, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 31° সে. | 💧 আদ্রতা 63%

টেকনাফে পানির তীব্র সংকট, দুর্ভোগে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা

নিজস্ব প্রতিবেদক

কক্সবাজারের টেকনাফের ২২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। ক্যাম্পটিতে বসবাসরত প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গার দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। বর্ষা মৌসুমেই সরবরাহে সীমাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে জনপ্রতি দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ লিটার পানি পাওয়া যাচ্ছে। এই পানি দিয়েই পান করা, রান্না, গোসল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে সরবরাহ কমে জনপ্রতি ৫ থেকে ১৫ লিটারে নেমে আসে। তখন পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন মেটাতে পানি ব্যবহারে কঠোরভাবে হিসাব করতে হয়।

২২ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুল আমিন বলেন, মানবিক সহায়তা পেলেও পানির অভাবে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। আরেক বাসিন্দা হামিদ হোসেন জানান, বর্ষা মৌসুমেও পানির সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম। শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তখন রান্না ও গোসলের মতো প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয় অনেক সময়।

খাল ও পাহাড়ি ছড়ার পানির ওপর নির্ভরতা

ক্যাম্পটির পানি সরবরাহের প্রধান উৎস পাশের একটি খাল। শুষ্ক মৌসুমে খালের পানি কমে গেলে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি ছড়া থেকে পানি সংগ্রহ করে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে হয়।

ক্যাম্পে একটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করা হয়। দিনে দুই দফায় পানি দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে ট্যাপস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসিন্দাদের পানি সংগ্রহ করতে হয়। ফলে পানির সীমিত সরবরাহের পাশাপাশি তা সংগ্রহ করতেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফের পাথুরে ভূপ্রকৃতির কারণে গভীর নলকূপ স্থাপন জটিল। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা না থাকায় বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশক থেকেই টেকনাফে রোহিঙ্গাদের বসতি রয়েছে। আগে অগভীর নলকূপ ও খালের পানি ব্যবহার করে তাঁদের চাহিদা মেটানো হতো। ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর ক্যাম্পগুলোতে পানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এ সময় বহু নলকূপ স্থাপন করা হলেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।

এই সংকট মোকাবিলায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনিসেফের সহায়তায় ২২ নম্বর ক্যাম্পে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করে অক্সফ্যাম। প্ল্যান্টটির নির্মাণ ও পরিচালনায় সহযোগিতা করছে দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)। তবে এই উদ্যোগের পরও ক্যাম্পের পানির সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি।

বড় পানি শোধনাগার স্থাপনের উদ্যোগ

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়া ও টেকনাফজুড়েই পানির সংকট রয়েছে, তবে টেকনাফে তা বেশি প্রকট। পাথুরে ভূমি ও ভূগর্ভস্থ পানির সীমিত প্রাপ্যতার কারণে সেখানে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। শীতকালে পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় রেশনিং করতে হয়।

তিনি জানান, ২২ নম্বর ক্যাম্পের বিদ্যমান প্ল্যান্টে পানি পরিশোধন ও বিতরণের জন্য ছয়টি প্রাথমিক সেডিমেন্টেশন ট্যাংক রয়েছে। প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৯৫ হাজার লিটার। এ ছাড়া চারটি পাহাড়ে চারটি বিতরণ ট্যাংক রয়েছে, যার প্রতিটির ধারণক্ষমতাও ৯৫ হাজার লিটার। প্ল্যান্ট থেকে সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা যায়।

পানির চাহিদা পূরণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) মাধ্যমে টেকনাফে বড় সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হতে আরও দুই থেকে তিন বছর লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পানির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যমান উৎসগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ পানির নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত