Tuesday, June 23, 2026

গণতন্ত্রের উদিত সূর্য যেন মেঘের আড়ালে হারিয়ে না যায়-মো. কামাল উদ্দিন

২০১৮ সালে কোটা আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। তখন তিনি আন্দোলন কারীদের দাবির যথার্থতা বুঝে, কোটা পদ্ধতি বাতিলের মাধ্যমে একটি চলমান সংকটকে সমাধান করেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে একটি ইতিমধ্যেই বাতিলকৃত সমস্যা নিয়ে অহেতুক উস্কানিমূলক আচরণ এবং ওবায়দুল কাদেরের অবান্তর, অসংলগ্ন বক্তব্য দিয়ে ছাত্র সমাজকে ক্ষুব্ধ করার যে প্রয়াস নেওয়া হলো, তা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনার সামিল হয়েছে।

যেখানে ২০১৮ সালে কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছিল, সেখানে এ বিষয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন ছিল না। বরং সেই আন্দোলন কারীদের দাবিকে স্বাগত জানিয়ে সমস্যা সমাধানের সহজ পথ বেছে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতো। যখন ছাত্ররা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন শুরু করেছিল, তখন তাদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে তাদেরকে সম্মান জানানো, তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়াই ছিল সময়োপযোগী পদক্ষেপ। কারণ, কোটা তো সরকার ২০১৮ সালেই বাতিল করেছিল; অতীতের সেই সমস্যাকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

অহেতুক উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ছাত্রলীগের মাধ্যমে বলপ্রয়োগ করা ছিল মারাত্মক ভুল। যখন আন্দোলন জোরদার হয়ে যায়, তখন পুলিশ দিয়ে দমন করার সিদ্ধান্তে পুলিশের গুলি চালানোর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সহিংসতা, রাজপথে শত শত মানুষের প্রাণহানি—সবকিছু মিলে ছাত্রসমাজ এবং সারাদেশের মানুষ সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। শেখ হাসিনা যদি ২০১৮ সালের মতো ঠান্ডা মাথায় সমস্যার সমাধান করতেন, তবে হয়তো আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।শেখ হাসিনার কিছু মনগড়া সিদ্ধান্ত, উল্টাপাল্টা মন্তব্য এবং আন্দোলনকারীদের প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য—এসবই পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। তিনি যদি জাতির উদ্দেশে ক্ষমা চেয়ে, ভুল স্বীকার করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতেন, তাহলে হয়তো এত মানুষের প্রাণহানি ঘটতো না। এই আন্দোলন থেকে জাতি একটি বড় শিক্ষা গ্রহণ করেছে।

তবে, একটি সত্য উন্মোচিত হয়েছে: দেশের প্রকৃত মালিক সাধারণ জনগণ। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল এই স্বীকৃতি, যা আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এতদিন পরেও সাধারণ মানুষ সেই মালিকানা উপভোগ করতে পারেনি। আজকের ছাত্রসমাজ সেই মালিকানাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। সরকারি কর্মচারীরা গণতন্ত্রের চাকর, এবং তাদের মালিক সাধারণ মানুষ—এ কথা তারা ভুলে গিয়েছিল। আজ সেই ভুল মনে করিয়ে দিয়েছে ছাত্র জনতা। প্রত্যেকটি সরকারি অফিসে সরকারি কর্মচারীদের উচিত সাধারণ মানুষকে যথাযথ সম্মান দেওয়া। তাদের প্রতিটি অপকর্মের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ সোচ্চার হবে এবং প্রয়োজন হলে তাদেরকে বিদায় করে দেবে। এই দেশে আইজিপি, ডিআইজি, এসপি, ডিসি সহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের রাজা-মহারাজা ভাবতে অভ্যস্ত ছিল, সাধারণ মানুষকে দেখা করার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। আজ সেই দিন হয়তো শেষ হওয়ার পথে। আমরা আগামী দিনের নতুন সূর্য উদিত হওয়ার আশায় থাকবো। বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা যে গণতন্ত্রের ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছি, তা যেন অন্ধকার পথে হারিয়ে না যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের হাত ধরে আমরা এই নতুন সূর্যের আলো নিয়ে দেশ ও জাতিকে আলোকিত করবো, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক, এবং টেলিভিশন উপস্থাপক।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত