জাতীয় পতাকার উপর ইস্কনের পতাকা উত্তোলন: স্বাধীনতার প্রতীককে অবমাননা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ইঙ্গিত-মো.কামাল উদ্দিন
চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে গত ২৫ অক্টোবর শুক্রবার হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন ইস্কনের আয়োজনে একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সনাতনী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অংশগ্রহণ করেন। জনসভার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ এবং কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ পুলিশ প্রশাসন সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ দেশের সংবিধান-স্বীকৃত ধর্মীয় সহনশীলতা বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট প্রশংসনীয়।
তবে জনসভার আগে সংঘটিত একটি ঘটনার জন্য সাম্প্রদায়িক বিভাজনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট চত্বরে জাতীয় পতাকার উপর ইস্কনের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে, যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনা একটি চক্রান্তমূলক প্রচেষ্টা বলেই মনে করা হচ্ছে, যা ধর্মীয় সংঘাত উস্কে দিয়ে দেশের শান্তি ও সম্প্রীতিকে বিঘ্নিত করার অপপ্রয়াস।
জাতীয় পতাকা: আমাদের স্বাধীনতার মর্যাদাপূর্ণ প্রতীক জাতীয় পতাকা আমাদের স্বাধীনতার একক নিদর্শন, যা ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই পতাকা প্রতিটি নাগরিকের গর্ব এবং স্বাধীনতার পরিচয় বহন করে। জাতীয় পতাকার ওপর অন্য কোনো পতাকা উত্তোলন করা স্বাধীনতার মর্যাদাকে চরমভাবে অবমাননা করার সমান। বিশেষ করে এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন আমরা জাতীয়ভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছি। জাতীয় পতাকার উপর অন্য কোনো পতাকা তুলে দিয়ে ইস্কনের একটি দল আসলে একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
এই ঘটনার সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এটি খুবই স্পষ্ট যে, এই ঘটনা ইস্কনের সামগ্রিক নীতির অংশ নয়; বরং এটি একশ্রেণীর সাম্প্রদায়িক উগ্রপন্থীদের পরিকল্পিত অপকৌশল। এই ধরনের কর্মকাণ্ড স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী এবং দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা। ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে ইস্কন সনাতনী সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে, কিন্তু এ ধরনের কাজের মাধ্যমে সংস্থাটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের মধ্যে পড়েছে। ইস্কনের এ ধরনের পদক্ষেপ শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক বিভাজন নয়, বরং এটি পুলিশ প্রশাসনের ওপরও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে কোতোয়ালি থানার পুলিশ, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে আসছে, এ ঘটনার পর বিতর্কিত অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠছে— এই ধরনের কাজ কি কেবল সামান্য অসাবধানতা, নাকি এটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ, যার মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থা এবং স্বাধীনতা অর্জনের চেতনাকে কলুষিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে?
প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা এ ধরনের বিতর্কিত ঘটনার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশের নাগরিকদের জন্য সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা জরুরি, এবং এক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। যারা এই জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কেউ করতে সাহস না পায়।
এছাড়াও, প্রশাসনের উচিত বিষয়টির যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করা। এভাবে আমরা একদিকে আমাদের জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা করতে পারবো এবং অন্যদিকে দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সক্ষম হবো।
সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।