
মির্জা গালিব বলেছেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মিথ্যা কথা বলা হয় আদালতে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংবিধানের শপথ নিয়ে মন্ত্রীরা সংসদে বসে মিথ্যা কথা বলেন। সেই সেরা মিথ্যাবাজের তালিকায় মানসিক প্রতিবন্ধী মিথ্যারাজ হিসেবে খ্যাত ওবায়দুল কাদের এবং ড. হাসান মাহমুদ। তবে, ওবায়দুল কাদেরের চেয়ে হাসান মাহমুদের দুটি ডিগ্রি বেশি ছিল—একটি হলো শিক্ষার উপর ডক্টরেট আর একটি হলো বেয়াদবির। সেই বিশ্ব বেয়াদবের ইতিহাসের পাতায় অন্যান্য বেয়াদবদের হারিয়ে তিনি এগিয়ে আছেন, যা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেত্রী সাজেদা চৌধুরী ড. হাছান মাহমুদকে প্রকাশ্যেই শ্রেষ্ঠ বেয়াদব বলেছিলেন। ‘বেয়াদবির একটা সীমা থাকা উচিত। ওর (হাছান মাহমুদ) মতো বেয়াদব আমি আর দেখি নাই।বিশ্বের স্মরণকালের সেই একজন শ্রেষ্ঠ বেয়াদব।” একজন সেরা বেয়াদবের কথা লিখতে গেলে বেয়াদবদের ইতিহাস শোনারও প্রয়োজন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী প্রতিযোগিতা ইংল্যান্ডের কুম্ব্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগীরা এখানে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যা বলার জন্য পাঁচ মিনিট সময় পান। প্রতিযোগিতার নিয়ম প্রপস বা স্ক্রিপ্ট ব্যবহারে বাধা দেয়। রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবীদের প্রতিযোগিতায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না, কারণ “তারা শুয়োরের বাচ্চা বলার ক্ষেত্রে খুব দক্ষ বলে বিবেচিত হয়।” ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাব্রি ক্রুগারকে কিভাবে ওয়াসডেল উপত্যকার রাজার মুকুট দেওয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে একটি গল্প বলার পরে তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী হিসেবে মনোনীত করা হয়। এখন যদি সেই সেরা পুরস্কার দেওয়া হয়, তাহলে হাসান মাহমুদ তা পাবেন—এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত। মিথ্যা কথার অলরাউন্ডার হিসেবে তিনি বিশ্বের সেরা বেয়াদব। আমাদের চট্টগ্রামের কুসন্তান ড. হাসান মাহমুদের মিথ্যা কথা শুনতে শুনতে শেখ হাসিনা নিজেই ধ্বংস হয়েছেন, দেশ এবং জাতিকেও সর্বনাশ করেছেন। জাতি এবং দেশকে আজ বিপদের মুখোমুখি করে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন।
আমার খুবই কষ্ট হয় এবং দুঃখ লাগে যখন মহাকালের মহানায়ক বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। আমি হতাশ হয়েছি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য ভাঙচুর এবং অপমানের দৃশ্য দেখে। তা দেখে বলি, হায়রে বাঙালি, জাতির জনকের মর্যাদা আজ আমরা রাস্তায় পদদলিত করছি! ছিঃ, এই লজ্জা রাখি কোথায়! ইতিহাসের রাজপুত্র আজ রাজবন্দিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে একদিন ইতিহাসের কাছে ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেবে। এর জন্য একমাত্র দায়ী তারই অযোগ্য অনভিজ্ঞতার অভাবের কারণে যিনি দেশ এবং জাতিকে সমুদ্রের ভাসিয়ে দিয়েছেন—সেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা! আমাকে মাপ করবেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই সত্য কথাটি আমার ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে উপস্থাপন করছি। প্রতিটি মানুষের মনকে প্রশান্তি দেওয়ার জন্য একেক জন একেকভাবে এক ধরনের মানসিক খোরাক আহরণ করেন। কেউ পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও আল্লাহর নবীর শানে দরুদ শুনেন, কেউ শুনেন রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীত, আবার কেউ কেউ বাংলা আধুনিক গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যান। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনকে প্রশান্ত রাখার জন্য এই বিশ্ব বেয়াদব হাসান মাহমুদ ও মানসিক প্রতিবন্ধী ওবায়দুল কাদেরের মুখ থেকে প্রতিদিন খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া, জামাত ইসলাম, এবং জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কথা শুনতেন। কথায় কথায় ‘রাজাকার’ শব্দ শুনে তার দিন শুরু হতো, রাতে শব্দের টনিক পান করতে করতে ঘুমোতেন। এভাবেই তিনি এক ধরনের মিথ্যা কথা শোনার রোগী পরিণত হয়েছেন, যার ফলশ্রুতিতে আজ তার এই পরিণতি। হাসান মাহমুদ জানতেন শেখ হাসিনার কি রোগে ভুগছেন, কারণ তিনিই তো শেখ হাসিনার এপিএস ছিলেন। শেখ হাসিনার মানসিক রোগের ওষুধ কি, তা হাসান মাহমুদ জানতেন। তাই সেই ওষুধের ডোজ দিয়ে এপিএস থেকে এমপি হওয়া এবং বার বার মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে তিনি মিথ্যাবাদী এবং বড়মাপের তোষামোদকারী চাটুকারিতার জন্যও পুরস্কার পাবেন। হাসান মাহমুদ মিথ্যাবাদী এবং বেয়াদবির পাশাপাশি একজন বড় মাপের ভিলেন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। হাসান মাহমুদ এমন কোনো ধরনের অন্যায় কাজ নেই যা তিনি করেননি। তার বাবা অ্যাডভোকেট নুরুছাপা তালুকদার বিগত সময়ের বিএনপি সরকারের অধীনে রাজনৈতিক বিবেচনায় জেলা পিপি ছিলেন। তিনি জীবিত থাকতে কখনো নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেননি, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর হাসান মাহমুদ তাকে রাতারাতি মুক্তি যোদ্ধা বানিয়ে ২০২২ সালে গেজেট প্রকাশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যা একটি জঘন্য মিথ্যা কাজ। আমার মনে হয় নুরুছাপা তালুকদার বেঁচে থাকলে তিনি নিজেই লজ্জাবোধ করতেন।
হাসান মাহমুদের সৎ মা অ্যাডভোকেট কামরুন্নাহারকে নিয়ে তার বাবা জামাল খান হেম সেন লেইনের একটি জরাজীর্ণ বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় বছরের পর বছর ভাড়া থাকতেন। তাদের শহরে কোনো ধরনের জায়গা ছিলো না। হাসান মাহমুদ শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এখন হাজারো কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, তা কিন্তু শেখ হাসিনার আশীর্বাদ। তাঁর সৎ মা কামরুন্নাহার আমাদের সাথে ৯০ সালের পর থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর সুবাদে আমি তাদেরকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তখন কিন্তু হাসান মাহমুদ ব্যতীত তার পরিবারে অন্য কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। পরে সবাই রাতারাতি আওয়ামী লীগ নেতা বনে গেছেন। হাসান মাহমুদের আপন ভাইরা দুর্বৃত্তরাজ্যে পরিণত করেছিলেন রাঙ্গুনিয়াকে। তাদের সাম্রাজ্যে তাদের শাসনের বাইরে কেউ যেতে পারেনি। বিভিন্ন পাহাড়-পর্বত ভূমি দখল করে তাদের আধিপত্য বিস্তার করার কাহিনি লিখে শেষ করা যাবে না। তবে কর্ণফুলী নদীর বালুচর থেকে প্রতিবছর অবৈধভাবে আয় করতো শত কোটি টাকা। তাদের সময়ে বালুর মহল সরকারি ভাবে ইজারার ডাক হতো না। কেউ ডাকলেও তাদের ভয়ে বালু উত্তোলন করতে যেত না। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এই বালুর মহলগুলো তারা ভোগ করতো।
সময় এসেছে হাসান মাহমুদদের মতো বেয়াদব এবং মিথ্যুক দুর্নীতিবাজ দেশের শত্রুদের জনগণের আদালতে দাঁড় করানোর। তাদের মতো মিথ্যুক বেয়াদবদের কারণে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেছেন বড় কথা নয়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে যে জাতির কাছে প্রশ্নবোধক করে গেলেন, এর দায়ভার কে নেবে?তাদের বিষয়ে আরো কিছু কথা- চাটুকার রাজনীতির চিত্র- হাসান মাহমুদ ও ওবায়দুল কাদেরের উপাখ্যান
রাজনীতির মঞ্চে চাটুকারিতার বহু নাটকীয় পর্ব আমরা দেখেছি, কিন্তু হাসান মাহমুদ ও ওবায়দুল কাদেরের মতো চাটুকারদের ভূমিকা যেন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এরা শুধু চাটুকার নয়, মিথ্যা ও প্রতারণার এমন দক্ষ শিল্পী যে, তাদের মতো দক্ষ অভিনেতা হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। একদিকে শেখ হাসিনার সুনজরে থাকার জন্য তারা যে কোনো মিথ্যা কথা বলতে পারে, অন্যদিকে তাদের বেয়াদবি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা নিজেদের দলের প্রবীণ নেত্রীকেও অসম্মান করতে কুণ্ঠিত হয়নি।
হাসান মাহমুদের কথাই ধরা যাক। একটি মিথ্যা বলার প্রতিযোগিতায় তিনি যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদী হতে পারতেন, তাতে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। তার বাগ্মিতা আর মিথ্যা বলার অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা শেখ হাসিনার মনোরঞ্জনের জন্য নিখুঁত ছিল। কিন্তু এই মিথ্যার স্রোতে ভেসে গেছে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে দেশকে একটি অন্ধকারমুখী গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর এই দায়িত্ব যে হাসান মাহমুদ ও তার মতো চাটুকারদের কাঁধেই বেশি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ওবায়দুল কাদেরের কথাও উল্লেখ করতে হয়। তিনি নিজেকে একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, তার চাটুকারিতার কৌশলগুলো ক্রমাগত বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। মানসিক প্রতিবন্ধি মিথ্যারাজ হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার জন্য তার যা করা দরকার ছিল, তিনি সবই করেছেন। মিথ্যা, অপপ্রচার, এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য তার মন্ত্রিপরিষদের চেয়ারটি যেন তাকে একটু বেশিই সহযোগিতা করেছে।
এমন চাটুকারদের জন্যই বাংলাদেশে সত্য আর ন্যায়বিচার যেন কোনো মূখ্য বিষয় নয়। এরা নিজেদের স্বার্থে, নিজেদের ক্ষমতার দম্ভে দেশকে ডুবিয়ে দিতে একটুও পিছপা হয়নি। এদের কারণে জনগণ আজ অসহায়। জনগণের অধিকার, মুক্ত চিন্তা, এবং গণতন্ত্রের সবগুলো স্তম্ভই এদের কারণে বিপন্ন।
শেখ হাসিনা যদি তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বুঝতে পারেন যে, তার পাশে যারা ছিলেন, তারা আসলে তার পতন ডেকে এনেছে, তবে ইতিহাস হয়তো একটু একটু করে পরিবর্তনের দিকে এগোবে। আর এই পরিবর্তনেই এদের বিচার হবে জনগণের আদালতে, যেখানে সত্য আর ন্যায় বিচারই হবে একমাত্র নির্দেশিকা।
এদের মতো চাটুকারদের জন্য আমাদের সমাজের একটাই বার্তা থাকা উচিত: চাটুকারিতার রাজনীতি আর নয়, এখন চাই সত্যের প্রতিষ্ঠা। এবং সেই প্রতিষ্ঠায় আমাদের সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে, আমাদের নিজেদের বিবেক, সাহস এবং সততা দিয়ে।এই মিথ্যাবাদী হাসান মাহমুদকে নিয়ে আরো বিস্তারিত লেখার কথা দিয়ে আজকের লেখাটি শেষ করছি।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক।

