দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শিশুদের সুরক্ষায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা, টিকার প্রাপ্যতা, রোগ শনাক্তকরণ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৫ অক্টোবর ২০২৬-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৬ জন এবং হামের উপসর্গ দেখা গেছে আরও ১ হাজার ২৮০ জনের শরীরে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ২২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০৪ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ১২৩ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে দুজন এবং ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। এ সময় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৬ জন। চলতি বছরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৪০০ জনে। পাশাপাশি হামের উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ১৬৪ জন।
শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের এই হিসাব দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম এবং চিকিৎসাসেবার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সুরক্ষার ঘাটতি
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে শিশুস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের হাম পরিস্থিতি সেই অর্জন ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে শিশুদের টিকাদানের উচ্চ কভারেজ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ হামের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য অর্জন করা না গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আগের বছরগুলোতে টিকাদানের আওতায় না আসা কিংবা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে তৈরি হওয়া সুরক্ষার ঘাটতি বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ইউনিসেফের ২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্যেও বাংলাদেশে হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির ব্যাখ্যায়, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা টিকাদানের ঘাটতি বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ।
অপারেশন প্ল্যান বাতিল ও নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব খতিয়ে দেখা জরুরি
স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, জনবল এবং টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বাতিল বা পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্তের ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কর্মসূচি কতটা প্রভাবিত হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অতীতে চালু থাকা কর্মসূচির কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থাপনা, অর্থায়নের ধারাবাহিকতা, টিকা সংগ্রহের সময়সূচি এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা কিংবা দীর্ঘসূত্রতা থাকলে তার প্রভাব শিশুদের টিকাপ্রাপ্তি ও রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতার ওপর পড়তে পারে।
তবে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য কোনো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে সরাসরি দায়ী করতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, টিকা সংগ্রহের সময়রেখা, টিকাদানের কভারেজ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান অপরিহার্য।
টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে জবাবদিহি
হাম প্রতিরোধে শুধু টিকা সংগ্রহ করলেই হয় না; সময়মতো টিকা পৌঁছানো, সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, নির্ধারিত সূচি অনুসারে প্রয়োগ এবং বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
টিকা সরবরাহে বিলম্ব, পর্যাপ্ত জনবলের অভাব, মাঠপর্যায়ে কর্মসূচির দুর্বল বাস্তবায়ন কিংবা তথ্যের অসংগতি থাকলে তার প্রভাব জাতীয় টিকাদান কার্যক্রমে পড়তে পারে। তাই কোন সময়ে কত টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে, কত টিকা বিতরণ করা হয়েছে, কত শিশু টিকার আওতায় এসেছে এবং কত শিশু বাদ পড়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে টিকার মজুত ও বিতরণব্যবস্থা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং টিকাদানের প্রকৃত কভারেজ যাচাই করতে হবে। কাগজে-কলমে অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা এবং বাস্তবে টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকলে সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় আনা জরুরি।
সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগ
হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তী সময়ে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এ কর্মসূচিতে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগে টিকা না পাওয়া বা পূর্ববর্তী কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের পাশাপাশি ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কর্মসূচিটি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ।
এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৪ অক্টোবর জানিয়েছে, সরকারের অনুরোধে দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ও টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি ব্যবস্থা মূল্যায়নে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। এতে কর্মসূচি পরিচালনা, অর্থায়ন, জনবল, টিকার সরবরাহ ও সংরক্ষণ, টিকাদানের কভারেজ, রোগ শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পর্যালোচনার ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের কথা রয়েছে। ।
শিশুদের মৃত্যু ঠেকাতে জরুরি করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা কোনো ডোজ বাদ পড়েছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যন্ত অঞ্চল, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে টিকা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বর, ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, অক্সিজেন, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। হামের জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের তথ্য নিয়মিত প্রকাশের পাশাপাশি টিকাদানের বাস্তব অবস্থা, টিকার মজুত, সরবরাহব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা কিংবা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দায় নির্ধারণ নয়, কার্যকর পদক্ষেপই এখন প্রধান
হামে ১ হাজার ২২৭ জনের মৃত্যু এবং ২ লাখ ২১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীর হিসাব দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্ত, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
শিশুদের মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যানমাত্র নয়; প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। তাই রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্যভিত্তিক তদন্ত, দ্রুত টিকাদান, কার্যকর চিকিৎসা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ইতি/
