চট্টগ্রামের প্রাণপ্রবাহ হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় শুধু নদীর পানি ও তলদেশের পলিতেই নয়, হালদা নদীর মাছের শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে। গবেষকদের মতে, দূষণ এখন জলজ খাদ্যচক্র অতিক্রম করে মানুষের খাদ্যতালিকায় পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান দুই নদী—হালদা ও কর্ণফুলী—নিয়ে গত দুই বছরে প্রকাশিত একাধিক গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট গবেষকদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা। নদীর পানিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন তলদেশের পলি, জলজ প্রাণী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যচক্রেও প্রবেশের পথ তৈরি করেছে।
কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর পানিতে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, বোতলের ঢাকনা, ছেঁড়া স্যান্ডেল, মাছ ধরার জালের টুকরোসহ নানা ধরনের কঠিন বর্জ্য। শহরের খালগুলো দিয়ে প্রতিনিয়ত আসা বর্জ্যে নদীর বিভিন্ন অংশে ময়লার স্তূপ তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে।
তবে দৃশ্যমান এই দূষণের চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ অদৃশ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক। সূর্যের আলো, ঢেউ ও ঘর্ষণের প্রভাবে বড় প্লাস্টিক ভেঙে পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যা সহজেই নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং তলদেশে জমা হয়। এসব কণা খালি চোখে দেখা না গেলেও জলজ প্রাণীরা খাবার ভেবে গ্রহণ করে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কর্ণফুলী নদীর ২৪টি স্থান থেকে তিনটি ভিন্ন মৌসুমে পানি ও পলির নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ১৪.২৪ থেকে ২৬.৬৮টি এবং প্রতি কেজি শুকনা পলিতে ৭৫.৬৩ থেকে ২৭২.৪৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই মাত্রা নদীর জন্য উল্লেখযোগ্য দূষণের ইঙ্গিত বহন করে। সবচেয়ে বেশি দূষণ শনাক্ত হয়েছে নদীর নিম্নপ্রবাহে, যেখানে নগরায়ণ, বন্দর কার্যক্রম ও শিল্পকারখানার প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নদীতে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় অংশের উৎস মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্লাস্টিকজাত পণ্য—পানির বোতল, খাদ্যের মোড়ক, সিনথেটিক কাপড়, সিগারেটের ফিল্টার, মাছ ধরার জাল এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য। অর্থাৎ নদীর দূষণের মূল উৎস নদীর ভেতরে নয়; বরং নগরজীবন, শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
অন্যদিকে, প্রথম দর্শনে তুলনামূলক স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক মনে হলেও হালদা নদীতেও একই ধরনের দূষণের প্রমাণ মিলেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় নদীর পানির পাশাপাশি হালদার মাছের পরিপাকতন্ত্র ও পেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, প্লাস্টিক দূষণ ইতোমধ্যে জলজ খাদ্যচক্রে প্রবেশ করেছে এবং মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক সহজেই মাছ, চিংড়ি, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। এটি শুধু নিজেই একটি দূষক নয়, বরং ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিকও বহন করতে পারে। ফলে জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশের পর এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও জটিল হয়ে ওঠে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে জমা হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক সময়ের সঙ্গে তলদেশে সঞ্চিত থাকলেও জোয়ার-ভাটা, স্রোত কিংবা ড্রেজিংয়ের সময় আবার পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সংকটে পরিণত হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পবর্জ্য পরিশোধনের কঠোর নজরদারি, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় হালদা ও কর্ণফুলীর এই সংকট শুধু নদীর জীববৈচিত্র্য নয়, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ইতি/
