আজ ২৩ মে এই বেইমান সানাউল হকে জন্মদিন

মো. কামাল উদ্দিনঃ

 

এই বেঈমানকে বিশ্ব মানবতাবদী নেতা, মহাকালের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- শিক্ষাবীদ, কবি সাহিত্যিক লেখক হিসেবে, দেশ ও মানবপ্রীয় মানুষ মনে করে একজন অমানুষকে ১৯৭৩ সালের ১৫ মে বেলজিয়ামের বাংলাদেশের প্রথম রাষ্টদূত হিসেবে যাঁকে রাজনৈতিক বিবেচনায় স্নেহে করে নিয়োগ দিয়েছিলেন সেই বেঈমান১৫ ই আগস্টে ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর পর এই মানুষ নামের অমানুষটি অসহায় পুরো পরিবার হারানো দুই বোন শেখ

হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূতের বাসা থেকে বের করে দেওয়া এই সেই সানাউল হক!! আমি তার স্মৃতির প্রতি থুথু নিক্ষেপ করে আজ কিছু কথা লিখলাম। সানাউল হকের বাড়ী বার্মনবাড়িয়া, সেই সুবাদে সে বেঈমান খন্দকার মোশতাকের আনুগত্য স্বীকার করে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। চল্লিশ দশক হতে লেখা লেখি করে আসছে – লেখার ইতিহাস দেখলে মনে হবে সেই একজন মানবতাবাদী একজন সৃষ্টিশীল লেখক তার লেখাতে মানবিক বিবেচনা মূলক কথা উঠে আসলেও আসলে তার লেখা আর কথা এবং বাস্তবতার সাথে কিছুই মিল ছিলোনা সেই একজন ভন্ড লেখক ছিলেন। এই বেঈমানকে বিগত সময় অনেক পুরস্কার দিয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারিদেরকে সমথর্ন দেওয়া ও মিনিটের মধ্যে তার চরিত্র পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে আশ্রয় দেওয়ার পরিবর্তে রাস্তায় বাইর করে দেওয়ার সাহসী কসাই এর ভুমিকা পালন করার দরুন। তাকে ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রের সম্মানিত পুরস্কার একুশে পদক দেওয়ার হয়েছিল– আজকে তা মনে পড়লে তাতে মনে হয় “এই লজ্জা রাখি কোথায়” সেই বেঈমানের কথা সাথে তার বেঈমান উত্তরসুরী মীর জাফরের চেয়েও জঘন্য বেঈমান খন্দকার মোশতাকের কথা না কিছু না বল্লে হবেনা-

বঙ্গবন্ধুর বাবা মারা যাওয়ার পর পিতা হারানোর শোকে কাতর বঙ্গবন্ধুর সামনে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টির পরবর্তী ঝড়ের পানির মতন অশ্রু ফেলেছিলো যে ব্যাক্তি তার নাম খন্দকার মোশতাক।

আর সেই খন্দকার মোশতাককেই কিন্তু ইতিহাসে অনেকে মীরজাফরের সাথে তুলনা করে।

আসলে সেই তুলনা কতখানি গ্রহনযোগ্য?

আমার মনে হয় সেই তুলনা সম্পূর্ণ রুপে অগ্রহনযোগ্য কারন আলীবর্দী খা থেকে শুরু করে সিরাজউদ্দৌলা ও বেইমান হিসেবে মীরজাফর তারা কেউই তো বাঙ্গালী ছিলো না , এমনকি, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ এরা কেউ ই বাঙ্গালী ছিলেন না।

তবে কেনো বাঙ্গালী জাতির বেইমান হিসেবে মীরজাফরের নাম বলা হয়?

বাঙ্গালী জাতির গর্ব হিসেবে যদি বাংলার সন্তানদের নাম নেয়া হয় তবে বেইমান হিসেবে কেনো নিতে হবে কোন অবাঙ্গালের নাম?

খন্দকার মোশতাক নামটিই হয়ে উঠুক বাঙ্গালী জাতির চিরন্তন বেইমান প্রতীকী নাম হিসেবে।

পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের পর দিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যে বন্ধুরুপী বেইমান শত্রু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলো বিদেশী এম্বেসীগুলোর হাতে সেই খন্দকার মোশতাকের মতন বহুরূপী মনে হয় না তার আগে এই বাংলায় কেউ জন্মিয়েছিলো বলে।

শুধু একটাই ভয় হয় যে এই স্বাধীন বাংলায় মোশতাকের যে বংশধরেরাও আজো মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিয়ে বন্ধু বেশেই ঘুরে বেড়ায় আমাদেরই আশে পাশে তাদের আমরা চিনতে পারা যাবে তো?

জাতীয় বেইমান হিসেবে মীরজাফর নয় বরং মোশতাকের নাম বলা হোক সর্বত্র আর নিরাপদে থাক আমাদের বাংলাদেশ মোশতাকদের কু নিজের থেকে।যেই মোশতাক ১৪ আগস্ট রাতে তাঁর বাসা থেকে হাঁস রান্না করে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে শেষ খাওয়ার খাবাছেন এবং রাত ১৩ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসায় পাহারা দিয়ে সকালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যাকরেছিল যা এই কলংকিত ইতিহাস পৃথিবীর সবাই জানে। চলুন এই সানাউল হকের ভুমিকা কি ছিলো তা একটু শুনে আসি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনার পরই বদলে গেলেন রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক। সেদিন বেলজিয়াম দূতাবাসের বাসায় অবস্থান করছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ঘটনার পর তাঁদেরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন এই রাষ্ট্রদূত।তখন জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (পরে স্পিকার) টেলিফোনে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নিরাপত্তা দিতে অনুরোধ করলেও সানাউল হক তা প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি শেষ মুহূর্তে হুমায়ুর রশীদ চৌধুরী জার্মানির সীমান্ত পর্যন্ত শেখ হাসিনার পরিবারকে নিরাপদে দূতাবাসের গাড়ি দিয়ে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করলেও সানাউল হক তাতেও রাজি হননি। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পরবর্তীতে তার এক সাক্ষাৎকারে এ সম্পর্কে বলেছেন, সানাউল হক অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘আমাকে কেন এসব ঝামেলায় জড়াচ্ছেন? আমি এসব জটিলতায় পড়তে চাই না।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন ঢাকায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া এর আগে একটি গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে পড়তে গিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গেই জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনা ও তার দুই সন্তান জয় ও পুতুল। আগস্টে ওয়াজেদ মিয়া কয়েকদিনের ছুটি পান।

এদিকে শেখ রেহানা ৩০ জুলাই বেড়াতে যান শেখ হাসিনার কাছে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫ আগস্ট ওয়াজেদ মিয়া সবাইকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য বেলজিয়াম বেড়াতে যান। এ বিষয়ে বিভিন্ন বই ও সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, ১৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনা ও তার পরিবার বেলজিয়াম বেড়াতে যান তখন সানাউল হক ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। তার বাসায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ওইদিন রাত তিনটা পর্যন্ত সানাউল হকের স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে আড্ডা চলে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার। শেখ রেহানা তার এক স্মৃতিচারণে এ সম্পর্কে বলেন, রাত তিনটা পর্যন্ত সানাউল হকের মেয়ে ও অন্যদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন আর জোরে জোরে হাসছিলেন শেখ রেহানা। এসময় ওয়াজেদ মিয়া বারবার এসে আস্তে হাসার জন্য বলেন। রাত তিনটার দিকে এসে ওয়াজেদ মিয়া শেখ রেহানাকে বলেন, এত হাসাহাসি করা ভালো না

বেশি হাসলে সারাজীবন কাঁদতে হয়। সেদিন সানাউল হক তাদের কিছুদিন বেলজিয়ামে তার বাড়িতে থাকার জোর অনুরোধও করেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যান এই রাষ্ট্রদূত।

জানা গেছে, সানাউল হককে খুব স্নেহ করতেন বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও তাকে রাষ্ট্রদূত করেছিলেন। হুমায়ুর রশীদ চৌধুরী তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন, সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর সবার আগে পৌঁছেছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ওয়াশিংটন সময় বিকেল ৩টা। লন্ডনে তখন রাত ১২টা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর দেশের বাইরে যেসব বাংলাদেশি কূটনীতিক পান তাদের মধ্যে লন্ডন মিশনের কূটনীতিকরা অন্যতম। লন্ডন মিশনের খবর পেয়ে ফারুক চৌধুরী খুব ভোরে এই দুঃসংবাদটি জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জানান। তার ধারণা ছিল- ড. ওয়াজেদ মিয়া তার পরিবার নিয়ে এ সময় জার্মানিতে অবস্থান করছেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী খবর পেয়ে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সানাউল হককে ফোন করেন এবং ফারুক চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া সংবাদ তাকে জানান এবং শেখ হাসিনা ও অন্যদের জার্মানির সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী লিখেছেন, সানাউল হক তাতে রাজি হলেন না। তিনি আরও লিখেছেন, সানাউল হকের কথায় মনে হচ্ছিল- তিনি শেখ

হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের পারলে তখনই বাড়ি থেকে বের করে দেন। সেই সানাউল হক পরবর্তীকালে ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। চল্লিশের দশকের একজন খ্যাতিমান কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন সানাউল হক। ১৯২৪ সালের ২৩ মে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার চাউরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার প্রকৃত নাম আল মামুন সানাউল হক। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অন্নদা স্কুল থেকে ম্যাট্টিক (১৯৩৯), ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ (১৯৪১) এবং ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স (অর্থনীতি) ও ১৯৪৫ সালে এমএ পাস করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে আইনবিদ্যালয় বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৬ সালের ২৯ নভেম্বর সানাউল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন এবং ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। এরপরই তিনি সরকারি চাকরি শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর , ১৯৭৩ সালের ১৫ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বেলজিয়ামে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনার সময় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা , হাসিনার স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়া এবং তাদের সন্তানরা ব্রাসেলসে হকের বাসায় অতিথি হিসেবে অবস্থান করছিলেন । ১২ আগস্ট, তারা বন থেকে হকের বাসায় পৌঁছেছিলেন এবং ১৪ তারিখে একটি মোমবাতি আলো ডিনারে যোগ দেন।  ১৫ তারিখে রহমানের মৃত্যুর খবর শুনে হক পশ্চিম জার্মানিতে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীকে ফোন করেন এবং অতিথিদের অবিলম্বে জার্মানিতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।  অবশেষে, অতিথিদের ব্রাসেলস থেকে বেলজিয়াম -জার্মান সীমান্তের

কাছে নিয়ে যাওয়া হয় । এরপর চৌধুরী হাসিনা ও পরিবারকে কোনিগসউইন্টারে তার বাসভবনে নিয়ে আসার জন্য আচেনে দুটি গাড়ি পাঠান । হক ১৯৭৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হকের দুই ছেলে ইরতেফা মামুন ও সুমন ইফাত মামুন এবং তিন মেয়ে তাসনিম জাফরুল্লাহ, ত্রিনা রুবাইয়া মামুন ও সাইদা হুসাইনী মামুন।  ২০২৩ সালের এপ্রিলে, ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত গুলশানের একটি সম্পত্তি বিক্রির সাথে সম্পর্কিত প্রতারণার অভিযোগে পরিবারের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন । ১৯৬০-এর দশকে মুহাম্মদ আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে হকের ধানমন্ডি ও গুলশানে জমি সম্পত্তি ছিল । আদালতের সন্দেহ, বাবার পরিচয় প্রকাশ না করে আদালতকে প্রতারণা করেছে পরিবার। অন্য দিকে তখন জার্মানির রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্বরত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর ভুমিকা কি ছিলো তা একটু দেখার দরকার- এতক্ষণ আমরা অমানুষ সানাউল হকের অমনুষ্যত্ব আচরণের কথা শুনলাম এখন একজন খাঁটি মানুষের কথা তুলে ধরবো-রাষ্ট্রদূত সানাউল হক দেন তাড়িয়েদেন, তখন শেখ হাসিনা-রেহানাকে আশ্রয় দিয়ে ওএসডি হন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী,তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনে শেখ হাসিনা-রেহানাকে নিজের সরকারি বাসা থেকে কিভাবে তাড়াবেন, সে চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, বেলজিয়ামস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক। আর ঠিক তখনি ব্যতিক্রমী এক মানবিক চরিত্রে রূপদান করেছিলেন পশ্চিম জার্মানীস্থ বাংলাদেশেরই রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয়কে তাঁর সরকারি বাসায় আশ্রয় দিতে যেন এক মরণপণ তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি সফলও হয়েছিলেন, বেলজিয়াম থেকে বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যাকে পশ্চিম জার্মানিতে নিয়ে এসে নিজের সরকারি বাসাতেই উঠালেন। এমনকি  তাদের জানে বাঁচানোর জন্য ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়লাভেরও সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে তিনি ওএসডি হন। এরকম শাস্তি যে, অপেক্ষা করছিল, তা তিনি জানতেন। পুরো লেখাটির পরোতে পরোতে সে কথাই ফুটে উঠেছে। পনের আগস্ট ভোরবেলা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাসার টেলিফোন ক্রিংক্রিং শব্দে বেজে উঠল। ঘুম হতে জেগে উঠলেন মিঃ চৌধুরী, (পশ্চিম জার্মানীস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত)- রিসিভার কানে তুলে নিলেন। ওমনি ওপাস থেকে তাঁর কর্ণগোচরিত হল,  একটি ভারাক্রান্ত কন্ঠে- স্যার, আমি ফারুক আহমেদ চৌধুরী বলছি, লন্ডন থেকে (লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার)- খবর শুনেছেন স্যার? ঢাকার খবর। কী হয়েছে ঢাকার আবার? হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর প্রশ্ন।

স্যার, ঢাকায় অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। শেখ সাহেবের ভাগ্যে কী ঘটেছে, এখনও অনিশ্চিত স্যার। বলো কী? স্যার সম্ভবত শেখ সাহেব মারা গেছেন। ফোন রেখে স্তম্ভিত রাষ্ট্রদূত স্ত্রী মাহজাবিনকে ডেকে বললেন। কিন্তু মাহজাবিন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এমনকি রাষ্ট্রদূত নিজেও না।

 

তারপরও বিচলিত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ব্রাসেলসে ফোন করলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হককে। জানতে চাইলেন, ঢাকার খবর কী? নীরব রাষ্ট্রদূত – কথা বলছেন না। রিসিভার রেখে দিলেন ফোনের ওপর।

দিকবিদিকশুন্য রাষ্ট্রদূত আবার ফোন করলেন সানাউল হককে। বললেন হাসিনা এবং রেহানাকে যেন কিছু না জানানো হয়। তাদের যে কোন সাহায্য করতে তিনি তাঁর মানসিক প্রস্তুতির কথাও জানিয়ে দিলেন। চৌধুরী ফোন রেখে এবার রেডিও অন করলেন। বিবিসি অভ্যুত্থান হওয়ার খবর প্রচার করলেও সূত্রটিকে বলছিল অসমর্থিত।

 

চৌধুরীর স্মৃতিপটে ভেসে উঠল শেখ সাহেবের তাকে বলা কিছু কথা। শেখ সাহেব কী তাঁর মৃত্যুর আগাম বার্তা পেয়ে গিয়েই বলেছিলেন, ঘটনাবলী ভাল যাচ্ছে না?

 

কয়েকঘন্টা পর ব্রাসেলস থেকে রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের ফোন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী কথার হাবভাব শুনে বুঝতে পারলেন এবং মনে হল, সানাউল হক খুব অস্থির, হাসিনা-রেহানাকে নিয়ে যেন খুব ঝামেলায় আছেন। ওদের তাড়িয়ে দিলেন বাঁচেন।

বললেন, জানো হুমায়ুন, প্যারিস থেকে আবুল ফতেহ গাড়ি পাঠায়নি। কথা ছিল গাড়ি পাঠাবে, ওদের নিয়ে যাবে। কিন্তু ফতেহর বাসায় কেউ টেলিফোন ধরছে না।

