
মোঃ মাছুম আকবরী আকাশ, চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম সড়ক টানেল নিয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। তারা আশা করেছিল, টানেল দিয়ে ব্যাপক যানবাহন চলাচল হবে, টোল থেকে আসা আয়ে ঋণ পরিশোধ ও নির্মাণ ব্যয় পূরণ হবে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে প্রকল্পটি ‘লোকসানি প্রকল্পে’ পরিণত হয়েছে।
বাস্তবতার সাথে মিলছে না প্রত্যাশা উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিদিনকার যানবাহন চলাচল ও টোল আয় লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না। টানেলের টোল থেকে আয় হওয়া অর্থ রক্ষণাবেক্ষণ খরচের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মেটাতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি টেকসই প্রকল্প হিসাবে পরিকল্পিত ছিল না, যার ফলে এটি অর্থনৈতিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পকে কার্যকর করতে হলে সরকারের নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
বাস্তবায়ন থেকে বিপরীত পরিস্থিতি ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলী টানেলটি উদ্বোধন করেন, যা পরের দিন যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। টানেল কর্তৃপক্ষ আশা করেছিল, প্রতিদিন গড়ে ১৮ হাজারের বেশি গাড়ি চলাচল করবে। তবে বর্তমানে গড়ে মাত্র ৩৯১০টি গাড়ি চলাচল করছে। প্রতিদিন গড়ে টোল আয় মাত্র ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা হলেও, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, যা প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতামত নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার এবং বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, টানেলটি একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ছিল যা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়নি, ফলে দেশের অর্থনীতির জন্য এটি ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফাওজুল কবির খান, সড়ক ও সেতু পরিবহন উপদেষ্টা, বলেন, টানেলটি ছিল এক ধরণের ‘চোখ ধাঁধানো প্রকল্প’, যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবে ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে। শুধু টানেল নয়, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগও একই পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।
টানেলকে কার্যকর করতে প্রস্তাবিত উদ্যোগ টানেলের দুটি প্রান্তে ভারী শিল্প কারখানা স্থাপন এবং সঠিক সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে এর ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি, কক্সবাজার পর্যন্ত সংযোগ সম্প্রসারণ ইত্যাদি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাকারীরা বলছেন, টানেলটি কার্যকর করতে হলে মিরসরাই শিল্পাঞ্চল থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ এবং ভারী শিল্প স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কর্ণফুলী টানেলের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও, সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী যে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।