Tuesday, June 23, 2026

সেনাবাহিনী: মানব সেবায় একধাপ এগিয়ে-মো. কামাল উদ্দিন

এই বন্যায় সেনাবাহিনী যেভাবে মনেপ্রাণে সেবা প্রদান করছে, আগেও ঠিক তেমনিভাবেই করেছে। এই ধারাবাহিক সেবার কারণে সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও বেড়েছে। অতীতে রাজপথে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি না চালিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাও সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাসের একটি অংশ। আমাদের চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের উদ্যোগে ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে আন্দোলনের ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক দাবি পূরণ হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যে প্রকল্প সরকার গ্রহণ করেছিল, তা আমরা সেনাবাহিনীকে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এর ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এই বিষয়ে আমরা সেনাবাহিনীর সাথে একাধিকবার বৈঠকে মিলিত হয়েছি।চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম ও সেনাবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে আমরা জলাবদ্ধতা নিরসন নিয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব বঙ্গবন্ধু হলে একটি বৃহৎ কনভেনশন আয়োজন করেছিলাম। সেই কনভেনশনে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনসহ সকল সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন।

সেখানে সেনাবাহিনী একটি তথ্যভিত্তিক ডকুমেন্টারি উপস্থাপন করে, যা দেখে সবাই সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেছিলেন। সেনাতে সেনাবাহিনী একধাপ এগিয়ে তার বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য আমার আজকের এই লেখা -বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই বন্যাকবলিত মানুষদের সেবার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা মানুষের সেবায় সবসময় একধাপ এগিয়ে। “মানুষ মানুষের জন্য”—এ কথাটি তারা আরও একবার হৃদয়ে ধারণ করে দেখিয়েছে। আমি সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে আগেও বহুবার লিখেছি। আজও সেই আস্থার প্রতীক সেনাবাহিনীকে নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে বলছি—এই ক্লান্তিকর সময়ে আমাদের সেনাবাহিনী যেভাবে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে, তাতে দেশের মানুষ নতুন করে আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। এই আশার আলোই আমাকে এই লেখাটি লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে।লেখার শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে চাই। পুলিশের অনুপস্থিতিতে সারা দেশে দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব এবং আতঙ্ক সৃষ্টির প্রচেষ্টা ক্রমশ বাড়ছে, যা কঠোর হাতে দমন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের সেনাবাহিনী এই পরিস্থিতি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।চলুন, আমাদের সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস এবং দেশের সেবায় তাদের মহান ভূমিকা সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক।সেনাবাহিনী: এক জাতির সাহসিকতা, নিবেদন, এবং আত্মত্যাগের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু গৌরবময় ইতিহাসের অধিকারী নয়, আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবেও তাদের ভূমিকা অপরিসীম।

প্রাচীনকাল থেকেই সেনাবাহিনী দেশের সুরক্ষা এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তাদের অসংখ্য সাফল্য এবং মহান অর্জন আমাদের গর্বিত করেছে। বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে নানা সংঘাতময় পরিস্থিতি পর্যন্ত, সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের অদম্য সাহস ও কর্তব্যপরায়ণতা দিয়ে জাতিকে রক্ষা করেছেন। জীবনবাজি রেখে তারা যে সেবা প্রদান করেন, তা আমাদের দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যতই প্রযুক্তির উন্নতি হোক না কেন, সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ—কর্তব্যনিষ্ঠা, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ—অবিচলিত থেকে যায়। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী জাতির মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবসময় প্রস্তুত।

জাতীয় উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে অসামান্য ভূমিকা পালন করছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশ গঠনে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সেবামূলক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে দেশের উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করছেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে তাদের পেশাদারিত্ব, সততা ও নিষ্ঠা প্রশংসিত হয়েছে।সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতু দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে দেশব্যাপী অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভাবনীয় অবদান রেখেছে। এছাড়াও, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে তাদের দক্ষতা, নিষ্ঠা, এবং আন্তরিকতা আরও সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। তারা শুধুমাত্র নিজেদের দেশেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মানবতার সেবায় অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছে। যেমন, ২০১৭ সালে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, এবং চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে জনগণের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে।সামাজিক উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সামাজিক উন্নয়নেও সেনাবাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। সেনাবাহিনীর পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বিশেষ করে, সিএমএইচের আধুনিকীকরণ এবং আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা চিকিৎসা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।অতএব, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস এবং জাতির প্রতি তাদের অটুট দায়বদ্ধতা আমাদের জন্য এক বিরল প্রেরণা। তাদের সাহসিকতা, কর্তব্যপরায়ণতা, এবং অসামান্য সেবা আমাদের জাতীয় চেতনা এবং অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করে তোলে। দেশের জন্য তারা যেভাবে আত্মত্যাগ করে যাচ্ছেন, তাতে এ দেশের মানুষ সবসময়ই তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের গৌরবময় পরিচয় তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে তাদের অসামান্য অবদান এবং দক্ষতা বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অবদান শুধু বিশ্বমঞ্চেই নয়, বরং বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের রাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এভাবে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের নিবেদন এবং কর্তব্যপরায়ণতা বিশ্বশান্তির জন্য এক মহান দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সংকটে দ্রুত পদক্ষেপ সাম্প্রতিক সময়ে ঘূর্ণিঝড় মোখা, বন্যা, এবং ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ ও কার্যক্রম দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে, দুর্যোগকালীন সময়ে ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধারকাজ, এবং পুনর্বাসনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিপর্যস্ত এলাকার সড়ক, ব্রিজ, এবং অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য। সেনাবাহিনী যখন দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন দেশের মানুষ নতুন করে বাঁচার সাহস পায়।সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিশেষ অভিযানে ভূমিকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ অভিযানে অংশগ্রহণ করে। ১৯৯০-এর দশকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ থেকে শুরু করে পার্বত্য অঞ্চলে ‘শান্তি বাহিনী’ নিরসন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ভূমিকা জনগণের মাঝে আস্থা তৈরি করেছে। এমনকি, দেশে যখন কোনো সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান প্রতিরোধে ভূমিকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সীমান্ত এলাকায় মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় এবং অবৈধ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে তারা নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।

তাদের দৃঢ় মনোবল ও সাহসিকতার কারণে সীমান্ত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিকায়ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আধুনিকায়নের দিক থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সামরিক প্রশিক্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে জাতির নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষমতা আরও মজবুত হয়েছে।সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নারীদের অবদান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারীদের ভূমিকা দিন দিন উল্লেখ যোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা শান্তিরক্ষা মিশন থেকে শুরু করে দেশীয় নিরাপত্তা, চিকিৎসা, এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও অসামান্য দক্ষতা প্রদর্শন করছে। নারীদের অংশগ্রহণের ফলে সেনাবাহিনীর কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য এবং সার্বিক কর্মক্ষমতা বাড়ছে। এটি শুধু নারীদের ক্ষমতায়নই নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থ নারীদের অংশগ্রহণের ফলে সেনাবাহিনীর কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য এবং সার্বিক কর্মক্ষমতা বেড়েছে। এটি শুধু নারীদের ক্ষমতায়নই নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়ও একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সেনাবাহিনীর নারী সদস্যরা তাদের দক্ষতা ও নেতৃত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছে যে তারা যেকোনো দায়িত্বে সমানভাবে সক্ষম। তাদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং সাহসিকতা সেনাবাহিনীর সার্বিক উন্নতিতে একটি বিশাল ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন সেবা, আত্মত্যাগ, এবং দেশপ্রেম আমাদের জাতীয় জীবনে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। শুধু দেশের নিরাপত্তাই নয়, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় তাদের ভূমিকা আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। দেশের প্রতি তাদের অটুট দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা আমাদের সবার জন্য গর্বের বিষয়। সেনাবাহিনী তাদের মহান দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যেমন দেশকে ভালোবেসে যাচ্ছে, তেমনি আমরাও তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত