, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 30° সে. | 💧 আদ্রতা 72%

দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ, ২০ ভরি স্বর্ণের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের দেওয়ানহাটের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী দেওয়ানেশ্বরী সার্বজনীন কালী মন্দির, স্থানীয়ভাবে দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই মন্দিরে কালীপূজা, শ্যামাপূজা ও দীপাবলিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়।

তবে ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটি গঠন, দান-অনুদানের হিসাব, রসিদ বইয়ের ব্যবহার, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং ভক্তদের দেওয়া স্বর্ণালংকার সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সনাতনী ভক্তদের একাংশ।

তাদের অভিযোগ, ২০১৯ সালে সংশোধিত মন্দিরের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে বর্তমান পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়নি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনে মন্দিরে দান করা প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকারের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, তালিকা ও বর্তমান সংরক্ষণস্থল সম্পর্কেও ভক্তদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

২০ ভরি স্বর্ণালংকারের হিসাব কোথায়?

স্থানীয় ভক্তদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে মন্দিরে প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকার দান করা হয়েছে। এসব স্বর্ণালংকারের দাতার নাম, পরিমাণ, ওজন, সংরক্ষণস্থল এবং বর্তমান অবস্থার বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও যাচাইযোগ্য তালিকা প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

বিষয়টি নিয়ে মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দাস গুপ্তের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছাড়া মন্দিরের স্বর্ণালংকার দেখানো সম্ভব নয়। মন্দিরের সম্পদ পরিচালনা কমিটিই দেখভাল করে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক অমল কর্মকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান এবং সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

তবে এসব বক্তব্যের পাশাপাশি স্বর্ণালংকারের প্রকৃত পরিমাণ, দানকারীদের তথ্য, সংরক্ষণ ও হিসাবসংক্রান্ত নথি যাচাই করা সম্ভব হলে অভিযোগটির বাস্তব ভিত্তি আরও স্পষ্ট হবে।

গঠনতন্ত্রে ৩৫, কমিটি ৪১—বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

মন্দিরের পরিচালনা কমিটির সদস্যসংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ভক্তদের একাংশ।

তাদের দাবি, ২০১৯ সালে সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যসংখ্যা ৩৫ জন হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ৪১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ ছাড়া গঠনতন্ত্রের ৬(গ), ১১(ক), ১২(চ), ১৭(জ), ২৫(খ), ২৬(ঙ), ২৭(গ), ২৮(ছ)-এর দ্বিতীয় অংশ, ২৯(গ), ৩১(খ) এবং ৩৩(ক) ও (খ) ধারার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি বা গঠনতন্ত্রের কোনো ধারা পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট গঠনতন্ত্র, সাধারণ সভার কার্যবিবরণী, অনুমোদনপত্র ও কমিটি গঠনের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দে কমিটি গঠনের অভিযোগ

দীর্ঘদিনের ভক্ত ও মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে পরিচালনা কমিটি গঠনের চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের একাংশ।

তাদের দাবি, এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে ভক্তদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। তবে কারা বাদ পড়েছেন, কোন প্রক্রিয়ায় বর্তমান কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কী বিধান রয়েছে—এসব নথি যাচাই ছাড়া অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

রসিদ বই ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন

মন্দিরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, মন্দিরের উন্নয়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সংগৃহীত অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। রসিদ বইয়ের ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং সংগ্রহ করা অর্থের সঙ্গে হিসাবের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

এ নিয়ে কেউ কেউ আর্থিক অনিয়মের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো নিরীক্ষিত হিসাব বা স্বাধীন তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও অডিটের দাবি

স্থানীয় ভক্তদের একাংশ মন্দিরের স্বর্ণালংকার, দান-অনুদান, রসিদ বই এবং আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরপেক্ষভাবে নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে পরিচালনা কমিটি গঠনের বৈধতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট গঠনতন্ত্র ও নথিপত্র প্রকাশ এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

তাদের মতে, স্বচ্ছ তদন্ত ও হিসাব নিরীক্ষার মাধ্যমে মন্দিরের সম্পদ ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব পাওয়া সম্ভব হবে। এতে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ও অনাস্থাও দূর হবে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই প্রয়োজন

দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি পরিচালনা নিয়ে স্থানীয় ভক্তদের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো এখনো তদন্ত বা নিরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।

এ প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, মন্দিরের গঠনতন্ত্র, কমিটি গঠনের নথি, হিসাব-নিকাশ, রসিদ বই এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি পরিচালনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের নেপথ্যে কী রয়েছে, কমিটি গঠনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেসব বিষয়ে নথি ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত