
মো. কামাল- উদ্দিন।
বাংলাদেশসেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে, আজকের এই ক্লান্তিকর সময়ে আমাদের সেনাবাহিনী যেভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে, তাতে দেশের মানুষ আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। আমি সেই আশার আলোই দেখতে দেখতে এই লেখাটি লিখতে বসলাম।
লেখার শুরুতেই আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। পুলিশের অনুপস্থিতিতে সারাদেশে যেভাবে দুর্বৃত্তরা তাণ্ডব চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তা কঠোর হাতে দমন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। আমি দৃঢ় বিশ্বাস করি, আমাদের সেনাবাহিনী এই পরিস্থিতি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
চলুন, আমাদের সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস এবং দেশ সেবার মহান ভূমিকা সম্পর্কে কিছু কথা শোনা যাক। সেনাবাহিনী হলো একটি জাতির সাহসিকতার, নিবেদনের এবং অমর আত্মত্যাগের প্রতীক। তার ইতিহাস কেবল গৌরবময় নয়, বরং আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবেও এক অনন্য ভূমিকা পালন করে এসেছে।
প্রাচীন কাল থেকেই সেনাবাহিনী দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ও শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাসের পাতায়, সেনাবাহিনীর অজস্র সাফল্য ও মহান অর্জন আমাদের গর্বিত করেছে। এদের নিরলস প্রচেষ্টা ও অমর আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা।
বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংঘাতময় পরিস্থিতি পর্যন্ত, সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের অদম্য সাহস ও কর্তব্যপরায়ণতা দিয়ে জাতিকে রক্ষা করেছেন। তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা করার দৃঢ় অঙ্গীকারই তাদের সম্মানের প্রমাণ সেনাবাহিনীর মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসও অটুট। সাধারণ মানুষের কাছে সেনাবাহিনী মানে নির্ভরযোগ্যতা, সততা এবং দেশপ্রেম। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের জীবন দিয়ে যে ধরনের সেবা প্রদান করেন, তা আমাদের দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
যতই প্রযুক্তির উন্নতি হোক, সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ—যেমন কর্তব্যনিষ্ঠা, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ—অবিচলিত থাকে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে সেনাবাহিনী জাতির মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সদা প্রস্তুত।
অতএব, সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস ও তাদের প্রতি মানুষের অটুট আস্থা আমাদের জন্য এক অনন্য প্রেরণা। এদের অসামান্য সেবা ও আত্মত্যাগ আমাদের জাতির চেতনা ও অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করে তোলে।
জাতীয় উন্নয়নে সেনাবাহিনীর অগ্রসর ভূমিকা অবদান জাতির পরম আস্থা ও ভালবাসার প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠার সঙ্গে দেশ গঠনেও রেখে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা। দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে নক্ষত্রের উজ্জ্বলতায় ভাস্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশপ্রেমের সুর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের অন্তরে ধ্বনিত হচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্মে; সেই জন্মলগ্ন থেকে।
‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’ এই মূলমন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সেবামূলক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ দক্ষ, অভিজ্ঞ, সুশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও আদর্শ একটি বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রায় অবদান রাখার জন্য সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেনাবাহিনীর ওপর অর্পিত জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পসমূহের নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে কর্মসম্পাদনের প্রতিটি পর্যায়ে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, পেশাদারিত্ব, সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে থাকে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে যথাযথ তদারকির ফলে সেনাবাহিনীর ওপর অর্পিত প্রকল্পসমূহ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সর্বদা প্রাক্কলিত সময়ের পূর্বেই বাস্তবায়িত হয়। তাছাড়া সকল প্রকার কাজের গুণগত ও কারিগরী মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সেনা সদস্যরা বিন্দুমাত্র আপস করেন না। বরাদ্দকৃত বাজেটের মাধ্যমে প্রকল্প সম্পন্ন করার বিষয়ে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন তারা। এসব কারণে দেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পসমূহে সেনা সদস্যদের সম্পৃক্ততার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় সিএমএইচ ঢাকা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের ফলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসাক্ষেত্র প্রসারিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ (এএফএমসি) এবং ২০১৪ সালে পাঁচটি সেনানিবাসে মেডিকেল কলেজ (বগুড়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর ও রংপুর) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তথা সার্বিকভাবে বাংলাদেশে সেবিকাদের ঘাটতির বিষয় বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পাঁচটি আর্মি নার্সিং কলেজ (বগুড়া, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, যশোর ও রংপুর) প্রতিষ্ঠা করার প্রশাসনিক অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে দুইটি আর্মি নার্সিং কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের পর্যায়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে সরকারের নির্দেশনায় ১৯৯৮ সালে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রক্ষা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং আধুনিক জ্ঞান চর্চার জন্য ২০১৩ সালে মিরপুর সেনানিবাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)। এছাড়াও কারিগরী বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র ও ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে শিক্ষা প্রসারিত করার লক্ষ্যে কুমিল্লা, সৈয়দপুর ও কাদিরাবাদ সেনানিবাসে তিনটি আর্মি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (BAUST) এবং সাভার ও সিলেট সেনানিবাসে আর্মি ইন্সটিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (AIBA) নামে দুইটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত ১২টি ক্যাডেট কলেজ, ৪৪টি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ এবং ১৯টি ইংলিশ মিডিয়াম-ভার্সনসহ সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্কুল-কলেজসমূহ শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উন্নত পরিবেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা পেতে সক্ষম হচ্ছে। সেনা পরিবার কল্যাণ সমিতির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে প্রয়াস স্কুল প্রতিষ্ঠা একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে দেশে এবং বিদেশে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে।
বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে বহুল প্রতিক্ষিত পদ্মা বহুমুখী সেতু। পদ্মা সেতু নির্মাণ চলাকালীন সময়ে নদী শাসন ও নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি সেনাবাহিনী জাজিরা ও মাওয়া এপ্রোচ রোড নির্মাণ এবং ব্রিজ অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ সার্ভিস এরিয়ার কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছে। দেশের এ আইকনিক মেগা প্রকল্প বস্তবায়নে সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেনা সদস্যরা দেশবাসী তথা বাংলাদেশ সরকারের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। বর্তমানে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের জন্য সুপারভিশন পরামর্শক হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে সেনাবাহিনী। পদ্মা সেতুর উভয় পাড়ে হাইটেক পার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও দারিদ্র নিরসনের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এ সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক বাস্তবায়ন করা হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডের আরও একটি উদাহরণ। ঢাকা ও তার আশেপাশের সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়নে ও যানজট নিরসনে হাতিরঝিল ইউলুপ, ঢাকা শহরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সিফটিংয়ের কাজ, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ ৪ লেন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, মিরপুর এয়ারপোর্ট রোডে ফ্লাইওভার, বনানী রেলক্রসিংয়ে ওভারপাস নির্মাণ, ধানমন্ডি লেক উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প ও রায়ের বাজার কবরস্থানের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করেছে সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মহিপাল ফ্লাইওভারটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপর নির্মাণের মাধ্যমে সহজে ও স্বল্প সময়ে যাতায়াত নিশ্চিত করেছে। অত্যন্ত স্বল্পতম সময়ে মেঘনা-গোমতী ব্রিজের মেরামত কাজ সম্পন্ন করে সেনা সদস্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় মুক্তারপুর সেতু সংযোগ সড়কে পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুরে অবস্থিত দুটি সেতুর বিকল্প সড়ক নির্মাণ, সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ কাজ করেছে। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারটিও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বাধিক উচ্চতা বিশিষ্ট সড়ক খানচী-আলীকদম সড়ক, চিম্বুক-থানচি সড়ক, বাঙ্গালহালিয়া-রাজস্থলী সড়ক, বান্দরবান-বাঙ্গালহালিয়া-চন্দ্রঘোনা-ঘাগড়া সড়ক, খাগড়াছড়ি-দিঘীনালা-বাঘাইহাট সড়ক, দিঘীনালা-ছোটমেরণ-চঙ্গরাছড়ি-লংগদু সড়ক, বাঘাইছড়ি-মাসালং-সাজেক সড়ক ও দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়ক সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মাণ করার কারণে পাহাড়ি জনপদে এসেছে উন্নয়ন ও প্রাণের স্পন্দন। সেখানে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, বন্দর-ঘাট উন্নত হয়েছে, বাজার অর্থনীতি ও বিপণন সফলতার মুখ দেখেছে, স্বাস্থ্য সেবায় সূচক উন্নত হয়েছে, চাষাবাদ বেড়েছে, জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে বৈচিত্র। কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার কমেছে পাহাড়ি জনপদে।
সামাজিক সব সূচকেই ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি পাহাড়ি জনপদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে পার্বত্য জেলাসমূহের সীমান্ত বরাবর দূর্গম সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তাবাহিনীর চলাচল সহজ ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চলে ১০৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক নির্মাণ উন্নয়ন প্রকল্পটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে পার্বত্য জেলাগুলোর সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এর পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পটি ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্পসহ হাজারো প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন সম্পন্ন করেছে। এর ফলে সেনাবাহিনী অর্জন করেছে জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর আস্থা।
২০১৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব প্রদান করে। সেনা সদস্যরা দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে নগরবাসী মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট যানজট হ্রাস পাবে ও বাড়বে বিদেশি বিনিয়োগ। এতে করে পর্যটন শিল্পের বিকাশসহ চট্টগ্রাম শহরের সার্বিক উন্নয়ন ঘটবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতিগঠন মূলক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ দেশের উন্নয়নে অগ্রগামী ভূমিকা রাখারই উদাহরণ।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বে এক আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত অঞ্চলে আর্তমানবতার সেবায় জানমাল রক্ষার জন্যে সেনাবাহিনী যে আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তা দেশবাসীর কাছে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি রোধকল্পে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যায় আটকে পড়া অসংখ্য ব্যক্তিকে উদ্ধার, তাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সেখানে বাঁধ নির্মাণে সহায়তা করে আরও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সেনাবাহিনী।
বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম অনেক দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের ভয়াবহ সুনামি ও ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা সে দেশে জরুরি সহায়তা প্রদানসহ শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মায়ানমার, চীন, মিশর, মালদ্বীপ ও হাইতিতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দক্ষতার সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলা করে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে ফিরেছে স্থায়ী শান্তি। দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকে রুখে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ‘অপারেশন উত্তরণে’র আওতায় মোতায়েন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার পাশাপাশি নানা ধরনের জনকল্যাণমূলক (রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট তৈরি, শিক্ষা বিস্তার ও স্বাস্থ্যসেবা) কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থেকে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়তা করছে।
গত জুন ২০১৭ সালে পাহাড় ধসে পার্বত্য ৩ জেলার যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সেনাবাহিনী কঠোর পরিশ্রম করে যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে অভিযান, পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার, পানি ওচিকিৎসা সেবা প্রদান করে জনগণের সেবায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করে জাতীয় পরিমণ্ডলে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
মায়ানমার হতে আগত রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের দায়িত্ব গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। এর পাশাপাশি তাদের কক্সবাজারে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা ও চিকিৎসাসেবাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করেছে। দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সবার হৃদয়ে স্থান করে নিয়ে দেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে সেনাবাহিনী। দেশের ক্রান্তিলগ্নে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ ও ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’- এর মাধ্যমে জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে যে কোনো জাতীয় সমস্যা মোকাবিলায় সেনাবাহিনী আপামর জনসাধারণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে সুপরিচিতি পেয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র তথা ভোটার আইডি কার্ড, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) এবং মেশিন রিডেবল ভিসা (এমআরভি) তৈরির ব্যাপারে সরকারের গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সেনাবাহিনী অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পালন করছে। আশ্রয়ণ প্রকল্প হচ্ছে সরকারের অন্যতম দারিদ্র বিমোচন ও পুনর্বাসন প্রকল্প। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদাতিক ডিভিশনকে ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন জনগোষ্ঠীর আবাসনের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক অর্থ বছরগুলোতে ব্যারাক নির্মাণের প্রকল্প দেওয়া হয়। এ আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ব্যারাক হাউজ নির্মাণ সম্পন্ন করে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করায় জাতীয় পরিমগুলে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের লোকসানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) ২০০০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট (বিডিপি) সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে আজ পৃথিবীর অনেক দেশে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। আন্তর্জাতিক শান্তি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের আত্মত্যাগ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে সম্মান ও গৌরব। শান্তিরক্ষা মিশনে অর্পিত দায়িত্ব দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে তারা বিশ্ব সমাজে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বলতর করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম। দেশ মাতৃকার বিরুদ্ধে যে কোনো অপচেষ্টা নস্যাৎ করে উত্তরোত্তর উন্নতিকল্পে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় শপথে অঙ্গীকারাবদ্ধ সেনাবাহিনী সদা প্রস্তুত। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সরকারের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পসমূহে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে সেনাবাহিনী। এর মাধ্যমে ইতোমধ্যেই সরকার এবং আপামর জনসাধারণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশের সকল স্তরের মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীর জন্য আছে দৃঢ় বিশ্বাস, ভরসা আর ভালবাসা। এ অর্জন সত্যিই অতুলনীয়। দেশের সার্বিক উন্নয়নের অংশীদার হতে পেরে সেনা সদস্যরা গর্বিত ও আনন্দিত।
দেশ-বিদেশে সেনাবাহিনীর অর্জিত প্রশংসা ও বর্তমান দায়িত্ব সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস দেশের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় একটি মাইল ফলক হিসেবে কাজ করেছে। অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ও শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের অসাধারণ দক্ষতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে সেনাবাহিনী বিশ্ব জুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। এসব অর্জন আমাদের জাতীয় গর্বের প্রতীক এবং আমাদের সেনাবাহিনীর অমিত সম্ভাবনার সাক্ষ্য।
এই দুঃসময়ে, যখন দেশ নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, সেনাবাহিনীর অর্জিত প্রশংসা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি যেন আমাদের দায়িত্ব পালনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তাদের অভিজ্ঞতাপ্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রাপ্ত সম্মান আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
দেশের সুরক্ষা, স্থিতিশীলতা এবং জনগণের শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা আমাদের জাতির উন্নয়নে সাহায্য করবে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা, যারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাফল্যের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে, তারা এই মুহূর্তে দেশের প্রয়োজনীয়তায় সদা প্রস্তুত। তাদের অমিত সাহস ও নিষ্ঠা দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অবদান রাখতে পারে।
সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক প্রশংসা এবং তাদের গর্বময় ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, তাদের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা দেশের অগ্রগতি ও সুরক্ষায় এক নতুন দিগন্ত

