, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 32° সে. | 💧 আদ্রতা 59%

খালি কনটেইনারও বৈধ রপ্তানি: কাগজে পণ্য, বাস্তবে বড় জালিয়াতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি হচ্ছে পণ্যবাহী কনটেইনার। কাগজপত্রে উল্লেখ থাকছে পোশাক, কাপড় কিংবা বিভিন্ন ধরনের রপ্তানিপণ্যের বিবরণ। তবে বাস্তবে কনটেইনার খুলে মিলছে না ঘোষিত পণ্য। কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের পরিমাণ ও ঘোষণার মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি, আবার কোনো চালানে কনটেইনারই পাওয়া যাচ্ছে খালি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, বেসরকারি আইসিডি এবং সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের যোগসাজশে এমন জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আনা কাঁচামাল দেশীয় বাজারে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের হিসাব ব্যবস্থায় কারসাজির অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা সামনে আসে। ভ্যালমন্ট ফ্যাশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি চালানে কাগজপত্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য থাকার তথ্য দেওয়া হলেও তদন্তের এক পর্যায়ে কনটেইনারগুলোতে ঘোষিত পণ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চালানটির ঘোষিত পণ্যমূল্য ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা শেষ পর্যায়ে সরেজমিনে চালানটি পরীক্ষা না করলে কনটেইনারগুলো জাহাজে উঠে বিদেশেও চলে যেতে পারত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ঘটনাটি বেসরকারি ডিপো ইছাক ব্রাদার্সে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

যেভাবে কাজ করে জালিয়াতির চক্র

তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামাল অনেক সময় বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা হয়। এসব পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। শর্ত অনুযায়ী, আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করে তা বিদেশে রপ্তানি করার কথা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাঁচামাল কিংবা উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে সরিয়ে দেওয়ার পর সেই ঘাটতি আড়াল করতে ভুয়া রপ্তানি চালান তৈরি করে।

প্রক্রিয়াটির শুরুতেই তৈরি করা হয় রপ্তানি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি। এতে থাকে ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, পণ্যের বিবরণ, পরিমাণ, ওজন, মূল্য, বিদেশি ক্রেতার তথ্য ও কনটেইনার নম্বর। এরপর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার শিপমেন্ট ও বুকিং-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আইসিডি বা অফডকে কনটেইনার স্টাফিং, সিলিং ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড তৈরির ধাপ সম্পন্ন হয়।

কাগজপত্র ও সফটওয়্যারে প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে তথ্য উঠে এলে পরবর্তী পর্যায়ে একই চালান বৈধ রপ্তানি হিসেবে দৃশ্যমান হয়। ফলে প্রকৃত পণ্য না থাকলেও নথিভিত্তিক ব্যবস্থায় তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায়ও থাকছে ঝুঁকি

রপ্তানি প্রক্রিয়ায় কাস্টমসের বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থায় এক ধাপের তথ্য পরবর্তী ধাপে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ভুল বা মিথ্যা তথ্য সঠিকভাবে সিস্টেমে প্রবেশ করানো গেলে পরবর্তী ধাপের নথিতেও একই তথ্য প্রতিফলিত হতে পারে।

এনবিআরের ASYCUDA World ব্যবস্থায় বিল অব এক্সপোর্টসহ বিভিন্ন তথ্য ব্যবহারের কারণে কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তব পণ্যের মিল যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একটি চালানকে শুরুতেই সঠিক হিসেবে গ্রহণ করা হলে পরবর্তী পর্যায়ে কনটেইনার নম্বর, পণ্যের বিবরণ, ওজন, মূল্য ও অন্যান্য তথ্য একই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ ধরনের ব্যবস্থায় শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়, ঝুঁকিপূর্ণ চালান শনাক্ত করে শারীরিক পরিদর্শন এবং বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের পারস্পরিক যাচাই নিশ্চিত করা জরুরি।

আর্থিক অপরাধের আশঙ্কা

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভুয়া রপ্তানি দেখানোর মাধ্যমে শুধু বন্ড সুবিধার অপব্যবহারই নয়, এর সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রপ্তানি না করেও রপ্তানি সম্পন্ন হয়েছে এমন তথ্য দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।

এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতা, রপ্তানিকারক ও ব্যাংকিং লেনদেনের মধ্যে যোগসূত্র ব্যবহার করে অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মতো পদ্ধতির মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের ঝুঁকিও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তাদের দাবি, এ ধরনের ঘটনায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র যাচাই করলেই পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। রপ্তানিকারক, আইসিডি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, শিপিং-সংক্রান্ত নথি, ব্যাংকিং লেনদেন এবং বিদেশি ক্রেতার তথ্য—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

জড়িতদের শনাক্তে সমন্বিত তদন্তের দাবি

গার্মেন্টস খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান এমন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা রপ্তানিকারকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং দেশের রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ, খালি কনটেইনার বা ঘোষণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্য রপ্তানির অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ব্যাংকিং খাত ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে পৃথক তদন্ত টিম গঠন করে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা যেতে পারে।

একটি চালানের কাগজপত্রকে বৈধতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবে কনটেইনারে কী পণ্য উঠেছে, কোথায় স্টাফিং হয়েছে, কে সিল দিয়েছে এবং অর্থের লেনদেন কোথায় হয়েছে—এসব তথ্যও যাচাই করা হলে এ ধরনের জালিয়াতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত