, |

চট্টগ্রাম - 🌤️ 31° সে. | 💧 আদ্রতা 69%

আঞ্চলিক এয়ার হাব হবে শাহ আমানত বিমানবন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান চলাচল ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব’ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টরকে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটিকে এডিবির ‘ইন্টেগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ (আইজিএনডি) উদ্যোগের আওতায় নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।

এর আগে মে মাসে এডিবি জানিয়েছিল, আইজিএনডি উদ্যোগের আওতায় আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

কেন আঞ্চলিক এয়ার হাবের উদ্যোগ

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাড়লেও বিমানপথে আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের পরিধি সেই অনুপাতে বাড়েনি।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম চেম্বারও বিমানবন্দরটিকে আঞ্চলিক বিমান ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত করতে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক রুটে প্রণোদনামূলক ট্যারিফ, ২৪ ঘণ্টা বিমানবন্দর পরিচালনা, ট্রানজিট ও রিফুয়েলিং সুবিধা এবং আধুনিক কার্গো ভিলেজ গড়ে তোলার বিষয় রয়েছে।

সরকারের প্রস্তাবিত প্রকল্পের লক্ষ্যও মূলত বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত ও পরিচালনাগত সক্ষমতা বাড়িয়ে চট্টগ্রামকে একটি কার্যকর আঞ্চলিক এভিয়েশন গেটওয়েতে পরিণত করা।

বাড়বে রানওয়ে ও উড়োজাহাজ পার্কিং সুবিধা

প্রাথমিক পরিকল্পনায় শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের বিষয়টি রাখা হয়েছে। বর্তমানে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার। প্রস্তাব অনুযায়ী তা প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এর পাশাপাশি সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে, দ্রুত উড়োজাহাজ বের হওয়ার ট্যাক্সিওয়ে এবং বড় আকারের উড়োজাহাজের জন্য একাধিক পার্কিং স্ট্যান্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। যাত্রী ওঠানামার সুবিধা বাড়াতে কয়েকটি বোর্ডিং ব্রিজ স্থাপনের কথাও রয়েছে প্রাথমিক প্রস্তাবে।

বাড়বে যাত্রী ও কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা

প্রকল্পের প্রথম ধাপে যাত্রী টার্মিনাল সম্প্রসারণ ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এ সক্ষমতা দেড় কোটি থেকে ২ কোটি যাত্রী পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বছরে ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন পণ্য পরিচালনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী ধাপে তা ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত কার্গো অবকাঠামোর মধ্যে বন্ডেড ওয়্যারহাউস, এক্সপ্রেস কার্গো সুবিধা, ই-কমার্স পণ্য ব্যবস্থাপনা, হিমাগার এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

গড়ে উঠবে আঞ্চলিক ট্রান্সফার সেন্টার

চট্টগ্রামকে শুধু যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের কেন্দ্র নয়, আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একটি পৃথক ‘রিজিওনাল ট্রান্সফার সেন্টার’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন দেশের যাত্রীরা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট ও ট্রান্সফারের সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে বিমানবন্দরকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস কেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যুক্ত করে ‘এয়ার-সি লজিস্টিকস করিডর’ তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।

রেল যোগাযোগ ও এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে বিমানবন্দরের সংযোগ উন্নয়নের বিষয়টিও প্রস্তাবের অংশ।

প্রথম ধাপে বিনিয়োগ ২৮–৩০ কোটি ডলার

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম ধাপ প্রায় ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এ ধাপে সরকারি বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার।

এর পাশাপাশি হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক অবকাঠামোতে বেসরকারি খাত থেকে আরও ৩ থেকে ৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে প্রথম ধাপে মোট সম্ভাব্য বিনিয়োগ ২৮ থেকে ৩০ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে।

তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পের আকার ও ব্যয়ের পরিবর্তন হতে পারে।

অবকাঠামোর পাশাপাশি নতুন রুটই বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাবে পরিণত করতে শুধু রানওয়ে, টার্মিনাল কিংবা কার্গো অবকাঠামো বাড়ালেই হবে না; আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসকে নতুন রুটে আকৃষ্ট করাও গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম চেম্বার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রুটে প্রণোদনামূলক ট্যারিফ, ট্রানজিট সুবিধা ও কার্গো অবকাঠামো উন্নয়নের মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে।

এদিকে এডিবির IGND উদ্যোগে যোগাযোগ, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রস্তাবিত ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব’ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের বিমান, সমুদ্র ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত লজিস্টিকস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইতি/

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত