
সাতকানিয়া প্রতিনিধি চট্টগ্রামঃ
এক শিক্ষকের উদ্যোগে বদলে গেছে একটি বিদ্যালয়। যিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, জীবনে চলার প্রয়োজনীয় সব জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার জন্য কাজ করছেন। বিদ্যালয়টিকে শতভাগ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই বিদ্যালয়টির রূপকারের নাম মো. আবু হানিফ। তিনি সাতকানিয়া উপজেলার পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
মো. আবু হানিফ ১৯৯৪ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চন্দনাইশের বৈলতলী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর ২০০৭ সালের শেষের দিকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে বাঁশখালী নাটমুড়া পুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন।
পরে ২০১১ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের। এরপর থেকেই বিদ্যালয়টিকে উন্নত করতে কাজ শুরু করেন। গত কয়েক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হারও নিয়ে এসেছেন শূন্যের কোঠায়। এ ছাড়াও বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলেও এসেছে সাফল্য।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষার প্রসারে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ ও আইসিটি সুবিধাসহ দৃষ্টিনন্দন দুটি ভবন রয়েছে। যা বিদ্যালয়টিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে। ভবন দুটিতেই বিভিন্ন কক্ষে শিক্ষার্থীরা পাঠগ্রহণ করছেন।
শিক্ষার্থীদের মানসিক চিন্তাশক্তি পরিবর্তনের জন্য কাগজে লেখা বিভিন্ন বাণী লাগানো আছে শ্রেণি কক্ষে। এছাড়া খেলাধূলার জন্য রয়েছে বিশাল মাঠ। ভবন দুটিতে আধুনিক ক্লাসরুমের পাশাপাশি পয়ঃনিষ্কাশন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা, ব্ল্যাক ও সাদা বোর্ড ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য করা হয়েছে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা। এ লক্ষে সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে স্মার্ট কার্ড।
এমনকি প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান করানোর জন্য রয়েছে মাল্টিমিডিয়া রুম ও আইসিটি ল্যাব। পাঠ্যপুস্তকের সহযোগিতা নিয়ে শ্রেণিশিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে কম্পিউটারে নোট তৈরি করে সেগুলো প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখান। প্রয়োজনে সেগুলো শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করেন। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখা বুঝতে সুবিধা হয়।
বিদ্যালয়ের সকল শ্রেণি কক্ষসহ পুরো ক্যাম্পাসে লাগানো হয়েছে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। বিদ্যালয়ের চারপাশে শোভাবর্ধনকারী নানান ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে। এছাড়া ভবনের বারান্দায় সারি সারি ফুলের টব রয়েছে।
ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার গৌরবময় ইতিহাসকে শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে দিতে বিদ্যালয়টিতে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ মিনার। বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন গেইট।বখাটে কর্তৃক ছাত্রীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন সে লক্ষে কঠোর ভূমিকা রয়েছে প্রধান শিক্ষকের।
এছাড়াও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রধান শিক্ষক এই বিদ্যালয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে এই বিদ্যালয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্নার।
ভাল ফলাফলের জন্য বিশেষ ক্লাস ও মডেল টেস্টের ব্যবস্থা করেছেন প্রধান শিক্ষক। এতে করে প্রতিবারই সাফল্যের সাথে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে ২০২০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৩.৪৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পায় একজন। ২০২১ সালে পাসের হার ৯৫.৩৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পায় একজন। ২০২২ সালে পাসের হার ৯৭.১৮ শতাংশ, জিপিএ-৫ পায় সাতজন। ২০২৩ সালে পাসের হার ছিল ৯৩.৭৫ শতাংশ। আর চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ৮৬.৬৭ শতাংশ।
বর্তমান প্রধান শিক্ষকের সময়ের যাবতীয় নিয়োগ কার্যক্রম শতভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া বোর্ড পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের নজির নেই এই বিদ্যালয়ের। শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত ফি প্রদানের মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশ নেন। সকল আয়-ব্যয় যথাসময়ে বিদ্যালয়ের ক্যাশ বইয়ে লিখিত আছে। অতিরিক্ত ক্লাসের ফি, হোস্টেল ফি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে যথাসময়ে বন্টন করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন মৌলানা মোহাম্মদ ইউনূস। তিলে তিলে এই প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ শিখরে ওঠা তার চোখের সামনে। তিনি বলেন, ‘১৯৮৮ সালে এই বিদ্যালয়টির যাত্রা। পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও অনেক শিক্ষা রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী পরিপূর্ণভাবে গড়ে উঠতে পারে। সেই দিক বিবেচনায় রেখেই প্রধান শিক্ষক কাজ করছেন এবং আমরাও তার সঙ্গে কাজ করছি। ইতোমধ্যে আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানান বিষয়ে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইউনূস বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকসহ আমাদের সম্মিলিত চেষ্টা আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়া, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। শতভাগ ডিজিটাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে আমাদের বিদ্যালয় সফলতা অর্জন করবে। সাহিত্য চর্চা, খেলাধুলা, আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক মো. আবু হানিফ বলেন, ‘২০১১ সালে এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ। ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা, বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা প্রদান, পাঠ্যবইয়ের বাইরে থেকে জ্ঞান আহরণ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পারদর্শী করতে শিক্ষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট সময়সীমার বাইরেও তারা কাজ করছেন। কিছু বিষয়ে সমস্যা রয়েছে, যেগুলোতে সরকারিভাবে পদক্ষেপ ও পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। এগুলোর সমাধান হলে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে যাবো। সময়ে সময়ে কিছু ষড়যন্ত্র, এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী নির্বাচনে চাপ, ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার হীন মানসিকতা থেকে রক্ষা পেলে বিদ্যালয় একদিন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে ইনশাআল্লাহ।
তবে সম্প্রতি কতিপয় ব্যক্তি প্রধান শিক্ষকের মান ক্ষুণ্ণ করে বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে বলে জানা গেছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগ প্রচার করায় ক্ষোভে ফুঁসছেন ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ যে সকল অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা। বিভিন্ন সময় বখাটে ও জুয়াড়িদের নিবৃত্ত করার কারণে কতিপয় ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার চালিয়ে তার মান ক্ষুণ্ণ্যের চেষ্টা করছেন বলে জানান তারা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মো. আবু হানিফ বলেন, ‘আমার ব্যাপারে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। মূলত অনিয়ম-দুর্নীতি, জুয়া ও বখাটেদের বিরুদ্ধে আমার শক্ত অবস্থান থাকায় তারা আমাকে হেয় করে আমার মান সম্মানে আঘাত হেনে আমাকে নরম করে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে।
আর বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের সভাপতি মো. আরফাত হোসাইন বলেন, আমার দেখা স্যার অত্যন্ত ভাল মানুষ। স্যারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা জানাই। পাশাপাশি এ ব্যাপারে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য মো. জমির উদ্দিন বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার হীন মানসিকতা থেকে একটি মহল প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্টের ঘৃণ্য অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি কল্যাণকর কাজের জন্য পরিশ্রম আছে, পরিশ্রমের বিপরীতে যারা অলস ব্যক্তি আছে তাদের হীনমন্যতার কারণে একজন সৎ মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে। যার কোনো ভিত্তি নেই এবং তা কাল্পনিক ও বানোয়াট।