এবার প্যারিসে শফি সামিকে ফোন করলেন চৌধুরী। তখন তিনি অসুস্থ, হাসপাতালে। শফিকে বললেন, রাষ্ট্রদূত ফতেহকে পাওয়া যাচ্ছে না। শেখ সাহেবের মেয়েদের প্যারিসে যাওয়ার কথা। ওরা যদি যায় তাহলে, ওদেরকে দেখ। শফি সামি বললেন, ঠিকআছে আমার বাড়িতে রাখব। শফি সামির স্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আবারও চৌধুরী ব্রাসেলসে সানাউল হককে ফোন করে বলেন, শেখ সাহেবের দুই কন্যাকে গাড়ি দিয়ে অন্তত জার্মান সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেন। সানাউল হক রাজি হলেন না। চৌধুরী বিস্মিত হয়ে সানাউল হককে বলেন, কী বলছেন আপনি, এতটুকু মমত্ববোধ নেই? আপনাকে তো শেখ সাহেব খুব স্নেহ করতেন, অনেকের অমতে আপনাকে রাষ্ট্রদূতও বানিয়েছেন। সামান্যতম কৃতজ্ঞতাবোধও তো থাকা উচিত। চৌধুরী ক্ষুব্ধ হন সানাউল হকের আচরণে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, এই ভদ্রলোক বঙ্গবন্ধুর মেয়েদের গাড়ি দিতে রাজি হননি, তো বাড়িতে ঠাঁই দেয়া তো দূরের কথা। যাহোক সানাউল হককে টেলিফোনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জানিয়ে দেন যে, ওরা আমার জার্মানির বাড়িতে আসবে। আমি তাদের আশ্রয় দেব। আমি অকৃতজ্ঞ নই। আমার চাকুরির কোন মায়া নেই। মানবতা আমার কাছে মুখ্য। আমার বাবা-মা মানুষের সেবা করতে শিখিয়েছেন। বলেছেন, মানুষের বিপদেআপদে যেন ছুটে যাই। সত্যিই পরিণতি কী হবে জেনেও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের জার্মানিতে নিয়ে যান। ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তারা পৌঁছল। ওদিনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.  কামাল হোসেনের জার্মানিতে

পৌঁছার কথা। সঙ্গে পররাষ্ট্র দফতরের মহাপরিচালক রেজাউল করিমেরও। বেলগ্রেডে অবস্থানরত ড. কামাল তখনও ঢাকার খবর জানেন না। চৌধুরীর ভাষ্যমতে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের আগেই ড. কামাল জার্মানিতে পৌঁছে গেছেন এবং সবকিছু জানতে পেরে খুবই অস্থির কথা বলতে পারছিলেন না। শেখ সাহেবের মেয়েরা যখন আমার বাসায় পৌঁছল তখন কী দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়- চৌধুরীর ভাষ্যমতে, জীবনে অনেক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। এমন হইনি কখনও। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। হিমশীতল পরিবেশ। কান্নায় বাড়ির নিস্তব্ধতা কেটে গেল।

চৌধুরী ঢাকায় ফোন করছেন কিন্তু কাজ করছে না। ঢাকার সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এর মধ্যে হাসিনা-রেহানা চৌধুরীর বাসার রেডিও মারফত সব জেনে গেছেন। সয়ং শেখ হাসিনা কেঁদে কেঁদে চৌধুরীকে বলেন, বাবার সঙ্গে কামাল-জামালও চলে গেছে। এখন আমার মা, রাসেল ও চাচাকে আমাদের কাছে এনে দিন।

রাত তখন দশটা। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জানতেন বেগম মুজিবও নেই। তবুও তিনি দুই কন্যাকে বললেন, ঠিক আছে তাই হবে, আমি দেখছি, কী করা যায়। এর কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই জানাজানি হয়ে গেল যে, বেগম মুজিবও মারা গেছেন। শেখ হাসিনার অনুরোধে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ঢাকায় টেলিগ্রাম পাঠালেন, শেখ রাসেলকে যেন জার্মানিতে পাঠানো হয়। তখনও সবার ধারণা ছিল শিশু রাসেল বেঁচে আছে। ঢাকার পররাষ্ট্র দফতর থেকে কোন জবাব এল না।

ৃহুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সেদেশের সরকারের সানুগ্রহ  কামনা করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে খুশি হয়ে প্রতিত্তোরে বললো, মিঃ চৌধুরী, আমরা আপনার সাহসী ভুমিকাকে উৎসাহিত করছি তবে নিজে যে কোনোপ্রকার ঝামেলায় পড়া থেকে সর্তক থাকবেন।

জার্মান সরকার কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন চৌধুরীর বাসভবনে। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা জানতে চাইলো হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর কাছে – কে এই ঘটনার নায়ক?  চৌধুরী বলেন, খন্দকার মোশতাক। বিশ্বাস করতে পারছিলেন শেখ হাসিনা। আব্বার সঙ্গে চাচা কতো ঘনিষ্ঠ, পরিবারের সদস্যের মত, তিনি এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকতে পারেন না। চৌধুরী বলেন, অবিশ্বাস করলে কী হবে, মোশতাকই ঘটনার নায়ক এবং রাষ্ট্রপতি। চৌধুরীর ভাষ্যমতে, এক জার্মান মহিলা মিশনে প্রবেশ করে বললেন, তোমরা কেমন জাতি, তোমাদের নেতাকে হত্যা করতে পার। রাষ্ট্রদূত হিসেবে পরিচয় দিতে তখন লজ্জা লাগছিল – এমনটিই বলেছেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

এরই মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার রহমান ফোন করে শেখ সাহেবের মেয়েদের খোঁজখবর নিলেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিলেন। ২৫ আগস্ট মোশতাক সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী টেলিফোনে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জানালেন যে, রাষ্ট্রপতি মোশতাক খুবই ক্ষিপ্ত – কেন আপনি হাসিনা-রেহানাদের আশ্রয় দিয়েছেন। প্লিজ, ঢাকায়  আসবেন না, আসলে বিপদ হবে। এর দুদিন পরই ওএসডি করা হয় চৌধুরীকে। তখন জার্মান বন্ধুরা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জার্মান সেক্রেটারি এইচ আর ডিঙ্গেলস বলেন, কোন চিন্তা নেই, আমরা আছি।

ইতিহাসের কী বিস্ময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সেই নির্বাসিত কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘসংগ্রামশেষে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করেন এবং ইতিপূর্বেই জাতিসংঘসহ বিশ্ববরেণ্য কুটনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য  হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে সপ্তম জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করেন। যদিও সংসদের মেয়াদ পূর্ণের মাত্র কদিন আগে বর্ষীয়ান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন।

লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও আহবায়ক- বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগআজ ২৩ মে এই বেইমান সানাউল হকে জন্মদিন–

মো. কামাল উদ্দিন।

এই বেঈমানকে বিশ্ব মানবতাবদী নেতা, মহাকালের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- শিক্ষাবীদ, কবি সাহিত্যিক লেখক হিসেবে, দেশ ও মানবপ্রীয় মানুষ মনে করে একজন অমানুষকে ১৯৭৩ সালের ১৫ মে বেলজিয়ামের বাংলাদেশের প্রথম রাষ্টদূত হিসেবে যাঁকে রাজনৈতিক বিবেচনায় স্নেহে করে নিয়োগ দিয়েছিলেন সেই বেঈমান১৫ ই আগস্টে ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর পর এই মানুষ নামের অমানুষটি অসহায় পুরো পরিবার হারানো দুই বোন শেখ

হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূতের বাসা থেকে বের করে দেওয়া এই সেই সানাউল হক!! আমি তার স্মৃতির প্রতি থুথু নিক্ষেপ করে আজ কিছু কথা লিখলাম। সানাউল হকের বাড়ী বার্মনবাড়িয়া, সেই সুবাদে সে বেঈমান খন্দকার মোশতাকের আনুগত্য স্বীকার করে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। চল্লিশ দশক হতে লেখা লেখি করে আসছে – লেখার ইতিহাস দেখলে মনে হবে সেই একজন মানবতাবাদী একজন সৃষ্টিশীল লেখক তার লেখাতে মানবিক বিবেচনা মূলক কথা উঠে আসলেও আসলে তার লেখা আর কথা এবং বাস্তবতার সাথে কিছুই মিল ছিলোনা সেই একজন ভন্ড লেখক ছিলেন। এই বেঈমানকে বিগত সময় অনেক পুরস্কার দিয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারিদেরকে সমথর্ন দেওয়া ও মিনিটের মধ্যে তার চরিত্র পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে আশ্রয় দেওয়ার পরিবর্তে রাস্তায় বাইর করে দেওয়ার সাহসী কসাই এর ভুমিকা পালন করার দরুন। তাকে ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রের সম্মানিত পুরস্কার একুশে পদক দেওয়ার হয়েছিল– আজকে তা মনে পড়লে তাতে মনে হয় “এই লজ্জা রাখি কোথায়” সেই বেঈমানের কথা সাথে তার বেঈমান উত্তরসুরী মীর জাফরের চেয়েও জঘন্য বেঈমান খন্দকার মোশতাকের কথা না কিছু না বল্লে হবেনা-

বঙ্গবন্ধুর বাবা মারা যাওয়ার পর পিতা হারানোর শোকে কাতর বঙ্গবন্ধুর সামনে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টির পরবর্তী ঝড়ের পানির মতন অশ্রু ফেলেছিলো যে ব্যাক্তি তার নাম খন্দকার মোশতাক।

আর সেই খন্দকার মোশতাককেই কিন্তু ইতিহাসে অনেকে মীরজাফরের সাথে তুলনা করে।

আসলে সেই তুলনা কতখানি গ্রহনযোগ্য?

আমার মনে হয় সেই তুলনা সম্পূর্ণ রুপে অগ্রহনযোগ্য কারন আলীবর্দী খা থেকে শুরু করে সিরাজউদ্দৌলা ও বেইমান হিসেবে মীরজাফর তারা কেউই তো বাঙ্গালী ছিলো না , এমনকি, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ এরা কেউ ই বাঙ্গালী ছিলেন না।

তবে কেনো বাঙ্গালী জাতির বেইমান হিসেবে মীরজাফরের নাম বলা হয়?

বাঙ্গালী জাতির গর্ব হিসেবে যদি বাংলার সন্তানদের নাম নেয়া হয় তবে বেইমান হিসেবে কেনো নিতে হবে কোন অবাঙ্গালের নাম?

খন্দকার মোশতাক নামটিই হয়ে উঠুক বাঙ্গালী জাতির চিরন্তন বেইমান প্রতীকী নাম হিসেবে।

পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের পর দিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যে বন্ধুরুপী বেইমান শত্রু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলো বিদেশী এম্বেসীগুলোর হাতে সেই খন্দকার মোশতাকের মতন বহুরূপী মনে হয় না তার আগে এই বাংলায় কেউ জন্মিয়েছিলো বলে।

শুধু একটাই ভয় হয় যে এই স্বাধীন বাংলায় মোশতাকের যে বংশধরেরাও আজো মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিয়ে বন্ধু বেশেই ঘুরে বেড়ায় আমাদেরই আশে পাশে তাদের আমরা চিনতে পারা যাবে তো?

জাতীয় বেইমান হিসেবে মীরজাফর নয় বরং মোশতাকের নাম বলা হোক সর্বত্র আর নিরাপদে থাক আমাদের বাংলাদেশ মোশতাকদের কু নিজের থেকে।যেই মোশতাক ১৪ আগস্ট রাতে তাঁর বাসা থেকে হাঁস রান্না করে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে শেষ খাওয়ার খাবাছেন এবং রাত ১৩ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসায় পাহারা দিয়ে সকালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যাকরেছিল যা এই কলংকিত ইতিহাস পৃথিবীর সবাই জানে। চলুন এই সানাউল হকের ভুমিকা কি ছিলো তা একটু শুনে আসি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনার পরই বদলে গেলেন রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক। সেদিন বেলজিয়াম দূতাবাসের বাসায় অবস্থান করছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ঘটনার পর তাঁদেরকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন এই রাষ্ট্রদূত।তখন জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (পরে স্পিকার) টেলিফোনে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নিরাপত্তা দিতে অনুরোধ করলেও সানাউল হক তা প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি শেষ মুহূর্তে হুমায়ুর রশীদ চৌধুরী জার্মানির সীমান্ত পর্যন্ত শেখ হাসিনার পরিবারকে নিরাপদে দূতাবাসের গাড়ি দিয়ে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করলেও সানাউল হক তাতেও রাজি হননি। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পরবর্তীতে তার এক সাক্ষাৎকারে এ সম্পর্কে বলেছেন, সানাউল হক অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘আমাকে কেন এসব ঝামেলায় জড়াচ্ছেন? আমি এসব জটিলতায় পড়তে চাই না।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন ঢাকায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া এর আগে একটি গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে পড়তে গিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গেই জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনা ও তার দুই সন্তান জয় ও পুতুল। আগস্টে ওয়াজেদ মিয়া কয়েকদিনের ছুটি পান।

এদিকে শেখ রেহানা ৩০ জুলাই বেড়াতে যান শেখ হাসিনার কাছে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫ আগস্ট ওয়াজেদ মিয়া সবাইকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য বেলজিয়াম বেড়াতে যান। এ বিষয়ে বিভিন্ন বই ও সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, ১৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনা ও তার পরিবার বেলজিয়াম বেড়াতে যান তখন সানাউল হক ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। তার বাসায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ওইদিন রাত তিনটা পর্যন্ত সানাউল হকের স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে আড্ডা চলে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার। শেখ রেহানা তার এক স্মৃতিচারণে এ সম্পর্কে বলেন, রাত তিনটা পর্যন্ত সানাউল হকের মেয়ে ও অন্যদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন আর জোরে জোরে হাসছিলেন শেখ রেহানা। এসময় ওয়াজেদ মিয়া বারবার এসে আস্তে হাসার জন্য বলেন। রাত তিনটার দিকে এসে ওয়াজেদ মিয়া শেখ রেহানাকে বলেন, এত হাসাহাসি করা ভালো না

বেশি হাসলে সারাজীবন কাঁদতে হয়। সেদিন সানাউল হক তাদের কিছুদিন বেলজিয়ামে তার বাড়িতে থাকার জোর অনুরোধও করেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যান এই রাষ্ট্রদূত।

জানা গেছে, সানাউল হককে খুব স্নেহ করতেন বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও তাকে রাষ্ট্রদূত করেছিলেন। হুমায়ুর রশীদ চৌধুরী তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন, সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর সবার আগে পৌঁছেছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ওয়াশিংটন সময় বিকেল ৩টা। লন্ডনে তখন রাত ১২টা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর দেশের বাইরে যেসব বাংলাদেশি কূটনীতিক পান তাদের মধ্যে লন্ডন মিশনের কূটনীতিকরা অন্যতম। লন্ডন মিশনের খবর পেয়ে ফারুক চৌধুরী খুব ভোরে এই দুঃসংবাদটি জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জানান। তার ধারণা ছিল- ড. ওয়াজেদ মিয়া তার পরিবার নিয়ে এ সময় জার্মানিতে অবস্থান করছেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী খবর পেয়ে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সানাউল হককে ফোন করেন এবং ফারুক চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া সংবাদ তাকে জানান এবং শেখ হাসিনা ও অন্যদের জার্মানির সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী লিখেছেন, সানাউল হক তাতে রাজি হলেন না। তিনি আরও লিখেছেন, সানাউল হকের কথায় মনে হচ্ছিল- তিনি শেখ

হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের পারলে তখনই বাড়ি থেকে বের করে দেন। সেই সানাউল হক পরবর্তীকালে ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। চল্লিশের দশকের একজন খ্যাতিমান কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন সানাউল হক। ১৯২৪ সালের ২৩ মে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার চাউরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার প্রকৃত নাম আল মামুন সানাউল হক। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অন্নদা স্কুল থেকে ম্যাট্টিক (১৯৩৯), ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ (১৯৪১) এবং ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স (অর্থনীতি) ও ১৯৪৫ সালে এমএ পাস করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে আইনবিদ্যালয় বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৬ সালের ২৯ নভেম্বর সানাউল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন এবং ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। এরপরই তিনি সরকারি চাকরি শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর , ১৯৭৩ সালের ১৫ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বেলজিয়ামে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনার সময় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা , হাসিনার স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়া এবং তাদের সন্তানরা ব্রাসেলসে হকের বাসায় অতিথি হিসেবে অবস্থান করছিলেন । ১২ আগস্ট, তারা বন থেকে হকের বাসায় পৌঁছেছিলেন এবং ১৪ তারিখে একটি মোমবাতি আলো ডিনারে যোগ দেন।  ১৫ তারিখে রহমানের মৃত্যুর খবর শুনে হক পশ্চিম জার্মানিতে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীকে ফোন করেন এবং অতিথিদের অবিলম্বে জার্মানিতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।  অবশেষে, অতিথিদের ব্রাসেলস থেকে বেলজিয়াম -জার্মান সীমান্তের

কাছে নিয়ে যাওয়া হয় । এরপর চৌধুরী হাসিনা ও পরিবারকে কোনিগসউইন্টারে তার বাসভবনে নিয়ে আসার জন্য আচেনে দুটি গাড়ি পাঠান । হক ১৯৭৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হকের দুই ছেলে ইরতেফা মামুন ও সুমন ইফাত মামুন এবং তিন মেয়ে তাসনিম জাফরুল্লাহ, ত্রিনা রুবাইয়া মামুন ও সাইদা হুসাইনী মামুন।  ২০২৩ সালের এপ্রিলে, ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত গুলশানের একটি সম্পত্তি বিক্রির সাথে সম্পর্কিত প্রতারণার অভিযোগে পরিবারের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন । ১৯৬০-এর দশকে মুহাম্মদ আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে হকের ধানমন্ডি ও গুলশানে জমি সম্পত্তি ছিল । আদালতের সন্দেহ, বাবার পরিচয় প্রকাশ না করে আদালতকে প্রতারণা করেছে পরিবার। অন্য দিকে তখন জার্মানির রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্বরত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর ভুমিকা কি ছিলো তা একটু দেখার দরকার- এতক্ষণ আমরা অমানুষ সানাউল হকের অমনুষ্যত্ব আচরণের কথা শুনলাম এখন একজন খাঁটি মানুষের কথা তুলে ধরবো-রাষ্ট্রদূত সানাউল হক দেন তাড়িয়েদেন, তখন শেখ হাসিনা-রেহানাকে আশ্রয় দিয়ে ওএসডি হন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী,তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনে শেখ হাসিনা-রেহানাকে নিজের সরকারি বাসা থেকে কিভাবে তাড়াবেন, সে চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, বেলজিয়ামস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক। আর ঠিক তখনি ব্যতিক্রমী এক মানবিক চরিত্রে রূপদান করেছিলেন পশ্চিম জার্মানীস্থ বাংলাদেশেরই রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয়কে তাঁর সরকারি বাসায় আশ্রয় দিতে যেন এক মরণপণ তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি সফলও হয়েছিলেন, বেলজিয়াম থেকে বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যাকে পশ্চিম জার্মানিতে নিয়ে এসে নিজের সরকারি বাসাতেই উঠালেন। এমনকি  তাদের জানে বাঁচানোর জন্য ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়লাভেরও সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে তিনি ওএসডি হন। এরকম শাস্তি যে, অপেক্ষা করছিল, তা তিনি জানতেন। পুরো লেখাটির পরোতে পরোতে সে কথাই ফুটে উঠেছে। পনের আগস্ট ভোরবেলা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাসার টেলিফোন ক্রিংক্রিং শব্দে বেজে উঠল। ঘুম হতে জেগে উঠলেন মিঃ চৌধুরী, (পশ্চিম জার্মানীস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত)- রিসিভার কানে তুলে নিলেন। ওমনি ওপাস থেকে তাঁর কর্ণগোচরিত হল,  একটি ভারাক্রান্ত কন্ঠে- স্যার, আমি ফারুক আহমেদ চৌধুরী বলছি, লন্ডন থেকে (লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার)- খবর শুনেছেন স্যার? ঢাকার খবর। কী হয়েছে ঢাকার আবার? হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর প্রশ্ন।

স্যার, ঢাকায় অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। শেখ সাহেবের ভাগ্যে কী ঘটেছে, এখনও অনিশ্চিত স্যার। বলো কী? স্যার সম্ভবত শেখ সাহেব মারা গেছেন। ফোন রেখে স্তম্ভিত রাষ্ট্রদূত স্ত্রী মাহজাবিনকে ডেকে বললেন। কিন্তু মাহজাবিন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এমনকি রাষ্ট্রদূত নিজেও না।

 

তারপরও বিচলিত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ব্রাসেলসে ফোন করলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হককে। জানতে চাইলেন, ঢাকার খবর কী? নীরব রাষ্ট্রদূত – কথা বলছেন না। রিসিভার রেখে দিলেন ফোনের ওপর।

দিকবিদিকশুন্য রাষ্ট্রদূত আবার ফোন করলেন সানাউল হককে। বললেন হাসিনা এবং রেহানাকে যেন কিছু না জানানো হয়। তাদের যে কোন সাহায্য করতে তিনি তাঁর মানসিক প্রস্তুতির কথাও জানিয়ে দিলেন। চৌধুরী ফোন রেখে এবার রেডিও অন করলেন। বিবিসি অভ্যুত্থান হওয়ার খবর প্রচার করলেও সূত্রটিকে বলছিল অসমর্থিত।

 

চৌধুরীর স্মৃতিপটে ভেসে উঠল শেখ সাহেবের তাকে বলা কিছু কথা। শেখ সাহেব কী তাঁর মৃত্যুর আগাম বার্তা পেয়ে গিয়েই বলেছিলেন, ঘটনাবলী ভাল যাচ্ছে না?

 

কয়েকঘন্টা পর ব্রাসেলস থেকে রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের ফোন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী কথার হাবভাব শুনে বুঝতে পারলেন এবং মনে হল, সানাউল হক খুব অস্থির, হাসিনা-রেহানাকে নিয়ে যেন খুব ঝামেলায় আছেন। ওদের তাড়িয়ে দিলেন বাঁচেন।

বললেন, জানো হুমায়ুন, প্যারিস থেকে আবুল ফতেহ গাড়ি পাঠায়নি। কথা ছিল গাড়ি পাঠাবে, ওদের নিয়ে যাবে। কিন্তু ফতেহর বাসায় কেউ টেলিফোন ধরছে না।

এবার প্যারিসে শফি সামিকে ফোন করলেন চৌধুরী। তখন তিনি অসুস্থ, হাসপাতালে। শফিকে বললেন, রাষ্ট্রদূত ফতেহকে পাওয়া যাচ্ছে না। শেখ সাহেবের মেয়েদের প্যারিসে যাওয়ার কথা। ওরা যদি যায় তাহলে, ওদেরকে দেখ। শফি সামি বললেন, ঠিকআছে আমার বাড়িতে রাখব। শফি সামির স্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আবারও চৌধুরী ব্রাসেলসে সানাউল হককে ফোন করে বলেন, শেখ সাহেবের দুই কন্যাকে গাড়ি দিয়ে অন্তত জার্মান সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেন। সানাউল হক রাজি হলেন না। চৌধুরী বিস্মিত হয়ে সানাউল হককে বলেন, কী বলছেন আপনি, এতটুকু মমত্ববোধ নেই? আপনাকে তো শেখ সাহেব খুব স্নেহ করতেন, অনেকের অমতে আপনাকে রাষ্ট্রদূতও বানিয়েছেন। সামান্যতম কৃতজ্ঞতাবোধও তো থাকা উচিত। চৌধুরী ক্ষুব্ধ হন সানাউল হকের আচরণে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, এই ভদ্রলোক বঙ্গবন্ধুর মেয়েদের গাড়ি দিতে রাজি হননি, তো বাড়িতে ঠাঁই দেয়া তো দূরের কথা। যাহোক সানাউল হককে টেলিফোনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জানিয়ে দেন যে, ওরা আমার জার্মানির বাড়িতে আসবে। আমি তাদের আশ্রয় দেব। আমি অকৃতজ্ঞ নই। আমার চাকুরির কোন মায়া নেই। মানবতা আমার কাছে মুখ্য। আমার বাবা-মা মানুষের সেবা করতে শিখিয়েছেন। বলেছেন, মানুষের বিপদেআপদে যেন ছুটে যাই। সত্যিই পরিণতি কী হবে জেনেও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের জার্মানিতে নিয়ে যান। ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তারা পৌঁছল। ওদিনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.  কামাল হোসেনের জার্মানিতে

পৌঁছার কথা। সঙ্গে পররাষ্ট্র দফতরের মহাপরিচালক রেজাউল করিমেরও। বেলগ্রেডে অবস্থানরত ড. কামাল তখনও ঢাকার খবর জানেন না। চৌধুরীর ভাষ্যমতে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের আগেই ড. কামাল জার্মানিতে পৌঁছে গেছেন এবং সবকিছু জানতে পেরে খুবই অস্থির কথা বলতে পারছিলেন না। শেখ সাহেবের মেয়েরা যখন আমার বাসায় পৌঁছল তখন কী দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়- চৌধুরীর ভাষ্যমতে, জীবনে অনেক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। এমন হইনি কখনও। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। হিমশীতল পরিবেশ। কান্নায় বাড়ির নিস্তব্ধতা কেটে গেল।

চৌধুরী ঢাকায় ফোন করছেন কিন্তু কাজ করছে না। ঢাকার সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এর মধ্যে হাসিনা-রেহানা চৌধুরীর বাসার রেডিও মারফত সব জেনে গেছেন। সয়ং শেখ হাসিনা কেঁদে কেঁদে চৌধুরীকে বলেন, বাবার সঙ্গে কামাল-জামালও চলে গেছে। এখন আমার মা, রাসেল ও চাচাকে আমাদের কাছে এনে দিন।

রাত তখন দশটা। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জানতেন বেগম মুজিবও নেই। তবুও তিনি দুই কন্যাকে বললেন, ঠিক আছে তাই হবে, আমি দেখছি, কী করা যায়। এর কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই জানাজানি হয়ে গেল যে, বেগম মুজিবও মারা গেছেন। শেখ হাসিনার অনুরোধে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ঢাকায় টেলিগ্রাম পাঠালেন, শেখ রাসেলকে যেন জার্মানিতে পাঠানো হয়। তখনও সবার ধারণা ছিল শিশু রাসেল বেঁচে আছে। ঢাকার পররাষ্ট্র দফতর থেকে কোন জবাব এল না।

ৃহুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সেদেশের সরকারের সানুগ্রহ  কামনা করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে খুশি হয়ে প্রতিত্তোরে বললো, মিঃ চৌধুরী, আমরা আপনার সাহসী ভুমিকাকে উৎসাহিত করছি তবে নিজে যে কোনোপ্রকার ঝামেলায় পড়া থেকে সর্তক থাকবেন।

জার্মান সরকার কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন চৌধুরীর বাসভবনে। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা জানতে চাইলো হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর কাছে – কে এই ঘটনার নায়ক?  চৌধুরী বলেন, খন্দকার মোশতাক। বিশ্বাস করতে পারছিলেন শেখ হাসিনা। আব্বার সঙ্গে চাচা কতো ঘনিষ্ঠ, পরিবারের সদস্যের মত, তিনি এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকতে পারেন না। চৌধুরী বলেন, অবিশ্বাস করলে কী হবে, মোশতাকই ঘটনার নায়ক এবং রাষ্ট্রপতি। চৌধুরীর ভাষ্যমতে, এক জার্মান মহিলা মিশনে প্রবেশ করে বললেন, তোমরা কেমন জাতি, তোমাদের নেতাকে হত্যা করতে পার। রাষ্ট্রদূত হিসেবে পরিচয় দিতে তখন লজ্জা লাগছিল – এমনটিই বলেছেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

এরই মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার রহমান ফোন করে শেখ সাহেবের মেয়েদের খোঁজখবর নিলেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিলেন। ২৫ আগস্ট মোশতাক সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী টেলিফোনে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জানালেন যে, রাষ্ট্রপতি মোশতাক খুবই ক্ষিপ্ত – কেন আপনি হাসিনা-রেহানাদের আশ্রয় দিয়েছেন। প্লিজ, ঢাকায়  আসবেন না, আসলে বিপদ হবে। এর দুদিন পরই ওএসডি করা হয় চৌধুরীকে। তখন জার্মান বন্ধুরা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে জার্মান সেক্রেটারি এইচ আর ডিঙ্গেলস বলেন, কোন চিন্তা নেই, আমরা আছি।

ইতিহাসের কী বিস্ময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সেই নির্বাসিত কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘসংগ্রামশেষে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করেন এবং ইতিপূর্বেই জাতিসংঘসহ বিশ্ববরেণ্য কুটনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য  হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে সপ্তম জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করেন। যদিও সংসদের মেয়াদ পূর্ণের মাত্র কদিন আগে বর্ষীয়ান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন।

লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও আহবায়ক- বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ চট্টগ্রাম মহানগর আহবায়ক কমিটি। চট্টগ্রাম মহানগর আহবায়ক কমিটি।

[recent_tabs]