Tuesday, June 23, 2026

কেন এতো বিভেদ আমাদের মধ্যে?-লায়ন মোঃ আবু ছালেহ্ 

যুগে যুগে মানুষ ইসলামকে বিভক্ত করে আসছে। কেউ নবীবাদি, কেউ সাহাবীবাদি, আবার কেউ অলিবাদি , আবার এইসব দল থেকে উপদল বা উপশ্রেনী বের হয়! এই নিয়ে নবীজির ভবিষ্যৎ বাণীঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের মাঝে দন্ডায়মান হলেন, অতঃপর বললেনঃ “জেনে রেখো! তোমাদের পূর্ব যুগের আহলে কিতাবগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এই উম্মত অচিরেই তেহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। তন্মধ্যে বাহাত্তর দলই জাহান্নামে যাবে, আর একটি মাত্র দল যাবে জান্নাতে, সে দলটি হল জামাআত। (হাদীছটি বর্ণনা করেছেন আহমাদ ও আবু দাউদ)

অন্য বর্ণনায় আবু দাউদ বৃদ্ধি করেছেনঃ

“এবং অচিরেই আমার উম্মতের মধ্যে কতিপয় দল বের হবে। কুকুরের দংশনে কালাব নামক একধরণের রোগের জীবাণু যেমন রোগীর সমস্ত শরীর প্রবাহিত হয় তেমনি প্রবৃত্তি তাদের মধ্যে প্রবাহিত হবে। তার কোন শিরা-উপশিরা বা কোন জোড়া অবশিষ্ট থাকবে না।

শায়খ আলবানী বলেনঃ অর্থাৎ সাহাবীদের জামা আত- যেমনটি কতিপয় বর্ণনায় পাওয়া যায়। অপর বর্ণনায় সে দলটির পরিচয় বলা হয়েছে আমি এবং আমার সাহাবীগণ যে মতাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি তার অনুসরন কারীগণ উক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত। (তিরমিয়ী)

জানা আবশ্যক যে, সাহাবায়ে কেরাম যে নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁদের সেই নীতিকে আঁকড়ে ধরাই হচ্ছে একক নিরাপত্তা, ডানে-বামে বিভ্রান্তির পথ থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে। বর্তমানে বিভ্রান্ত ফির্কা সমূহ তো অবশ্যই অনেক ইসলামী দলও এই নীতি থেকে উদাসীন অবস্থায় আছে।

বিভেদের কারণঃ

ধর্মীয় মতাদর্শ: ইসলামের বিভিন্ন ব্যাখ্যা যেমন ইসলামের বিভিন্ন ধারা, সুন্নি, শিয়া, আহমদিয়া, ইবাদি, ইত্যাদি, ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা, নবীর বাণী ও কর্মের ব্যাখ্যা, এবং ইসলামী আইনের ব্যাখ্যায় পার্থক্য রাখে। এই পার্থক্যগুলো মতাদর্শগত বিভেদ সৃষ্টি করে।ধর্মীয় রীতিনীতি: নামাজ পড়া, রোজা রাখা, হজ্জ করা, ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন ধারার মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এই পার্থক্যগুলো ধর্মীয় রীতিনীতির ক্ষেত্রে বিভেদ সৃষ্টি করে।

রাজনৈতিক মতাদর্শ: বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেমন মুসলিম দেশগুলোতে রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, সামরিক শাসন, ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। এই রাজনৈতিক পার্থক্যগুলো মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিন্ন অবস্থান: বিভিন্ন মুসলিম দেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে। এই ভিন্ন অবস্থানগুলো মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য: বিশ্বের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছে। এই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্যগুলো মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।ঔপনিবেশিক শাসন: অনেক মুসলিম দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। ঔপনিবেশিক শাসন এই দেশগুলোতে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। এই বিভেদ ও দ্বন্দ্ব মুসলমানদের মধ্যে আজও বিদ্যমান।

অর্থনৈতিক পার্থক্য: ধনী ও দরিদ্র মুসলমান ধর্মীয় কোন পার্থক্য না থাকলেও মুসলিমদের মধ্যে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। এই অর্থনৈতিক পার্থক্য মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।আন্তর্জাতিক মিডিয়া নেতিবাচক চিত্রায়ন: আন্তর্জাতিক মিডিয়া অনেক সময় মুসলমানদের নেতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করে। এই নেতিবাচক চিত্রায়ন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভুল ধারণা ও পক্ষপাত তৈরি করে।

জীবনে বিশ্বের বহু মুসলিম দেশের বিভিন্ন ভাষার মানুষের সাথে মিশেছি। তাদের ভাষা জানতে চেষ্টা করেছি। যে ভাষা গুলো আয়ত্ত করেছি তার মধ্যে আরবী, তু্কি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দী, ইন্দোনেশিয়ান, হাউসা, অতি সামান্য চাইনিজ ও কেরালা ভাষাও রয়েছে। সবার সাথে মিশে যা অভিজ্ঞতা হলো তাতে ইসলাম ধর্ম পালনের সাথে সাথে নিজ নিজ দেশীয় ও জাতীয় সংস্কৃতির মিশ্রণের ফলে মূল যে ইসলামিক আদর্শ সেটার বিচ্যুতি ঘটে। কারো ভালো লাগা সাদাকে আর কারো ভালো লাগা সাদাকে। যার কারণে সাদা বলছে সে ঠিক আর কালো বলছে সেও ঠিক। এভাবে নিজেদের অবস্থানকে সঠিক দাবী করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়ে যায়। যার ফলে আমরা বিভিন্ন দলে রূপ নিচ্ছি। অথচ ইসলামের কোন ধারা বা উপধারা নেই। নেই কোন দল বা উপদল। নেই কোন জাতি ভেদাভেদ। এই কথাটি সবাই মানবে নিশ্চয়। মানলেও তা আমাদের মানদন্ডে আমরা প্রতিফলন ঘটাইনা।

দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি নয় এমনকি জোর জবরদস্তি ও নয়। রাসুল সঃ এর আদেশ সহজ করো কঠিন করোনা সুসংবাদ দাও ভীতশ্রদ্ধ করোনা। অথচ আমরা একে অপরকে ঘায়েল করার জন সর্বদা প্রস্তুত থকি। আমাদের মধ্যে ইসলামের প্রতি আন্তরিক হওয়ার চেয়ে বিভেদ সৃষ্টি হচ্ছে বেশি। আমাদের এই বিভেদ দূর করতে হবে। আমাদেরকে রাসুল সঃ এর আদর্শিত জামাআত কে খুঁজে নিতে হবে। শান্তির পতাকা তলে আহ্বান জানাতে হবে।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক

  • সর্বশেষ
  • পঠিত