দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে বেড়ানোর পর কোন কোন জেলা দেখা হয়েছে, তার হিসাব রাখতে গিয়ে বারবার হাতে মানচিত্র আঁকতে হতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মো. সাব্বির হোসাইনের। সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়েছে ‘আনসিন বাংলাদেশ’ নামে একটি ডিজিটাল ওয়েব অ্যাপ।
২৭ বছর বয়সী সাব্বির পেশায় অ্যাপ ডিজাইনার। নোয়াখালীর কবিরহাটের এই তরুণ বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে বসবাস করেন। ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে দেখার পাশাপাশি নিজের ভ্রমণের তথ্য সংরক্ষণের সহজ একটি পদ্ধতি তৈরির চিন্তা করেন তিনি।
পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও নিজের ডিজাইন দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তৈরি করেন ‘আনসিন বাংলাদেশ’। শুরুতে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও পরে অন্য ভ্রমণপ্রেমীরাও এটি ব্যবহার করতে পারবেন—এমন চিন্তা থেকে প্ল্যাটফর্মটি সবার জন্য উন্মুক্ত করেন।
এক নজরেই জানা যাবে কত জেলা ভ্রমণ করা হয়েছে
ওয়েব অ্যাপটিতে বাংলাদেশের ৮ বিভাগের ৬৪টি জেলা রয়েছে। ব্যবহারকারী তালিকা থেকে জেলা নির্বাচন করতে পারেন, আবার সরাসরি মানচিত্রে ক্লিক করেও জেলা বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সার্চ অপশন ব্যবহার করেও নির্দিষ্ট জেলা খুঁজে নেওয়া যায়।
যেমন, কেউ ৬৪ জেলার মধ্যে ১৫টি ঘুরে থাকলে নির্বাচনের পর মানচিত্রে ১৫/৬৪ হিসেবে তার ভ্রমণের অগ্রগতি দেখা যাবে। একই সঙ্গে সব জেলা নির্বাচন কিংবা আগের নির্বাচন মুছে দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে।
শুধু ভ্রমণের সংখ্যা সংরক্ষণ নয়, নির্বাচিত জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান, খাবার ও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের তথ্যও পাওয়া যায়। দর্শনীয় স্থানগুলোর ক্ষেত্রে গুগল ম্যাপের মাধ্যমে অবস্থান জানার সুবিধাও রাখা হয়েছে।
বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় তথ্য দেখার সুযোগ থাকায় স্থানীয় পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করতে পারবেন।
নিজের মতো করে তৈরি করা যাবে ভ্রমণ মানচিত্র
ব্যবহারকারীর জন্য মানচিত্র সাজানোর ক্ষেত্রে রয়েছে একাধিক থিম। নিজের নাম ও ছবি যুক্ত করে ব্যক্তিগত ভ্রমণ মানচিত্র তৈরি করা যায়। পরে সেটি PNG, JPG কিংবা PDF ফরম্যাটে সংরক্ষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা সম্ভব।
ফলে দেশের কতগুলো জেলা ঘোরা হয়েছে, কোন কোন জেলা এখনো বাকি—এসব তথ্য একসঙ্গে একটি ভিজ্যুয়াল মানচিত্রে তুলে ধরা যায়।
ভবিষ্যৎ ভ্রমণের পরিকল্পনাতেও এআই
‘আনসিন বাংলাদেশ’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো এআইভিত্তিক ‘ট্রিপ প্ল্যানার’। ব্যবহারকারী ভবিষ্যতে যেসব জেলা ভ্রমণ করতে চান, সেগুলো নির্বাচন করলে সেগুলোকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ভ্রমণসূচি তৈরি করে দেয় প্ল্যাটফর্মটি।
একাধিক জেলা নির্বাচন করলে কোন জায়গা আগে বা পরে ভ্রমণ করা সুবিধাজনক, কোথায় থাকা যেতে পারে, সংশ্লিষ্ট গুগল ম্যাপ লোকেশন এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের মতো তথ্যও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখানো হয়।
সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্লড কোডসহ এআই প্রযুক্তি এবং তার নিজস্ব ডিজাইন দক্ষতা ব্যবহার করে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিনের মধ্যে ওয়েব অ্যাপটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করা হয়।
বিজ্ঞাপন নয়, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাই অগ্রাধিকার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও আপাতত এটিকে বিজ্ঞাপননির্ভর করার পরিকল্পনা নেই সাব্বিরের। তার লক্ষ্য, ব্যবহারকারীরা যেন কোনো ধরনের বিজ্ঞাপনের বিরক্তি ছাড়াই পরিষ্কার ও সহজভাবে সেবাটি ব্যবহার করতে পারেন।
ভবিষ্যতে ‘আনসিন বাংলাদেশ’কে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান তিনি। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার স্বপ্ন রয়েছে তার।
ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে ইতোমধ্যে সাড়া
প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে ভ্রমণপ্রেমীদের অনেকেই নিজেদের ঘুরে দেখা জেলার হিসাব নতুন করে সাজাচ্ছেন। অনেকে নিজেদের তৈরি মানচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শেয়ার করছেন।
দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫২টি ঘুরে দেখা এক ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা, এতদিন নিজের ভ্রমণের সঠিক হিসাব সংরক্ষণের সুযোগ না থাকলেও এই প্ল্যাটফর্মে সহজেই দেখা জেলা নির্বাচন করে ব্যক্তিগত মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে ৪৪টি জেলা ভ্রমণ করা ভ্রমণ সংগঠক সাফায়েত রায়হান শিহাবও প্ল্যাটফর্মটির কার্যকারিতার প্রশংসা করেছেন। তার মতে, কোন জেলা ঘোরা হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো বাকি—তা বুঝতে এটি সহায়ক। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত তথ্য যুক্ত হলে এটি পূর্ণাঙ্গ ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা
পর্বতারোহী ডা. বাবর আলীও উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। তার মতে, দেশের ৬৪ জেলা সম্পর্কে জানা ও সেগুলো ঘুরে দেখার আগ্রহ তরুণদের মধ্যে বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব মোরশেদের মতে, ভ্রমণসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্মে যাতায়াত, আবাসন, সম্ভাব্য ব্যয়, ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া ও স্থানীয় সংস্কৃতির মতো তথ্য সহজলভ্য হলে পর্যটকদের পরিকল্পনা আরও সহজ হয়।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (বিপণন, পরিকল্পনা ও জনসংযোগ) আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান জানান, তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটন উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান। উদ্ভাবক আগ্রহ প্রকাশ করে যোগাযোগ করলে সুযোগ অনুযায়ী তাকে বোর্ডের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, পর্যটকদের সঠিক তথ্য সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তায় ট্যুরিজম বোর্ডের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ব্যক্তিগত ভ্রমণের হিসাব রাখার একটি ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া ‘আনসিন বাংলাদেশ’ এখন দেশের পর্যটনকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার একটি সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এতে আরও তথ্য ও সেবা যুক্ত হলে এটি বাংলাদেশের ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য একটি কার্যকর ডিজিটাল গাইড হয়ে উঠতে পারে।
ইতি/
