময় রাজ্য দুভাগ হবার কথা বলছিলাম। উত্তরের রাষ্ট্র ইজরায়েল, আর দক্ষিণের রাষ্ট্র জুদাহ। এটা মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ৯ম-১০ম শতকের কথা। আর মাঝখানে এত কাহিনী গিয়ে রাজা সাইরাসের হাতে উদ্ধার পাবার সময়কাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সাল।

যখন খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ সালে অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট মারা গেলেন, তখন তার জেনারেলরা মারামারি শুরু করে দেন রীতিমত। যেমন টলেমি নিয়ে নিলেন পুরো ইহুদী অঞ্চলের দখল। যদিও পরে সিরিয়ার সেলুচিদদের হাতে খ্রিস্টপূর্ব ১৯৮ সালে হারিয়ে ফেলেন এ অঞ্চল। ওদিকে গ্রিক সভ্যতার সংস্পর্শে এসে ইহুদী ধর্ম প্রভাবিত হয়ে নতুন এক সেক্ট গড়ে ওঠে, যারা পরিচিত হয় হেলেনিস্টিক জ্যু (ইহুদী) নামে। তাদের মাঝে ছিল গ্রিক সংস্কৃতির ছোঁয়া। মূল ধারার ইহুদীরা তাদের ধর্মচ্যুত মনে করত।

খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ সালে রোমান জেনারেল পম্পেই জেরুজালেম দখন করে নেন। যীশুর জন্মের ৪৭ বছর আগে আলেক্সান্দ্রিয়ার যুদ্ধে ৩০০০ ইহুদী সেনা পাঠানো হয় যারা জুলিয়াস সিজার আর ক্লিওপেট্রাকে রক্ষা করে।

৬৪ সালে ইহুদী রুল জারি করা হয় যে, সকল ইহুদিকে ৬ বছর বয়স থেকেই লেখাপড়া শিখতে হবে। তখন থেকেই ইহুদীরা লেখাপড়াকে খুবই গুরুত্ব সহকারে নিত।

৬৬ সালে রোমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন রাষ্ট্র ইজরায়েল ঘোষণা করে বসে ইহুদীরা। তখন তাদের শায়েস্তা করা হয়, প্রায় ১ মিলিয়ন ইহুদী মারা যায়।

রোমান সংসদ হেরোদ নামের একজনকে ইহুদীদের রাজা হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরকম সময়ে এই ইহুদী অঞ্চল যখন রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে, তখন জন্মগ্রহণ করেন যীশু খ্রিস্ট (ঈসা আঃ)। তিনি ছিলেন “মসীহ” (অভিষিক্ত ত্রাতা) যিনি কিনা এই হতভাগ্য ইহুদী রাষ্ট্রকে উদ্ধার করবেন, নতুন আলোর পথ দেখাবেন। কিন্তু যখন যীশু ইহুদী ইমামদের (র‍্যাবাইদের) দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে লাগলেন তখন ইহদিরা চক্রান্ত করল যেন রোমান শাসককে বুঝিয়ে সুজিয়ে যীশুকে ক্রুশে দিয়ে মেরে ফেলা যায়, এবং তাই তারা করে। ইহুদী মতে তারা যীশুকে ক্রুশে দিয়ে মেরে ফেলে। যদিও ইসলাম মতে, আল্লাহ্‌ হযরত ঈসা (আ)-কে অক্ষত রাখেন এবং তুলে নেন, যিনি শেষ সময়ে আবার ফেরত আসবেন।

১৩১ সালে সম্রাট হাদ্রিয়ান ইহুদী ধর্ম নিষিদ্ধ করেন। জেরুজালেমের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ইলিয়া কাপিতোলিনা। বাইতুল মুকাদ্দাসের জায়গায় জুপিটার মন্দির বসান। আর ইহুদী প্রদেশের নাম চেঞ্জ করে রাখেন “প্যালেস্টাইন” বা আরবিতে “ফিলিস্তিন”। তখন আবারো বিদ্রোহ করে ইহুদীরা, কিন্তু লাভ হয়নি। চলবে।

[recent_tabs]